অরুণ কুমার যেভাবে হয়ে উঠলেন বাংলা সিনেমার উত্তম

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪০ এএম

পরপর তিনটি সিনেমা বক্স অফিসে চরম ফ্লপ। স্টুডিওপাড়ায় একটু সুযোগের আশায় ঘুরে বেড়ানো এক তরুণকে দেখে অনেকেই তখন আড়ালে হেসেছেন, গায়ে সেঁটে দিয়েছিলেন ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ তকমা। তবে চরম প্রতিকূলতা পেরিয়ে সেই তরুণই একদিন হয়ে উঠেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের অবিসংবাদিত সম্রাট উত্তম কুমার। আজ এই কালজয়ী মহানায়কের জন্মদিন। ১৯২৬ সালের এই দিনে দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরে মাতুলালয়ে জন্ম নিয়েছিলেন তিনি।

চলচ্চিত্রের রঙিন দুনিয়ায় পা রাখার আগে তার নাম ছিল অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। মধ্যবিত্ত পরিবারের এই ছেলেটিকে সাউথ সুবারবান স্কুল ও গোয়েঙ্কা কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি জীবিকার তাগিদে কলকাতা বন্দরে চাকরিও করতে হয়েছে। ১৯৪৮ সালে নিতিন বসুর ‘দৃষ্টিদান’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় তার আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু। যদিও এর আগে ‘মায়াডোর’ নামে একটি ছবিতে কাজ করলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। শুরুর ধাক্কা সামলে ‘বসু পরিবার’ ছবিতে প্রথম দর্শকদের নজর কাড়েন তিনি। তবে ১৯৫৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এ ছবির মাধ্যমেই সূচনা হয় কালজয়ী ‘উত্তম-সুচিত্রা’ জুটির, যা পরবর্তী দুই দশক ধরে ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘পথে হল দেরী’ ও ‘বিপাশা’র মতো ব্যবসাসফল ও নিখাদ ভালোবাসার একের পর এক মাইলফলক উপহার দিয়েছে।

রোমান্টিক ইমেজের বাইরে নিজের জাত চিনিয়েছেন সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ও ‘চিড়িয়াখানা’ (রব্যামকেশ বক্সী) এবং ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’র মতো বৈচিত্র্যময় চরিত্রে। ১৯৬৭ সালে ‘এ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ও ‘চিড়িয়াখানা’র জন্য তিনি লাভ করেন ভারতের জাতীয় পুরস্কার (তৎকালীন ‘ভরত’ পুরস্কার)। পাশাপাশি কমেডিতে ‘দেয়া-নেয়া’ কিংবা হিন্দি সিনেমা ‘অমানুষ’ ও ‘আনন্দ আশ্রম’-এ তার নিখুঁত অভিনয় তাকে সর্বভারতীয় পরিচিতি এনে দেয়।

প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবেও উত্তম কুমার ছিলেন সমান সফল। ‘বনপলাশীর পদাবলী’ ও ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’ পরিচালনা করে তিনি বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। সিনেমার পাশাপাশি ভালোবাসা ছিল থিয়েটারেও; যার প্রমাণ ১৯৫৫ সালে স্টার ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত শীর্ষে থেকেও ‘শ্যামলী’ নাটকে তার অভিনয়। সংগীতের প্রতিও ছিল তার গভীর অনুরাগ। ১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘কাল তুমি আলেয়া’ চলচ্চিত্রের সব গানের সুরারোপ করেছিলেন তিনি।

ব্যক্তিগত জীবনে বাবা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় ও মা চপলা দেবীর জ্যেষ্ঠ সন্তান উত্তম কুমারের ছোট ভাই তরুণ কুমারও ছিলেন প্রখ্যাত অভিনেতা। স্ত্রী গৌরী দেবীর সঙ্গে যৌথ জীবন এবং পরবর্তীতে অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে দীর্ঘ ১৭ বছরের সহাবস্থান, তার ব্যক্তিগত জীবনও ছিল নানা চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৮০ সালে এই রুপালি রাজপুত্রের প্রয়াণ হলেও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আজও তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত