পূজা অর্চনা, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা এবং ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব শুভ জন্মাষ্টমী। গতকাল শুক্রবার আনন্দমুখর পরিবেশে দেশব্যাপী এ উৎসব উদযাপিত হয়। উৎসবে নানা বয়সী মানুষ আনন্দ উদযাপন করে। হিন্দু পুরাণ ও ইতিহাসমতে, পাশবিক শক্তি যখন ন্যায়নীতি, সত্য ও সুন্দরকে গ্রাস করতে শুরু করে, তখন দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন করতে মানবজাতির কল্যাণে এবং ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার জন্য আবির্ভাব ঘটেছিল শ্রীকৃষ্ণের। প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে দ্বাপর যুগে ভাদ্র মাসে মথুরা নগরীতে কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে জন্মগ্রহণ করেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।
এ উপলক্ষে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, ঢাকা মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি, আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘ (ইসকন), রমনা কালীমন্দির, রাজারবাগের বরদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির, মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দির কর্তৃপক্ষ সারা দেশে মন্দির ও পূজাম-পে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় গীতাযজ্ঞ, বিশেষ প্রার্থনা, আরতি, কীর্তন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রসাদ বিতরণের আয়োজন করে। গতকাল ঢাকায় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে সকাল ৮টায় পূজা অর্চনা ও গীতাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়। গীতাযজ্ঞ পরিচালনা করে চট্টগ্রামের সীতাকু-ের শংকর মঠ ও মিশন। বেলা ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পলাশীর মোড়ে ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমী মিছিল ও শোভাযাত্রা শুরু হয়। সরেজমিন দুপুর ২টার দিকে গিয়ে দেখা গেছে, শোভাযাত্রায় অংশ নিতে আগত মানুষের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয় ও নজরদারিতে রাখা হয়। শোভাযাত্রার উদ্বোধনীতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। জন্মাষ্টমী মিছিলের উদ্বোধন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর শোভাযাত্রা শুরু হয়।
শোভাযাত্রাটি পলাশী বাজার, জগন্নাথ হল, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট, বঙ্গবাজার, সিটি করপোরেশন ভবন, গোলাপ শাহ মাজার, গুলিস্তান মোড়, নবাবপুর রোড ও রায়সাহেব বাজার মোড় হয়ে সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাহাদুর শাহ পার্কে গিয়ে শেষ হয়। সে সময় বিভিন্ন বয়সী সনাতন ধর্মাবলম্বী হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু অংশ নেয়। ঢাক, ঢোল, কাঁশর আর নাম সংকীর্তনে তারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নামে জয়ধ্বনি দেন। ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি শোভাযাত্রায় শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবকল্যাণের বার্তাও তুলে ধরা হয়।
শোভাযাত্রার আগে এবং শেষে ছিল পুলিশ ও র্যাবের কয়েক স্তরের নিরাপত্তাবলয়। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভর না করে আয়োজকদের স্বেচ্ছাসেবকদেরও নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ করা হয়। স্বেচ্ছাসেবকদের নির্ধারিত পোশাক বা ভেস্ট পরে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে পলাশী চত্বর থেকে বের হওয়া কেন্দ্রীয় শোভাযাত্রাকে ঘিরে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হয়।
নিরাপত্তা কড়াকড়ির মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সামনে এক যুবককে মারধর করে শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া কিছু মানুষ। তাদের অভিযোগ, ওই যুবক শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া একটি ট্রাকে দাঁড়িয়ে থাকা নারীদের মধ্যে ওঠার চেষ্টা করে। পরে পুলিশ সদস্যরা ওই যুবককে নিজেদের হেফাজতে নেন। তার নাম ফজলে রাব্বি, বাড়ি পটুয়াখালী বলে জানা গেছে। অনুষ্ঠান দেখতে সে ওই গাড়িতে ওঠার চেষ্টা করে বলে জানায়। পরে পুলিশ সদস্যরা তাকে ছেড়ে দিলে সে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
জয়পুরহাট প্রতিনিধি জানান, জন্মাষ্টমী উপলক্ষে জয়পুরহাটে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘শতকণ্ঠে গীতা পাঠ’। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে একসঙ্গে গীতা পাঠ করেন শতাধিক ভক্ত ও সনাতন ধর্মাবলম্বী। গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টায় শহরের ২ নম্বর রেলস্টেশন রোডে শ্রীশ্রী জয় কালীবাড়ী মন্দির চত্বরে বাংলাদেশ গীতা শিক্ষা কমিটি (বাগীশিক) জয়পুরহাট জেলা সংসদের আয়োজনে ও প্রভাষক গোবিন্দ কুমার বাঁশফোরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. গোলজার হোসেন। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন কৃষিবিদ রেবতী মোহন ম-ল। গীতা পাঠ শেষে একটি শোভাযাত্রা বের হয়।
বগুড়া প্রতিনিধি জানান, নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বগুড়ায় শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী পালিত হয়েছে। এ আয়োজনে শিশুরা ছিল শ্রীকৃষ্ণের সাজে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় বগুড়া জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের আয়োজনে জিলা স্কুল থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় বগুড়া সদর ও মহানগরের বিভিন্ন এলাকার কয়েক হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী অংশগ্রহণ করেন। সে সময় সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ নানা সাজে সজ্জিত হয়ে বিভিন্নভাবে আনন্দ প্রকাশ করে। শোভাযাত্রা শেষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা। বগুড়া জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি পরিমল চন্দ্র দাসের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য রাখেন পুলিশ সুপার মীর্জা সায়েম মাহমুদ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ বগুড়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্মল কুমার রায়, বগুড়া জেলা ছাত্রদলের সভাপতি হাবিবুর রশিদ সন্ধান, সাধারণ সম্পাদক এমআর হাসান পলাশ, বগুড়া মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি পরিমল প্রসাদ রাজ এবং সাধারণ সম্পাদক সুজিত জয়সোয়াল।
বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও আনন্দমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে বান্দরবানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী উৎসব উদযাপিত হয়েছে। শুক্রবার বেলা ১১টায় বান্দরবান রাজার মাঠ থেকে এক বর্ণাঢ্য মহাশোভাযাত্রা বের করা হয়। পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাম্যাচিং এতে প্রধান অতিথি হিসেবে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন এবং বেলুন উড়িয়ে মহাশোভাযাত্রার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সজীব কান্তি রুদ্র, পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য জসিম উদ্দিন তুষার, সদস্য চনুমং মারমা, বান্দরবান সার্বজনীন কেন্দ্রীয় দুর্গা মন্দিরের সভাপতি বিপ্লব কান্তি দাশ রাজেশ্বর, বান্দরবান কেন্দ্রীয় শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী উৎসব উদযাপন পরিষদের সভাপতি রিটল কান্তি বিশ্বাস এবং সাধারণ সম্পাদক অলক ধর।
মুরাদনগর (কুমিল্লা) প্রতিনিধি জানান, মুরাদনগরে নানা আয়োজনে জন্মাষ্টমী উদযাপিত হয়েছে। সকাল সাড়ে ১০টায় বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট উপজেলা শাখার উদ্যোগে কবি নজরুল মিলনায়তনে আলোচনা সভা শেষে উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রার উদ্বোধন করা হয়। ঢাক-ঢোল, খোল-করতাল, গীতা পাঠ এবং বর্ণিল ব্যানার-ফেস্টুনে সজ্জিত এই শোভাযাত্রায় হাজার হাজার পুণ্যার্থী অংশ নেন। কুমিল্লা উত্তর জেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক ও জন্মাষ্টমী উদযাপনের আহ্বায়ক দুলাল দেবনাথ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। সে সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (অ. দা.) মো. সাকিব হাছান খাঁন, কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ তৌফিক আহমেদ মীর, মুরাদনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বরুন চন্দ্র দে প্রমুখ।