কারাগারে শেখা কাজে স্বাবলম্বী জীবনের স্বপ্ন

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫৪ এএম

কারাগার শুধু শাস্তি ভোগের স্থান নয়, হয়ে উঠেছে নতুন জীবনে প্রবেশে প্রস্তুতির স্থান। সরকার কারাগারকে সংশোধনাগার হিসেবে গড়ে তোলার কর্মসূচি নেওয়ায় বন্দিরা পাচ্ছেন বিভিন্ন প্রশিক্ষণ। আর এসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কাজ শিখে তারা কারাগারের ভেতরে তৈরি করছেন বিভিন্ন ধরনের পণ্য, যা খুলে দিয়েছে তাদের আয়ের পথ। কারাপণ্য বিক্রির লভ্যাংশের ৫০ শতাংশ পান বন্দিরা, আর বাকি অর্থ জমা হয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। উপার্জিত অর্থে বন্দিরা কারাগারের ভেতরে প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি তার পরিবারের হাতেও পৌঁছে দিতে পারেন আর্থিক সহায়তা। ফলে সাজা ভোগের সময়ও বন্দিদের পরিবার পাচ্ছে কিছুটা স্বস্তি, আর বন্দিদের সামনেও তৈরি হচ্ছে স্বাবলম্বী জীবনে ফেরার সম্ভাবনা।

কারা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশের ৭৫টি কারাগারের মধ্যে উৎপাদন বিভাগ চালু রয়েছে ৩৮টি কারাগারে। এসব কারাগারে আদালত কর্তৃক সশ্রম সাজাপ্রাপ্ত বন্দিরা বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন করে থাকেন। উৎপাদিত পণ্য প্রতিটি কারাগারসংলগ্ন দোকানে/প্রদর্শনী সেন্টারে নিজস্ব উদ্যোগে বিক্রি করা হয়। এ ছাড়া বাণিজ্য মেলাসহ বিভিন্ন উৎসবে স্টল নিয়ে সেখানেও বিক্রি করা হয়। এ ছাড়া একটি কোম্পানি বগুড়া কারাগারে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী কিনে বাইরে রপ্তানি করে। সংশ্লিষ্টরা বলছে, কারাগারের ভেতরে এ ধরনের উৎপাদনমুখী কার্যক্রম বন্দিদের মানসিক পরিবর্তন, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া কাজের মাধ্যমে দায়িত্ববোধ, সময়ানুবর্তিতা, দলগতভাবে কাজ করার অভ্যাস এবং পেশাগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে কারামুক্তির পর সমাজে ফিরে স্বাভাবিক জীবন শুরু করা তুলনামূলক সহজ হয়।

যেসব পণ্য তৈরি হয় : বাঁশ ও বেতের মোড়া, দোলনা, সিংহাসন চেয়ার, ফুলদানি এবং পুঁতির তৈরি বিভিন্ন আকর্ষণীয় শোপিস, হাতে বোনা জামদানি শাড়ি, নকশিকাঁথা, লুঙ্গি, গামছা, বেডশিট, পাঞ্জাবি ও টি-শার্ট, প্লাস্টিকের কুলা, ঝুড়ি, ঝাড়, পাপোশ, জুতা, কাঠ ও পাটের সংমিশ্রণে তৈরি ড্রেসিং টেবিল, আলমিরা, চায়ের টেবিল ও ফোল্ডিং চেয়ার, সুস্বাদু আচার এবং বিভিন্ন বেকারি বিস্কুট। সম্প্রতি কাশিমপুর কারাগারে বন্দিদের মাধ্যমে ‘প্রিজন ফ্রেশ’ নামে ৩ ধরনের সাবান উৎপাদন শুরু হয়েছে, যা কারাগারের নিজস্ব চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারে ছাড়ারও পরিকল্পনা রয়েছে।

কারা অধিদপ্তর বলছে, দেশের কারাগারগুলোতে ৩২৫টিরও বেশি বৈচিত্র্যময় পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। এসব জিনিস তৈরি করতে বন্দিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এজন্য গত তিন বছরে ৮ লাখ ১৩ হাজার ৮৮৮ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

‘রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ’ এই মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে শাস্তি প্রদানই কারাগারের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়, বরং অপরাধপ্রবণতা থেকে মানুষকে ফিরিয়ে এনে দক্ষ, কর্মক্ষম ও সমাজের মূলধারায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা আধুনিক কারা ব্যবস্থাপনার অন্যতম লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার। বন্দিদের সংশোধন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সেখানে চালু হয়েছে একটি অত্যাধুনিক অটো সাবান উৎপাদন কারখানা। কারাগারে উৎপাদিত সাবানের ব্র্যান্ডের নাম রাখা হয়েছে ‘প্রিজন ফ্রেশ’। বর্তমানে তিন ক্যাটাগরির সাবান উৎপাদন হচ্ছে।

বন্দিদের হাতে নতুন দক্ষতা : কারাগারের এই উদ্যোগে অংশগ্রহণকারী বন্দিরা আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থাপনা, যন্ত্র পরিচালনা, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং এবং শিল্প নিরাপত্তা বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব দক্ষতা ভবিষ্যতে তাদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কারামুক্তির পর কোনো সাবান বা কসমেটিকস কারখানায় চাকরি কিংবা নিজস্ব উদ্যোগে ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সম্ভব।

বর্তমানে দেশের ৭৫টি কারাগারে বন্দিদের জন্য সাবানের চাহিদা ৯০ হাজার পিস এবং কারা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাহিদা ১০ হাজার পিস। মোট ১ লাখ পিস চাহিদা রয়েছে সাবানের। এসব সাবান বাইরে থেকে কিনতে হয়। নিজস্ব কারখানায় উৎপাদনের ফলে সেই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। একই সঙ্গে বন্দিদের উৎপাদনশীল কাজে সম্পৃক্ত করায় কারা প্রশাসনের পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও শক্তিশালী হবে।

কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার হালিমা খাতুন বলেন, আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন কারাগারকে শুধু বন্দি রাখার জায়গা না বানিয়ে একটি উৎপাদনমুখী ও দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। বন্দিরা এখানে কাজ করে পারিশ্রমিক পাবে, নতুন দক্ষতা অর্জন করবে এবং মুক্তির পর সমাজে সম্মানজনকভাবে জীবনযাপন করতে পারবেন। ভবিষ্যতে আরও বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

অবসর সময় কাজে লাগিয়ে আয়: কারাজীবনে বন্দিদের দীর্ঘ সময় অনেক ক্ষেত্রেই কর্মহীনভাবে কাটে। সেই সময়কে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা হয়েছে। কারখানায় কাজের বিনিময়ে বন্দিরা মাসে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারছেন। উপার্জিত অর্থের একটি অংশ তারা নিজেদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারেন এবং একটি অংশ পরিবারের কাছে পাঠানোর সুযোগও রয়েছে। ফলে এতে পরিবারের আর্থিক সংকট কিছুটা হলেও লাঘব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সদ্য কারামুক্ত একজন বন্দি জানান, জেলে বসে আমরা শুধু কাজ করিনি, নতুন কিছু শিখেছিও। এই অভিজ্ঞতা সৎভাবে জীবিকা নির্বাহের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। এভাবে যদি সব কারাগারে বন্দিদের কাজের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে বন্দিরা মুক্তির পর আর অসৎ কাজ করবে না, সৎ কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে।

কারা অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, বন্দিদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে গত তিন বছরে (অর্থবছরে) মোট ৯ কোটি ৪৬ লাখ ১১ হাজার টাকা আয় হয়েছে। এর মধ্যে বন্দিরা পেয়েছেন ৩ কোটি ৮১ লাখ ৪২ হাজার টাকা। আর রাজস্বে খাতে জমা হয়েছে ৫ কোটি ৬৪ লাখ ৬৯ হাজার টাকা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত