নারী কর্মীদের দায়িত্ব থেকে সরানোর অভিযোগ, ধর্মঘটে বন্ধ আইফেল টাওয়ার

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪৭ পিএম

হিন্দু ধর্মীয় একটি প্রতিনিধিদলের ব্যক্তিগত সফরকে কেন্দ্র করে নারী কর্মীদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখার অভিযোগে কর্মীদের ধর্মঘটের কারণে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বন্ধ ছিল প্যারিসের বিশ্বখ্যাত আইফেল টাওয়ার। গত শনিবারের ওই সফর ঘিরে কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক ও প্রতিবাদের অংশ হিসেবে ধর্মঘটে যান কর্মীরা। এতে দিনভর দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ থাকে ফ্রান্সের অন্যতম প্রধান পর্যটন স্থাপনাটি।

ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে এবং কার সিদ্ধান্তে নারী কর্মীদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছিল, তা তদন্ত করে দেখার ঘোষণা দিয়েছে আইফেল টাওয়ার পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ। সোমবার কর্মী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর এক দিনের মধ্যেই ধর্মঘট শেষ হয়। মঙ্গলবার সকাল থেকে আইফেল টাওয়ার স্বাভাবিকভাবে দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের আধ্যাত্মিক সংগঠন বোচাসনবাসী অক্ষর পুরুষোত্তম স্বামীনারায়ণ সংস্থার সঙ্গে যুক্ত প্রায় একশ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। গত শনিবার দলটি আইফেল টাওয়ারে ব্যক্তিগত সফরে যায়। ফ্রান্সের উপকণ্ঠে সংগঠনটির একটি বড় মন্দির উদ্বোধনের কর্মসূচির সঙ্গে মিল রেখে সফরটি আয়োজন করা হয়েছিল।

আইফেল টাওয়ারের কর্মীদের অভিযোগ, প্রতিনিধিদলটি আসার সময় কয়েকজন নারী কর্মীকে তাদের নির্ধারিত দায়িত্ব থেকে সরে যেতে বলা হয়। কিছু ক্ষেত্রে তাদের জায়গায় পুরুষ কর্মীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রতিনিধিদলের সদস্যদের সঙ্গে নারী কর্মীদের সরাসরি যোগাযোগ এড়াতে তাদের নির্দিষ্ট কিছু এলাকা থেকেও দূরে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ কর্মীদের।

এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদে নামেন কর্মীরা। তাদের ভাষ্য, কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর অনুরোধের কারণে একজন কর্মীকে শুধু নারী হওয়ার কারণে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা হলে তা কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শামিল। এ কারণেই শেষ পর্যন্ত তারা ধর্মঘটে যান।

আইফেল টাওয়ার পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে। কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে নারী কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত রাখার অনুরোধ করা হয়েছিল। সেই অনুরোধ গ্রহণ করে নারী কর্মীদের সরিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা ঠিক হয়নি বলেও স্বীকার করেছে তারা।

কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নারী ও পুরুষের সমতা ফরাসি প্রজাতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ। কর্মীদের লিঙ্গের ভিত্তিতে এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। কীভাবে ঘটনাটি ঘটল এবং কার সিদ্ধান্তে নারী কর্মীদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে, ধর্মীয় সংগঠনটির পক্ষ থেকেও ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, প্রায় ১০০ সদস্যের বড় দল হওয়ায় অন্য দর্শনার্থীদের অসুবিধা এড়াতে দিনের শুরুতে তাদের সফরের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাদের জানা অনুযায়ী, কাউকে আইফেল টাওয়ারে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়নি। তবে এ ঘটনায় কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে বা অসুবিধায় পড়লে তারা দুঃখ প্রকাশ করেছে।

এখন মূল প্রশ্ন হলো, নারী কর্মীদের সরিয়ে রাখার সিদ্ধান্তটি প্রতিনিধিদলের সরাসরি নির্দেশে হয়েছিল কি না, নাকি তাদের কোনো অনুরোধকে আইফেল টাওয়ার কর্তৃপক্ষ নিজেদের সিদ্ধান্ত হিসেবে বাস্তবায়ন করেছিল। তদন্তে এ বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার কথা।

ঘটনাটি ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তবে এটিকে ফ্রান্সে হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ফ্রান্সে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ ধর্ম নিষিদ্ধ করা নয়। বরং রাষ্ট্র সব ধর্মের প্রতি নিরপেক্ষ থাকবে এবং প্রত্যেক নাগরিককে নিজের ধর্ম পালন ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা দেবে। একই সঙ্গে কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস বা অনুরোধের কারণে অন্য নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও সমতা ক্ষুণ্ন করা যাবে না।

আইফেল টাওয়ারের ঘটনাতেও মূল প্রশ্ন ধর্মীয় বিশ্বাস বা হিন্দু ধর্মীয় আচরণ নয়। প্রশ্ন হলো, একটি ধর্মীয় প্রতিনিধিদলের অনুরোধের কারণে নারী কর্মীদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা কতটা গ্রহণযোগ্য এবং তা ফরাসি আইন ও প্রজাতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘হিন্দুদের কারণে আইফেল টাওয়ার বন্ধ’ ধরনের বক্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এমন বক্তব্য ঘটনাটিকে অতিরঞ্জিত ও সাধারণীকরণ করে। প্রকৃতপক্ষে, ঘটনাটি একটি নির্দিষ্ট প্রতিনিধিদলের সফর এবং সেই সফরকে কেন্দ্র করে আইফেল টাওয়ার কর্তৃপক্ষের নেওয়া সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা বা কয়েকজন ব্যক্তির আচরণকে পুরো হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ধর্মীয় প্রতিনিধিদলের ওপর চূড়ান্ত দায় চাপানোও যথাযথ হবে না।

আইফেল টাওয়ারের ঘটনাটি শুধু এক দিনের ধর্মঘট কিংবা একটি পর্যটন স্থাপনা বন্ধ থাকার বিষয় নয়। এটি ফ্রান্সের বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, কর্মক্ষেত্রের অধিকার এবং নারী-পুরুষের সমতার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে, সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।

ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সম্মান দেখানো যেমন একটি গণতান্ত্রিক সমাজের দায়িত্ব, তেমনি কোনো কর্মীকে শুধু নারী হওয়ার কারণে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে না দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। কার পক্ষ থেকে কী অনুরোধ করা হয়েছিল, কে সেই অনুরোধ গ্রহণ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে পরবর্তী পদক্ষেপ।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সোমবার কর্মীদের ধর্মঘটের কারণে পুরো দিন বন্ধ থাকার পর মঙ্গলবার থেকে আইফেল টাওয়ারের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার সিদ্ধান্ত হয়েছে। স্থাপনাটি আবার দর্শনার্থীদের জন্য খুলে গেলেও ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নারী-পুরুষের সমতার সম্পর্ক নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক আরও কিছুদিন চলতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত