হিন্দু ধর্মীয় সফর ঘিরে নারী কর্মী সরানো, ধর্মঘট শেষে চালু আইফেল টাওয়ার

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১৯ পিএম

হিন্দু ধর্মীয় একটি প্রতিনিধিদলের ব্যক্তিগত সফরের সময় নারী কর্মীদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখার অভিযোগে কর্মীদের ধর্মঘটের কারণে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বন্ধ ছিল প্যারিসের বিশ্বখ্যাত আইফেল টাওয়ার। শনিবারের ওই সফরকে কেন্দ্র করে কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। পরে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক ও প্রতিবাদের অংশ হিসেবে কর্মীরা ধর্মঘটে গেলে দিনভর দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ থাকে ফ্রান্সের অন্যতম প্রধান পর্যটন স্থাপনাটি। ঘটনাটি নিয়ে প্যারিস কর্তৃপক্ষ তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বন) থেকে আইফেল টাওয়ার আবার দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।

ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের আধ্যাত্মিক সংগঠন বোচাসনবাসী অক্ষর পুরুষোত্তম স্বামীনারায়ণ সংস্থার সঙ্গে যুক্ত প্রায় একশ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। গত শনিবার দলটি আইফেল টাওয়ারে ব্যক্তিগত সফরে যায়। ফ্রান্সের উপকণ্ঠে সংগঠনটির একটি বড় মন্দির উদ্বোধনের কর্মসূচির সঙ্গে মিল রেখে সফরটি আয়োজন করা হয়েছিল।

আইফেল টাওয়ারের কর্মীদের বক্তব্য, প্রতিনিধিদলটি আসার সময় কয়েকজন নারী কর্মীকে তাদের নির্ধারিত দায়িত্ব থেকে সরে যেতে বলা হয়। কিছু ক্ষেত্রে তাদের পরিবর্তে পুরুষ কর্মীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কর্মীদের আরও অভিযোগ, প্রতিনিধিদলের সদস্যদের সঙ্গে নারী কর্মীদের সরাসরি যোগাযোগ এড়াতে তাদের নির্দিষ্ট কিছু এলাকা থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। এ ঘটনায় কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। কর্মীদের ভাষ্য, ধর্মীয় কোনো গোষ্ঠীর অনুরোধের কারণে একজন কর্মীকে শুধু নারী হওয়ার কারণে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা হলে তা কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শামিল। এ কারণেই তারা প্রতিবাদে নামেন এবং শেষ পর্যন্ত ধর্মঘট করেন।


আইফেল টাওয়ার পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছে। কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে নারী কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত রাখার অনুরোধ করা হয়েছিল এবং সেই অনুরোধ গ্রহণ করে নারী কর্মীদের সরিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা ঠিক হয়নি। কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নারী ও পুরুষের সমতা ফরাসি প্রজাতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ। কর্মীদের লিঙ্গের ভিত্তিতে এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। ঘটনাটি কীভাবে ঘটল এবং কার সিদ্ধান্তে নারী কর্মীদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।


অন্যদিকে, ওই ধর্মীয় সংগঠনের পক্ষ থেকেও ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, প্রায় একশ সদস্যের বড় দল হওয়ায় অন্য দর্শনার্থীদের অসুবিধা এড়াতে দিনের শুরুতে তাদের সফরের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সংগঠনটি জানিয়েছে, তাদের জানা অনুযায়ী কাউকে আইফেল টাওয়ারে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়নি। তবে এই ঘটনার কারণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে বা অসুবিধায় পড়লে তারা দুঃখ প্রকাশ করেছে। ফলে নারী কর্মীদের সরিয়ে রাখার সিদ্ধান্তটি প্রতিনিধিদলের সরাসরি নির্দেশে হয়েছিল, নাকি তাদের কোনো অনুরোধকে আইফেল টাওয়ার কর্তৃপক্ষ নিজেদের সিদ্ধান্ত হিসেবে বাস্তবায়ন করেছিল, তা এখন তদন্তের বিষয়। ঘটনাটি ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তবে এটিকে ফ্রান্সে হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ফ্রান্সে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ ধর্ম নিষিদ্ধ করা নয়। বরং রাষ্ট্র সব ধর্মের প্রতি নিরপেক্ষ থাকবে এবং প্রত্যেক নাগরিককে নিজের ধর্ম পালন ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা দেবে। একই সঙ্গে কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস বা অনুরোধের কারণে অন্য নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও সমতা ক্ষুণ্ন করা যাবে না।


আইফেল টাওয়ারের ঘটনাতেও মূল প্রশ্ন তাই হিন্দু ধর্মের বিশ্বাস বা ধর্মীয় আচরণ নয়। মূল প্রশ্ন হলো, একটি ধর্মীয় প্রতিনিধিদলের অনুরোধের কারণে নারী কর্মীদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা কতটা গ্রহণযোগ্য এবং ফরাসি আইন ও প্রজাতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে তা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘হিন্দুদের কারণে আইফেল টাওয়ার বন্ধ’ ধরনের বক্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এমন বক্তব্য বাস্তব ঘটনাকে অতিরঞ্জিত ও সাধারণীকরণ করে। প্রকৃতপক্ষে, ঘটনাটি একটি নির্দিষ্ট প্রতিনিধিদলের সফর এবং সেই সফরকে কেন্দ্র করে আইফেল টাওয়ার কর্তৃপক্ষের নেওয়া সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা বা কয়েকজন ব্যক্তির আচরণকে পুরো হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ধর্মীয় প্রতিনিধিদলের ওপর চূড়ান্ত দায় চাপানোও যথাযথ হবে না। আইফেল টাওয়ারের এই ঘটনা শুধু এক দিনের ধর্মঘট কিংবা একটি পর্যটন স্থাপনা বন্ধ থাকার ঘটনা নয়। এটি ফ্রান্সের বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, কর্মক্ষেত্রের অধিকার এবং নারী-পুরুষের সমতার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে, সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে। ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সম্মান দেখানো যেমন একটি গণতান্ত্রিক সমাজের দায়িত্ব, তেমনি কোনো কর্মীকে শুধু নারী হওয়ার কারণে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে না দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কার পক্ষ থেকে কী অনুরোধ করা হয়েছিল, কে সেই অনুরোধ গ্রহণ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে পরবর্তী পদক্ষেপ।

৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী আইফেল টাওয়ার আবার খুলেছে স্বাভাবিকভাবে খোলার কথা রয়েছে। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) কর্মীদের ধর্মঘটের কারণে পুরো দিন দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ ছিল। এদিন কর্তৃপক্ষ ও কর্মী প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠকের পর ধর্মঘট এক দিনের মধ্যেই শেষ হয়েছে এবং মঙ্গলবার সকালে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আইফেল টাওয়ার আবার দর্শনার্থীদের জন্য খুলে গেলেও ঘটনাটি ফ্রান্সে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নারী-পুরুষের সমতার সম্পর্ক নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি করেছে, তা আরও কিছুদিন চলবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত