ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে ইতালিতে গিয়ে চরম হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে। বাংলাদেশ সময় সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক ভিডিওবার্তায় বাঁধন অভিযোগ করেন, ইতালির মেস্ট্রেতে আওয়ামী লীগের কর্মী পরিচয় দেওয়া কয়েকজন ব্যক্তি তাকে হেনস্তা করেছেন। তার গায়ে পানি, কোক ও অন্যান্য পানীয় ছুড়ে মারা হয়েছে এবং তাকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এরইমধ্যে সেখানে মামলাও করেছেন এই লাক্সকন্যা।
বাঁধনের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় তার ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী এবং চার বছরের কম বয়সী এক শিশুও সঙ্গে ছিল। শিশুটি ভয় পেয়ে কান্না করছিল বলেও ভিডিওবার্তায় জানান তিনি। অভিনেত্রী বলেন, তাকে জোর করে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তার ফোন ফেলে দেওয়া হয়েছে এবং কানের কাছে আঘাত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন এই অভিনেত্রী।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের উৎসবের মতো এমন একটি আন্তর্জাতিক আয়োজনে একজন বাংলাদেশি অভিনেত্রীকে ঘিরে এ ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি বিষয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। বাঁধনের ওপর হামলাকে তার জন্য এক ধরনের অর্জন ও সম্মান হিসেবে উল্লেখ করেন জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন,‘আজমেরী হক বাঁধনের উদ্দেশে বলব, এটা এক ধরনের কী বলব, তার অর্জন, সম্মান প্রাপ্তি যে, আওয়ামী লীগের হেনস্তা হওয়ার শিকার হওয়া, একটা মাফিয়া গ্যাংয়ের শিকার হওয়া প্রমাণ করে আপনি আসলে সঠিক পথে ছিলেন।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় আহবায়ক কমিটির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম বাঁধনকে উদ্দেশ করে ফেসবুকে লিখেছেন, যারা আপনাকে আক্রমণ করেছে তাদেরকে আপনি ‘বাঙালি ভাই’ হিসেবে সম্বোধন করেছেন। তারা যতটা না বাঙালি ভাই তার চেয়ে বেশি খুনিদের দালাল, বিবেকবোধ বিক্রি করে দেয়া একেকটা নরপশু। খুনি হাসিনা যদি ওই চৌদ্দশ মানুষের মতো তাদের সন্তানদের ভাইদের খুন করত তারপরও তারা খুনি হাসিনার দালালি করত, পা চাটত। এদের শুধু মানুষের মতো একটা দেহ আছে, মনুষ্যত্ব পঁচে গেছে। এদের থেকে আপনি এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করবেন না। বাঁধনকে সান্ত্বনা দিয়ে সারজিস লেখেন, ‘এসবের জন্য বিন্দুমাত্র কষ্ট পাবেন না। নরপশুদের থেকে এর চেয়ে ভালো আর কী প্রত্যাশা করা যায়? আমরা সবাই আপনার সঙ্গে আছি। পুরো বাংলাদেশ আপনার সঙ্গে।’
তীব্র নিন্দা জানিয়ে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, রেহানা মরিয়ম নূর আমাদের বোন। লীগ যদি মনে করে এইরকম বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ করে জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার পক্ষে অবস্থান নেয়া মানুষদের মোরালকে নষ্ট করে দিতে পারবে তাহলে তারা মূলত কল্পনার স্বর্গে বসবাস করছে। এর বাইরেও, যেসব ব্যক্তিবর্গ এই সন্ত্রাসী ও খুনী লীগের সঙ্গে ‘রিকনসিলিয়েশন’-এর কথা বলে থাকেন আমরা মনে করি তাদের উদ্দেশ্য অসৎ। আমি বাংলাদেশ সরকারকে জুলাইয়ে যেসব আর্টিস্ট রাজপথে নেমেছিলেন অথবা মৌন সমর্থন দিয়েছিলেন তাদের নিরাপত্তার দিকে নজর দেয়ার আহবান জানাচ্ছি।’
অভিনেতা ও উপস্থাপক শাহরিয়ার নাজিম জয় শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়েছে লিখেছেন, ‘দেশে এবং বিদেশে দলমত নির্বিশেষে সকল শিল্পীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবী রইল। মব কে সমর্থন করিনি। কখনো করবও না। ‘আর কোন শিল্পী বিপদে পড়লে সহ শিল্পী হিসেবে আপনি হাইসেন না। আপনার বেলায় যারা হেসেছিল তারাও অন্যায় করেছিল। কোথাও না কোথাও থামতে হয়। শিল্পীরা ঐক্যবদ্ধ থাকুন। শিল্পীদের ঐক্যবদ্ধ রাখুন।’
আরেক লাক্সতারকা অভিনেত্রী জাকিয়া বারী মম দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘কিচ্ছু ঠিক হচ্ছে না! এই কর্মকাণ্ডগুলোর কোনোটাই ভালো হচ্ছে না!’ নারীর প্রতি অসম্মান, ভিন্নমতের মানুষের ওপর নির্যাতন, রাজনৈতিক অন্ধ আনুগত্য, সহিংসতা ও নাগরিক নিরাপত্তাহীনতার কথা উল্লেখ করে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশ আরও ভয়াবহ সংকটের দিকে যেতে পারে। মডেল, অভিনেত্রী ও আইনজীবী পিয়া জান্নাতুলও নারী ও শিল্পীদের প্রতি মানুষের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেলিখেছেন, মানুষ দিন দিন বিশেষ করে নারী ও শিল্পীদের প্রতি আরও নিষ্ঠুর ও সংবেদনহীন হয়ে উঠছে। পিয়ার ভাষায়, প্রকৃত উন্নতি বোঝা যায় একজন মানুষ অন্যকে কতটা সম্মান করতে পারে এবং কতটা মানবিক থাকতে পারে—সেখানেই।
মডেল-অভিনেত্রী সাফা কবির বলেন, ‘একজন শিল্পী যখন দেশের বাইরে একটি চলচ্চিত্র উৎসবে নিজের চলচ্চিত্র ও দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে যান, তখন তার প্রাপ্য হওয়া উচিত সম্মান ও নিরাপত্তা—অপমান, হয়রানি বা আতঙ্ক নয়। তার ভাষায়, রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে শিল্পীদের টেনে আনা দুঃখজনক। একজন শিল্পীর কণ্ঠ, সম্মান ও নিরাপত্তা কখনোই রাজনীতির মূল্য হওয়া উচিত নয়।’ চিত্রনায়িকা পরীমনিও ঘটনার ভিডিও শেয়ার করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার প্রতিক্রিয়ায় বিশেষভাবে উঠে আসে ঘটনার সময় উপস্থিত ছোট শিশুটির কান্নার বিষয়টি। তিনি বলেছেন, ‘বেশি কিছু না। কতগুলা কুকুরের বাচ্চা রাস্তায় ঘেউ ঘেউ করছে। এদের কাছে মানুষের বাচ্চার কান্না কিছুই ম্যাটার করে না। করেও নাই।’
অভিনেত্রী মৌসুমী হামিদ লিখেছেন, ‘এই দেশে শিল্পী হওয়াটাও পাপের। কারণ শিল্পীরাই দেখি সবচেয়ে বড় রাজনীতিবিদ হিসেবে কথা বলছেন। কোনো শিল্পীর ওপর হামলাই কাম্য নয়। সেটা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে হোক কিংবা ভেনিসে কোনো ক্ষেত্রেই হামলাকে সমর্থন করা উচিত নয়। জীবনে কোনো রাজনৈতিক দল করিনি। তবে দেশের ভালো-মন্দ ও পরিস্থিতি নিয়ে সবসময় কথা বলি। যদি কেউ মনে করেন অতীতে ৩২ নম্বরে একজনের কাপড় টেনে ছেঁড়া হয়েছিল বলে এখন অন্য একজনের কাপড় টেনে ছেঁড়ার অধিকার কোনো রাজনৈতিক দলের আছে, তাহলে তারা কী ধরনের নেতৃত্বের কথা বলছেন সেটি নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। ‘শিল্পী হয়ে মানুষকে তার মনুষ্যত্ব দিয়ে বিচার করা ভুলে আমরা শুধু মাত্র দল দিয়ে বিচার করা শিখছি।’
তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন আলোচিত উপস্থাপক দীপ্তি চৌধুরী। রাজনৈতিক ছত্রছায়াহীন সাধারণ নাগরিক হওয়ার কারণেই বাঁধন এমন সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেয়া এক স্ট্যাটাসে দীপ্তি চৌধুরী বাঁধনের ওপর আক্রমণের কারণ হিসেবে কয়েকটি পয়েন্টও তুলে ধরেন। স্ট্যাটাসে দীপ্তি চৌধুরী লেখেন, ‘আজমেরী হক বাঁধনের অপরাধ- একটি গণঅভ্যুত্থানে তার একটি স্টেন্ড পয়েন্ট ছিল- যা ছবির লোকগুলোসহ আরও হাজার হাজার মানুষের আদর্শের সাথে মেলেনি। বাঁধন রাষ্ট্র কর্তৃক শিশু হত্যার প্রতিবাদে রাজপথে ছিল, প্রোফাইল লাল করেছিল। বাঁধন কোনো রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নেই। বাঁধন বেডি মানুষ; তাই সে সবচেয়ে সহজ টার্গেট।'