যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর কানাডার নতুন শুল্ক আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। কানাডীয় সংবাদমাধ্যম সিবিসি নিউজ জানিয়েছে, গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় সময় মধ্যরাত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরোপিত শুল্ক আদায় শুরু হয়েছে। টানা দ্বিপক্ষীয় আলোচনা সত্ত্বেও কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারায় কানাডার প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার মূল্যের আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই পদক্ষেপের পর কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানিয়েছিলেন, অটোয়াও সমপরিমাণ অর্থাৎ ‘ডলারের বিপরীতে ডলার’ হিসেবে পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, নতুন শুল্কের আওতায় রয়েছেÑ পোশাক, পনির, ধাতব যন্ত্রাংশ এবং কাঠজাত পণ্য। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের দুই মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ আরও তীব্র হলো।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে প্রতি বছর হওয়া মোট বাণিজ্যের তুলনায় মাত্র একটি ছোট অংশের ওপর কার্যকর হয়েছে এই নতুন শুল্ক। তাই আপাতত পাল্টাপাল্টি শুল্কের অর্থনৈতিক প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো এর ফলে পাল্টা প্রতিশোধের একটি চক্র শুরু হতে পারে। সেই চক্রে দুই দেশ আরও বেশি এবং আরও বিস্তৃত শুল্ক আরোপ করতে পারে, যা সীমান্তের দুই পাশের নাগরিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। নিজ দেশে তিনি নিজেকে ট্রাম্পের বাণিজ্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। চলমান এই পরিস্থিতিকে কার্নি ‘যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা কানাডার অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ে উপহাস করেছেন। কানাডা থেকে আমদানি করা গাড়িতে আরও শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। গত শুক্রবার তিনি বলেছেন, দুই দেশের বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এমন সম্ভাবনাও আছে। কানাডার বিমান কোম্পানি বোম্বার্ডিয়ারের বিরুদ্ধেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। কানাডার নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক মাধ্যমে ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রে বোম্বার্ডিয়ারের আর বিমান বিক্রি হতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের কানাডার কিছু পণ্য না কেনার আহ্বান জানান।
দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে ফিরেই বিশ্বের প্রায় সব দেশের ওপরই শুল্কের বোঝা চাপিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনকি ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও তার শুল্কের খড়গ থেকে রেহাই পায়নি। কানাডার সঙ্গে এই বিরোধ আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে বাণিজ্য নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ চাপ প্রয়োগের কৌশল থেকে ট্রাম্প এখনো একটুও সরে আসেননি। প্রায় দুই বছর একের পর এক বড় আইনি পরাজয়, তীব্র আন্তর্জাতিক বিরোধ এবং দেশের ভেতরে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখেও শুল্কই রয়ে গেছে প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে পছন্দের হাতিয়ার।
ন্যাশনাল ফরেন ট্রেড কাউন্সিলের বাণিজ্য ও উদ্ভাবনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক ব্র্যাড উড বলেন, এই পাল্টাপাল্টি প্রতিশোধ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না। মন্ট্রিয়লের ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ জুলিয়ান কারাগুয়েসিয়ান সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে বলেন, ৫০ শতাংশের মতো এত চড়া শুল্কের কারণে কানাডার শত শত পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে কার্যত ছিটকে পড়বে, যা দেশটির অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় ধরনের আঘাত হিসেবে দেখা দেবে।