চ্যাম্পিয়নস লিগের রাতে ফুটবল যে কতটা রোমাঞ্চকর, আবার একই সঙ্গে কতটা অদ্ভুত ও যুক্তিহীন হতে পারে, তার এক অবিশ্বাস্য প্রদর্শনী দেখে ফেলল সান্তিয়াগো বার্নাব্যু। সাবেক ক্লাব ইন্তার মিলানের বিপক্ষে রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউটে হোসে মরিনহোর এই প্রত্যাবর্তনী ম্যাচটি কেবল গোলের লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল দুই গোলকিপারের অতিমানবিক পারফরম্যান্স আর ভুলের এক অদ্ভুত অধ্যায়।
পুরো ম্যাচে ৩৭টি শটের ফুলঝুরি ছুটলেও শেষ পর্যন্ত থিবো কোর্তোয়ার শেষ মুহূর্তের অসামান্য এক সেভে ভর করে ২-১ গোলের কষ্টার্জিত জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে রিয়াল।
তবে এই জয় পেলেও দলের পারফরম্যান্সে একেবারেই সন্তুষ্ট নন পর্তুগিজ মাস্টারমাইন্ড। ম্যাচ শেষে রিয়ালের কৌশলগত দুর্বলতা এবং রক্ষণভাগের আত্মঘাতী ভুলগুলো নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে কোচ মরিনহো সংবাদমাধ্যমে বলেন, ‘এটি পাগলামি ছিল, আর এটি এমন কোনো পাগলামি নয় যা আমার পছন্দ।’
ম্যাচটিতে পরিসংখ্যানের দিক থেকে যোজন যোজন এগিয়ে ছিল ইতালিয়ান ক্লাবটি। বল দখল থেকে শুরু করে আক্রমণ, সবক্ষেত্রেই রিয়ালকে কোণশাসা করে রেখেছিল ইন্তার। তবে প্রথমার্ধে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের হাস্যকর কিছু ভুলের সুযোগ নিয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং ফেদে ভালভার্দের গোলে অবিশ্বাস্যভাবে ২-০ লিড পেয়ে যায় রিয়াল।
প্রথমার্ধের শুরুতেই ম্যাচের ১৪ মিনিটে ইন্তার শিবিরে প্রথম ধাক্কাটি দেয় রিয়াল। কার্টিস জোন্সের একটি দুর্বল পাস বিপদে ফেলে দেয় ইয়ান বিসেকশকে। সেই সুযোগে ব্রাহিম দিয়াজ দ্রুত বল বাড়িয়ে দেন এমবাপ্পের পায়ে, আর সুযোগ সন্ধানী ফরাসি এই তারকা দারুণ শটে বল জালে জড়িয়ে রিয়ালকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন।
এর কিছুক্ষণ পরেই ইন্তার গোলকিপারের অবিশ্বাস্য ভুলে ব্যবধান দ্বিগুণ করে লস ব্লাঙ্কোসরা। ম্যাচের ২২ মিনিটের মাথায় ভালভার্দে তেড়ে আসার পরও গোলকিপার জোসেপ মার্তিনেজ বক্সে বল নিয়ে অতিরিক্ত সময় নষ্ট করেন। যখন ভুল বুঝতে পেরে তিনি টার্ন নেওয়ার চেষ্টা করেন, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে; ভালভার্দে বল কেড়ে নিয়ে সহজেই ফাঁকা জালে বল ঠেলে দেন।
ম্যাচের ওই উন্মাতাল পরিস্থিতি ও গোলের সুযোগগুলোর কথা স্মরণ করে মরিনহো সংবাদমাধ্যমের সামনে আরও বলেন, ‘স্কোরটা ৫-১ হতে পারত, কিংবা ৬-৬। আমি এমনটা বলতে চাই না যে তারা জিতে যেতে পারত।’
প্রথমার্ধের শেষ দিকে ব্যবধান আরও বাড়াতে পারত রিয়াল। এমবাপ্পে গতির ঝড়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে বেরিয়ে গেলেও গোলকিপার মার্তিনেজ প্রথমে তার শট ঠেকিয়ে দেন এবং ফিরতি বলে জুড বেলিংহামের পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জের নিশ্চিত শটটি অবিশ্বাস্যভাবে রুখে দেন। বিরতির পর ঘণ্টা পেরোনোর আগে বেলিংহাম আরও একটি সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেন।
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে ইন্তার লড়াইয়ে ফেরার চেষ্টা করলে কোর্তোয়া আবারও দেয়াল হয়ে দাঁড়ান। আদ্রিয়েন বাস্তোনির নিচু শটটি দারুণ দক্ষতায় প্রতিহত করেন তিনি। তবে ম্যাচের ৭৭ মিনিটে ঠিকই সফল হয় তারা। লাউতারো মার্তিনেজের বাড়িয়ে দেওয়া নিখুঁত ক্রস থেকে জোরালো শটে বল জালে পাঠান কার্লোস আগুস্তো, যা ম্যাচের শেষ মুহূর্তে রিয়ালের শিবিরে দারুণ উত্তেজনার জন্ম দেয়।
এদিকে নতুন নিয়মে ম্যাচ চলাকালীন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র বদলি হিসেবে মাঠ ছাড়তে দেরি করায় আলভারো কারেরাসকে সাইডলাইনে এক মিনিট অপেক্ষা করতে দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন রিয়াল সমর্থকরাও। তবে ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে হেনরিখ মিখিতারিয়ানের একটি ডিফ্লেক্টড শট কোর্তোয়া দুর্দান্তভাবে প্রতিহত না করলে পূর্ণ তিন পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারত না স্বাগতিকরা।
দলের এই অবিশুদ্ধ জয় ও রক্ষণভাগের পারফরম্যান্স নিয়ে ম্যাচের পর কোর্তোয়ার ভূয়সী প্রশংসা করে মরিনহো আরও বলেন, ‘যদি সে আজ ম্যান অব দ্য ম্যাচ না হয়, তবে সে কখনই হবে না।’
ইন্তারের ফুটবলাররা ম্যাচ শেষে বলতেই পারেন যে তাদের প্রাপ্য বিচার মেলেনি, বিশেষ করে যখন জুড বেলিংহাম নিজে স্বীকার করেছেন তিনি দুটি সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেছেন। কিন্তু চ্যাম্পিয়নস লিগের মঞ্চে রিয়াল মাদ্রিদের এই ভাগ্য আর কোর্তোয়ার দেয়াল ভেদ করা যে কারোর জন্যই বরাবরই এক অসম্ভব মিশন। মাঠের খেলায় চরম বিশৃঙ্খলা আর স্নায়ুক্ষয়কারী উত্তেজনার মধ্য দিয়ে শুরু হলেও পূর্ণ তিন পয়েন্ট নিয়েই মাঠ ছাড়ল লস ব্লাঙ্কোসরা।
হংকংকে ছয় গোল দিয়ে টানা চতুর্থ জয় হকি কন্যাদের