আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, দার্শনিক এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞান লেখক লরেন এইসেলি বলেছেন, ‘পৃথিবীতে কোনো জাদু থাকলে, তা লুকিয়ে আছে পানিতে’। অথচ আমাদের দেশে অবলীলায় পানির উৎস কিংবা আধারগুলো বলবান-লোভাতুর-অবিমৃষ্যকারীরা কীভাবে বিনাশ করে চলেছে আইন ও প্রশাসনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে, এরই ফের নজির মিলেছে ১০ আগস্ট দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে। ‘পুকুরখেকোদের কাছে অসহায় রাজশাহীর প্রশাসন’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুকুর ভরাট ঠেকাতে প্রশাসনের অভিযান, বালু-মাটি তুলে পুনরুদ্ধার সবই হয়েছে। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই সেই পুকুর আবারও ভরাট হয়ে গেছে। রাজশাহী নগরীর মোল্লাপাড়া এলাকার প্রায় দুই বিঘা আয়তনের একটি পুকুরের এ ঘটনা যেন নগরীর জলাধার রক্ষায় প্রশাসনের অসহায়ত্বেরই উদাহরণ। আইন থাকলেও কার্যকর প্রয়োগের অভাবে একের পর এক পুকুর ভরাট করে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন, মার্কেট ও আবাসিক স্থাপনা। একসময় রাজশাহী শহরে ছিল কয়েক হাজার পুকুর। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে ২০০-এর কাছাকাছি নেমে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
রাজশাহীর এই চিত্র খণ্ডিত নয়, বরং সারাদেশের অখণ্ড চিত্রই এমন গাঢ়-বিবর্ণ। মহানগর-নগর-শহর তো বটেই, মফস্বলেও প্রকৃতিবিনাশী এই অভিঘাত চলছে দাপটে। তাতে যে শুধু প্রকৃতির ওপরই ছোবল পড়ছে তা-ই নয়, এই অপকা-ের বৈরী প্রভাব বহুমুখী হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিস্ময়কর কিন্তু অসত্য নয়, অতীতে দেশের অনেক এলাকায় উন্নয়নের নামে সরকারি অনুদানে পুকুর কিংবা জলাশয় ভরাটের নজির রয়েছে। আমরা জানি, পুকুর শুধু পানি ধরে রাখার জায়গা নয়, প্রতিটি পুকুরের নিজস্ব একটি প্রতিবেশ ব্যবস্থা রয়েছে। বৃষ্টির সময় পুকুর প্রাকৃতিকভাবে পানি ধারণ করে। একই সঙ্গে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও জলাধার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জীবনের জন্য যেমন, তেমনি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায়ও পানির অপরিহার্যতা রয়েছে। পুকুর বা জলাশয় কমে গেলে জীববৈচিত্র্যেরও ক্ষতি স্ফীত হবে। সব দিক বিবেচনায় পুকুর ভরাটের প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক। রাজশাহীতে প্রশাসন পুকুরখেকোদের নিবৃত্ত করতে পারছে না কেন তা প্রশ্নবোধক। এ নিয়ে সেখানে যে ‘চোর-পুলিশ’ খেলা চলছে এর প্রতিবিধানে উচ্চপর্যায়ের হাত বাড়ানো জরুরি বলে আমরা মনে করি।
আমরা পুকুর কিংবা যেকোনো জলাশয় দখল-ভরাটসহ এ সংক্রান্ত নেতিবাচক সব রকম অপকা-ের যথাযথ তাৎক্ষণিক প্রতিকারের দাবি জানানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল প্রত্যেককের জবাবদিহি-দায়বদ্ধতার ওপর জোর দিই। আইন-নীতিমালা লঙ্ঘন করে রাজশাহী তো বটেই, দেশের যে স্থানেই এমন দুর্বৃত্তপনা চলছে এর প্রতিবিধানে প্রশাসনের নির্মোহ ও কঠোর অবস্থানের বিকল্প নেই। আইনের চেয়ে ব্যক্তি বা মহল বিশেষের হাত লম্বা হতে পারে না। আমরা মনে করি, দায়িত্বশীলদের গাফিলতি-ব্যর্থতা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসাধুদের ভিন্ন সমীকরণের কারণেই এমন সর্বনাশা কর্মকা-ের পথ উন্মুক্ত হয়ে আছে।
জলাশয় সুরক্ষায় দেশে কঠোর আইন আছে। ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকা পুকুর ভরাটের ওপরে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া আছে আইনে। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, কেউ আইন মানছে না। যাদের আইন প্রয়োগ করার কথা, তাদেরও এ ব্যাপারে তেমন তৎপরতা নেই। আছে নানা সংকট ও সীমাবদ্ধতাও। যে কারণে রাজশাহীর সর্বসাম্প্রতিক এই অবস্থা।
পুকুর ভরাট বন্ধে অবিলম্বে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এ সংক্রান্ত যেসব আইন রয়েছে, এর প্রয়োগ ঘটাতে হবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে ওঠে। পুকুর ভরাটকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পুকুর ভরাটের ভয়াবহতা সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে নাগরিক প্রতিরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচির বিস্তার ঘটানোও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।