বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার আফরা গ্রামের মরিয়ম বেগম (৫০) সম্প্রতি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি ডাক্তার দেখাতে কোথায় যাবেন বুঝতে পারছিলেন না। পরে খোঁজ নিয়ে গেলেন গ্রামের বাজারে ফার্মেসিতে চিকিৎসা দেওয়া একজনের কাছে। তার ভিজিট ৫০ টাকা। এই টাকাও মরিয়মের কাছে অনেক বেশি। কিন্তু উপায় ছিল না। ওই ব্যক্তি প্রেশার মেপে জানালেন, প্রেশার বেশি। নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে। ওষুধও খাওয়া শুরু করলেন। একটু ভালো অনুভব করতেই ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন তিনি। তার ধারণায় ছিল না ওষুধ খাওয়া বন্ধ করলে আবার প্রেশার বাড়তে পারে। একপর্যায়ে প্রেসার বেড়ে ব্রেনস্ট্রোক করে মারা যান মরিয়ম।
দেশে এখনো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দুর্লভ। সরকারিভাবে যথাযথ প্রাথমিক সেবা পাওয়া গেলে এবং রোগ সম্পর্কে ধারণা থাকলে মরিয়মের হয়তো এভাবে অকালে চলে যেতে হতো না। শুধু মরিয়ম নন; দেশের বহু মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। যথাযথ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা না পেয়ে জীবনঝুঁকিতে রয়েছেন তারা।
মানুষের নাগালের মধ্যে, বিশেষ করে গ্রামপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা এখনো নিশ্চিত হয়নি। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার মতো অনুমোদিত স্বাস্থ্যকর্মী গ্রামপর্যায়ে পর্যাপ্ত নেই। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পেতে মানুষকে ছুটতে হয় ফার্মেসিতে। না হলে উপজেলা শহরের প্রাইভেট ডাক্তারের চেম্বার, প্রাইভেট ক্লিনিক কিংবা সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু এটা সময় ও ব্যয় সাপেক্ষ।
স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে ধারণা পাওয়া গেছে, দেশের তৃণমূলপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী সহজলভ্য না হওয়ায় অনেক মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। যে রোগ প্রাথমিক চিকিৎসা পেলে অল্পতেই সেরে যেত, যথাসময়ে চিকিৎসা না হওয়ায় তা কঠিন আকার ধারণ করছে। আবার চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে। ফলে টাকার অভাবে চিকিৎসা নিতে পারেন না অনেকে। এমন বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ^ প্রাথমিক চিকিৎসা দিবস। প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় শনিবার দিবসটি পালিত হয়।
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন অসংক্রামক রোগের বাড়তি চাপ। দেশে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, স্ট্রোক ও কিডনি রোগ দ্রুত বাড়ছে। অথচ এসব রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা এখনো ইউনিয়ন ও কমিউনিটি পর্যায়ে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। এ ছাড়া শহরাঞ্চলে কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অভাব, দক্ষ জনবলের সংকট, প্রয়োজনীয় ওষুধের অনিয়মিত সরবরাহ এবং স্বাস্থ্য বাজেটে সীমিত বরাদ্দও বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের মূল্যায়নে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক মানে বাংলাদেশ এখনো উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে। নরওয়ে, সুইডেন, যুক্তরাজ্য, জাপান ও থাইল্যান্ডের মতো দেশে প্রায় সব নাগরিক নিবন্ধিত পারিবারিক চিকিৎসকের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পান। থাইল্যান্ডের ইউনিভার্সাল কভারেজ স্কিমের কারণে দেশের অধিকাংশ মানুষ প্রথমে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নেন, এরপর প্রয়োজন হলে উচ্চতর হাসপাতালে রেফার করা হয়। বাংলাদেশে চিত্র ভিন্ন। সরকারি তথ্যানুযায়ী, দেশে ওয়ার্ডপর্যায়ে প্রায় ১৪ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও নেই প্রয়োজনীয় জনবল, প্রয়োজনীয় ওষুধ। চিকিৎসক না থাকায় সেখানে মানুষের যেতে অনাগ্রহ। তা ছাড়া এই কমিউনিটি ক্লিনিক ছয় হাজার মানুষের জন্য একটি করে স্থাপনের পরিকল্পনা হলেও এখন একেকটির অধীনে রয়েছেন আট হাজারের বেশি মানুষ। ফলে যথাযথ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তৃণমূলের মানুষ।
কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের সাবেক সভাপতি ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এমন একটি ব্যবস্থা যেটা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে। মানুষ সমাজ কর্তৃক গৃহীত হবে এবং এর ব্যবস্থাপনায় জনগণের সম্পৃক্ততা থাকবে। কিন্তু আমাদের দেশে তা নেই। কাগজ-কলমে আছে, বাস্তবে তেমন কিছু নেই। কারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর চেষ্টা হয়, কিন্তু মানুষ প্রকৃতপক্ষে উপকৃত হয় না। সমাজ ও মানুষ এই সেবাগুলো গ্রহণ করছে না। কারণ এ সেবাগ্রহণ করার মতো যথেষ্ট না। মানও নেই। প্রতিটি ক্লিনিকের জন্য কমিটি আছে। হাসপাতালের জন্য কমিটি আছে। একটা কমিটিও কাজ করে না। জনগণের প্রতিনিধি এসে এখানে সময় দেন না। দুদিক দিয়ে সমস্যা আছে।’
কোন বিষয়গুলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অন্তর্ভুক্ত সে সম্পর্কে ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে সাধারণ রোগ যেগুলো ডায়রিয়া, মাথাব্যথা, জ্বর, সর্দি, কাশি, শরীর ব্যথা এ রকম সাধারণ রোগের চিকিৎসা। আর যদি এর চেয়ে বেশি হয় তাহলে রেফার করা। আরেকটি হলো রোগ যাতে না হয়, এ জন্য মানুষকে সচেতন করা; রোগ সম্পর্কিত বিষয়ে জ্ঞান বৃদ্ধি করা; অপুষ্টি যাতে না হয়, এ জন্য পুষ্টি কীভাবে হয় কোন বয়সে কোন অবস্থায় পুষ্টি কী রকম হওয়া উচিত এ বিষয়ে জ্ঞান দেওয়া। তাহলে একটা হলো সাধারণ রোগের চিকিৎসা হবে, একটা হলো জ্ঞান দেওয়া হবে, আরেকটি হলো রোগ যাতে বিস্তৃত না হয় সে জন্য নজরদারিতে রাখতে হবে। সময়মতো এটাকে প্রতিরোধ করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যপর্যায়ে একটা কম্পোন্যান্ট আছে। বিদেশে দেখা যায়, যাদের বয়স হয়ে গেছে, তাদের জন্য সামাজিক স্বাস্থ্যের একটা অংশ আছে, যেটা ওদের বাড়িতে ওষুধ নিয়ে যায়, বাড়িতে গিয়ে প্রেশার-সুগার এগুলো পরীক্ষা করে যদি মনে করে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে, তাহলে হাসপাতালে নিয়ে যায়। এটা টিমওয়ার্ক। টিমের প্রাথমিক সদস্য হলো প্রাথমিক পরিচর্যায় যারা কাজ করেন তারা। এই অংশটা কিন্তু আমাদের দেশে নেই।’
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এমএ মুহিত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী স্বাস্থ্য বাজেটকে আমরা সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসে গত ৫০ বছরে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে। ইশতেহারে স্বাস্থ্য খাতে আমরা ২০টি অঙ্গীকার করেছি। অঙ্গীকারের একটি হচ্ছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া। আমাদের পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাটার ভিত্তি হবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। সেই কারণে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে আমরা ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। বিনামূল্যে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। ’
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ জোরদার, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও নার্সের শূন্যপদ দ্রুত পূরণ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় অসংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনা যুক্ত করা প্রভৃতি। এ ছাড়া উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগের প্রাথমিক স্ক্রিনিং উপজেলা ও ইউনিয়নপর্যায়ে সম্প্রসারণ, মাতৃত্ব ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা জোরদার, ডিজিটাল স্বাস্থ্য তথ্যব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং টেলিমেডিসিন সেবা বাড়ানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জেলা ও উপজেলাপর্যায়ে জরুরি স্বাস্থ্য নজরদারি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার কাজও শুরু করেছে, যাতে ডেঙ্গু, হাম ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
বর্তমানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সরকারের তিন ধরনের স্বাস্থ্যকর্মীরা দিয়ে থাকেন। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে এবং কমিউনিটি ক্লিনিকে তারা কাজ করেন। সব মিলিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য সারা দেশে কর্মী আছেন মাত্র ৪০ হাজার।
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের জনসংখ্যা তুলনায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য জনবল অত্যন্ত অপ্রতুল। তাই আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে আরও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া; যারা এই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সারা দেশে পৌঁছে দেবেন। স্বাস্থ্যকর্মীদের আমরা রিফ্রেশার ট্রেনিং এবং নতুন ট্রেনিং দেব। নতুনভাবে কিছু যন্ত্রপাতিসহ তাদের জন্য একটা কিট তৈরি করছি। সেই কিটের মাধ্যমে তারা বাড়ি বাড়ি গিয়েও অনেক ধরনের সেবা দিতে পারবেন এবং অনেক ধরনের তথ্য দিতে পারবেন। সামগ্রীও দিতে পারবেন। সুতরাং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাটাকে আমরা নগর ও গ্রামগঞ্জ দুই জায়গাতেই জোরদার করছি।’