অনলাইন প্রতারণার গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপ। এই অ্যাপটিকে হাতিয়ার বানিয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ঘাঁটি গেড়ে আর্থিক প্রতারণার নানা রকমের ছক কষছে বিদেশি একটি জালিয়াত চক্র। ওই চক্রে আছেন কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম, চায়নিজসহ পাঁচ-ছয়টি দেশের নাগরিক। নিজেদের দেশে টিকতে না পেরে তারা প্রতারণার ‘আস্তানা’ হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছেন। চট্টগ্রাম নগরের খুলশিতে দেড় মাস আগে দুবাই প্রবাসী এক ব্যক্তির আটতলা ভবন ভাড়া নিয়ে ভবনটিতে তারা রীতিমতো একটি ‘সার্ভার ও ওয়ার্ক স্টেশন’ বসিয়ে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, আইনানুগ কর্তৃত্ববহির্র্ভূত ই-ট্রানজেকশনের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটন করে আসছিল। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। গোপন সংবাদ পেয়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে ওই বাড়ি থেকে পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, লাওসসহ বিভিন্ন দেশের ৬৩ নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও খুলশী থানা পুলিশ। গ্রেপ্তার বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে ৩৫ জন লাওসের, পাকিস্তানের ২১ জন, চীনের ৫ জন এবং নেপাল ও ভিয়েতনামের ১ জন করে নাগরিক রয়েছেন। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, দেশে অনলাইন জালিয়াতির ঘটনা দ্রুত বাড়ছে। দেশি-বিদেশি প্রতারকরা সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলতে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কৌশল বের করছে। সেসব কৌশলের মধ্যে ভুয়া ফোন কল থেকে শুরু করে রয়েছে ফিশিং লিঙ্ক। এমনকি ভুয়া হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার ৬৩ বিদেশি নাগরিক খুলশী থানার কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কে এক দুবাই প্রবাসীর আটতলা বাড়ি ভাড়া নিয়ে দেড় মাস ধরে সাইবার অপরাধের আস্তানা গড়ে তুলেছিলেন। বাংলাদেশে অবস্থান করে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ঢুকে ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করে প্রতারণা এবং অবৈধ ই-ট্রানজেকশনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। তবে এতজন বিদেশি নাগরিক একসঙ্গে একটি ভবনে কীভাবে অবস্থান করছিলেন এবং তাদের ভিসার মেয়াদ আছে কি না, তা জানতে পারেনি পুলিশ। কারণ গ্রেপ্তার কারও কাছেই পাসপোর্ট পাওয়া যায়নি।
গতকাল শুক্রবার মহানগর পুলিশের এক সংবাদ সম্মেলনে সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, তারা মূলত বিভিন্ন ওয়েবসাইট হ্যাক করে। এরপর বিভিন্নজনকে অনলাইন জুয়া খেলার অফার দেয় এবং চাকরির ভুয়া ফাঁদ তৈরি করে। লাওস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী স্ক্যামারদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালানোর কারণে অপরাধীরা সেখানে অপরাধের সুযোগ না পেয়ে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে।
তিনি বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া বিদেশিদের কাছ থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১৩৪টি মোবাইল ফোন, অ্যাপেল ব্র্যান্ডের একটি ট্যাব, ৫৭টি ল্যাপটপ, একটি সিপিইউ, একটি মনিটর, একটি পুরনো কি-বোর্ডসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। কোর্টের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ধারকৃত মোবাইল ও ল্যাপটপের ফরেনসিক রিপোর্ট এলে জানা যাবে তারা কার কার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। আর গ্রেপ্তারকৃতদের পাসপোর্ট না থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদের পাসপোর্টগুলো এক বাংলাদেশির কাছে জমা রাখার কথা জেনেছি। আমরা তাকে খুঁজছি। তাকে গ্রেপ্তার করা গেলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে এই বিদেশিরা বৈধ নাকি অবৈধভাবে দেশে অবস্থান করছে।
এদিকে কক্সবাজারের একটি রিসোর্ট থেকে গত ৪ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হওয়া ছয় বিদেশি নাগরিকের হেফাজতে থাকা আরও ৭০০ আইফোন গত বৃহস্পতিবার জব্দের কথা জানান কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অভিযান) মোহাম্মদ অহিদুর রহমান। তিনি বলেন, গ্রেপ্তারকৃত বিদেশি নাগরিকরা মূলত আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের সদস্য। তারা নিজেদের ভুয়া পরিচয় দিয়ে ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে অর্থ, ব্যক্তিগত তথ্য ও অনলাইন অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন সুবিধা হাতিয়ে নেয়।
কক্সবাজার পুলিশের দাবি, পর্যটকদের থাকার জন্য ব্যবহৃত রিসোর্টটির আড়ালে একটি কম্পিউটার ল্যাব তৈরি করা হয়েছিল। সেখান থেকে অনলাইনভিত্তিক আর্থিক প্রতারণামূলক কর্মকা- (স্ক্যাম) পরিচালিত হতো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিআইডি চট্টগ্রাম অফিসের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, দেশের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ মোবাইল ব্যবহারকারী বিভিন্ন মাধ্যমে আসা ভুয়া মেসেজে ক্লিক করেন। তারপরেই অ্যাকাউন্ট হ্যাক কিংবা আর্থিক ক্ষতির মতো ঘটনা ঘটছে। তিনি সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেন, হোয়াটসঅ্যাপে অচেনা নম্বর থেকে আসা ছবি ডাউনলোড করলেই সাইবার প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। এতে মুহূর্তেই ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট থেকে লাখ লাখ টাকা উধাও হয়ে যেতে পারে।