দীর্ঘদিনের পর্যটক খরা কাটিয়ে আবারও সরব হয়ে উঠেছে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত। সাপ্তাহিক ছুটি ও অনুকূল আবহাওয়ায় গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই সমুদ্রসৈকত ও আশপাশের পর্যটন স্পটগুলোতে পর্যটকের ঢল নামে। এতে স্বস্তি ফিরেছে পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তবে পর্যটকদের এই ভিড়ের মধ্যেও চোখে পড়েছে সৈকতের ক্ষতবিক্ষত চিহ্ন। বর্ষা মৌসুম ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে গত কয়েক মাসের প্রবল ঢেউয়ের তোড়ে বিভিন্ন স্থানে তৈরি হওয়া গর্ত ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জিও ব্যাগে গোসল করতে গিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় পড়ছেন পর্যটকরা। ফলে পর্যটক ফিরলেও কুয়াকাটা সৈকতের নিরাপত্তা ও সৌন্দর্য নিয়ে শঙ্কা রয়ে গেছে।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, গতকাল সকাল থেকেই সৈকতের জিরো পয়েন্ট, সৈকতসংলগ্ন এলাকা ও বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে বাড়তে থাকে পর্যটকদের উপস্থিতি। পর্যটকদের পদচারণায় প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে পুরো পর্যটন নগরীতে। দীর্ঘদিন পর হাসি ফুটেছে হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, ট্যুর গাইড, ফটোগ্রাফার, ছাতা-চেয়ার ব্যবসায়ীসহ পর্যটননির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মুখে। কেউ সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে গোসল করছেন, কেউ দলবেঁধে সাঁতার কাটছেন। আবার অনেকে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলে সময় কাটাচ্ছেন। এ দিন লেম্বুরবন, শুঁটকি মার্কেট, গঙ্গামতির সৈকত, ফাতরার বন, রাখাইন পল্লী, ইলিশ পার্ক, মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধবিহার, ঝাউবাগানসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটেও ছিল বাড়তি উপস্থিতি। পর্যটকদের আনাগোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন স্থানীয় ট্যুর গাইড ও ফটোগ্রাফাররা। একই সঙ্গে রেস্তোরাঁসহ অন্যান্য পর্যটননির্ভর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও বেড়েছে বেচাকেনা।
তবে পর্যটকদের এই বাড়তি উপস্থিতির মধ্যেও সামনে এসেছে কুয়াকাটা সৈকতের ক্ষতবিক্ষত চিত্র। সমুদ্রের প্রবল ঢেউয়ের তোড়ে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয়েছে গর্ত। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জিও ব্যাগ ও ক্ষতিগ্রস্ত সৈকতের কারণে অনেক পর্যটক গোসল করতে গিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় পড়ছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
যশোর থেকে আসা পর্যটক সিয়াম বলেন, ‘সাগরের ঢেউ দেখে খুবই ভালো লাগছে। তবে সৈকতের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। জিও ব্যাগগুলো এমনভাবে পড়ে আছে যে গোসল করতে ভয় লাগছে। ঢেউয়ের তোড়ে অনেক জায়গায় গর্ত হয়েছে। সেখানে পড়ে গিয়ে অনেকে ব্যথাও পাচ্ছেন।’
ছাতা-চেয়ার ব্যবসায়ী জামাল ঘরামী বলেন, ‘অনেক দিন পর ভালো পর্যটক এসেছে। এতে আমাদের ব্যবসায় স্বস্তি ফিরেছে। কিন্তু সমুদ্রের ঢেউয়ের তা-বে সৈকত ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। এখন ছাতা ও বেঞ্চ বসাতেও অনেক সমস্যা হচ্ছে। সৈকত রক্ষায় সরকারের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’ কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানা বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকে কুয়াকাটা অনেকটা ফাঁকা ছিল। বিভিন্ন সরকারি ছুটি থাকলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে তেমন পর্যটক আসেননি। তবে বর্তমানে পর্যটকের আগমন বাড়ায় পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।’
কুয়াকাটা ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শামীম রেজা বলেন, ‘আজ আশানুরূপ পর্যটকের আগমন ঘটেছে। আমাদের গাইড সদস্যরা বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে পর্যটকদের সঙ্গে থেকে সেবা দিচ্ছেন। বর্তমানে কুয়াকাটার প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ হোটেল কক্ষ বুকড রয়েছে। আশা করছি, সামনে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে।’
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার (টোয়াক) সেক্রেটারি জেনারেল আসাদুজ্জামান মিরাজ বলেন, ‘অনেক দিন পর কুয়াকাটায় আশানুরূপ পর্যটকের আগমন ঘটেছে। পর্যটকদের আনাগোনায় সৈকত মুখরিত। কুয়াকাটার পর্যটনের ওপর প্রায় ১৬ পেশার মানুষ সরাসরি ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন পর পর্যটক আসায় তাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।’
সৈকতের ফটোগ্রাফার জাকারিয়া বলেন, ‘আমাদের পেশা পুরোপুরি পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল। বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকে তেমন কাজ ছিল না। আজ পর্যটক ভালো আসায় ফটোগ্রাফারদেরও আয় বেড়েছে।’
সৈকতসংলগ্ন চা বিক্রেতা সুলাইমান বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার থেকেই চোখে পড়ার মতো পর্যটক আসছেন। পর্যটক বাড়ায় বেচাকেনাও বাড়তে শুরু করেছে।’ ঢাকা থেকে আসা পর্যটক হিমেল বলেন, ‘কুয়াকাটায় এর আগেও কয়েকবার এসেছি। তবে বর্ষা মৌসুমে আসা হয়নি। এ সময় সমুদ্র অনেক উত্তাল থাকে এবং বড় বড় ঢেউ দেখা যায়। বৃষ্টিময় সৈকতের পরিবেশও আমার খুব ভালো লাগে। তাই এবার বর্ষায় পরিবার নিয়ে কুয়াকাটায় বেড়াতে এসেছি।’
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুয়াকাটায় পর্যটকদের এই আগমন ধরে রাখতে হলে সৈকতের নিরাপত্তা ও সৌন্দর্য রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত সৈকত সংস্কার, জিও ব্যাগ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঠিক করা, পর্যটন স্পটগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে কুয়াকাটায় পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে।
কুয়াকাটা ট্যুরিস্ট পুলিশ জোনের ইনচার্জ নাজমুল হাসান বলেন, ‘সাপ্তাহিক ছুটিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পয়েন্টে একাধিক টিম নিয়োগ করা হয়েছে। পর্যটকদের সেবা ও আইনি সহায়তায় ট্যুরিস্ট পুলিশ সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে। পাশাপাশি মাইকিংয়ের মাধ্যমে পর্যটকদের সচেতন করা হচ্ছে।’