মনোসংযোগ বাড়ানোর উপায়

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪০ এএম

আধুনিক জীবনে মানসিক চাপ মানুষের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। কাজের চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক সমস্যা, প্রতিযোগিতা এবং নানা প্রত্যাশার ভার মানুষকে ক্লান্ত করে তোলে। মন তখন এক জায়গায় স্থির থাকতে পারে না। শরীর থাকে এক স্থানে, কিন্তু চিন্তা ছুটে বেড়ায় অন্য কোথাও। ফলে বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ ধরে রাখাই কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের জন্য প্রয়োজন মনোসংযোগ। ইসলাম মানুষের মনকে স্থির রাখার এমন কিছু পথ দেখিয়েছে, যা তাকে উদ্বেগ ও অস্থিরতা থেকে মুক্ত করে প্রশান্তির দিকে নিয়ে যায়। নামাজে একাগ্রতা, আল্লাহর স্মরণ, তাওয়াক্কুল, ধৈর্য ও আত্মসংযমের মাধ্যমে একজন মানুষ ফিরে পেতে পারে নিজের মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ।

ইসলামে মনোযোগের অন্যতম বড় শিক্ষা পাওয়া যায় নামাজে। নামাজ হলো মহান আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে বান্দার গভীর সম্পর্ক স্থাপনের মুহূর্ত। একজন মুসলিম যখন নামাজে দাঁড়ায়, তখন তার মনোযোগ থাকা উচিত আল্লাহর দিকে। সে যেন উপলব্ধি করে, সে তার রবের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এবং অতীতের দুঃখ কিংবা ভবিষ্যতের ভয় ভুলে আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন হয়।

নামাজে একাগ্রতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা সফল হয়েছে, যারা নিজেদের নামাজে একাগ্রতা অবলম্বন করে।’ (সুরা মুমিনুন ১-২) এই একাগ্রতা মানুষকে শুধু ইবাদতেই নয়, জীবনের অন্যান্য কাজেও মনোযোগী হতে শিক্ষা দেয়।

মানুষের অন্তরের প্রশান্তির সবচেয়ে বড় উৎস মহান আল্লাহর স্মরণ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা রাদ ২৮) মানুষের মন যখন অস্থির হয়ে পড়ে, তখন বাইরের সবকিছু ঠিক থাকলেও সে শান্তি অনুভব করতে পারে না। আবার জীবনে সমস্যা ও সংকট থাকলেও আল্লাহর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস একজন মানুষকে ভেতর থেকে শক্তি দেয়।

ইসলাম মানুষকে অতীত নিয়ে অযথা ভেঙে পড়তে শেখায় না। অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে, ভুলের জন্য তওবা করতে হবে এবং সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু অতীতের ব্যর্থতাকে আঁকড়ে ধরে জীবন থামিয়ে রাখা ইসলামের শিক্ষা নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যা তোমার উপকারে আসে, তার প্রতি যতœবান হও। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও এবং দুর্বল হইও না। কোনো বিপদ ঘটলে বলো না, যদি আমি এমন করতাম, তাহলে এমন হতো। বরং বলো, আল্লাহ তকদিরে যা নির্ধারণ করেছেন, তাই হয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম ২৬৬৪)

এই হাদিস মানুষের মানসিক প্রশান্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। জীবনে অনেক কিছুই আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী হয় না। কোনো সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে, কোনো চেষ্টা ব্যর্থ হতে পারে। তখন বারবার ‘যদি এমন করতাম’ ভাবতে থাকলে মানুষের মন আরও ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। ইসলাম মানুষকে শিক্ষা দেয়, ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে।

একইভাবে ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগও মানুষের শান্তি নষ্ট করে। ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করা প্রয়োজন, প্রস্তুতি নেওয়াও জরুরি। কিন্তু যে বিষয় এখনো ঘটেনি, তা নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়া মানুষের শক্তি ও সময় নষ্ট করে। একজন মুমিন ভবিষ্যতের জন্য চেষ্টা করেন, তারপর ফলাফলের ব্যাপারটি আল্লাহর কাছে সোপর্দ করেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক ৩)

ইসলামে আবেগ নিয়ন্ত্রণেরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। রাগ, দুঃখ, ভয় ও হতাশা মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। কিন্তু এসব আবেগ যেন মানুষের সিদ্ধান্ত ও আচরণকে নিয়ন্ত্রণ না করে, সে শিক্ষা দেয় ইসলাম।

মানুষ যখন অতীতের অনুশোচনা ও ভবিষ্যতের উদ্বেগের মাঝখান থেকে নিজেকে ফিরিয়ে এনে বর্তমানের দায়িত্ব পালন করে, তখন জীবন অনেক বেশি সুন্দর হয়ে ওঠে। আর যখন সেই বর্তমান আল্লাহর স্মরণ, তার ওপর ভরসা এবং তার নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হয়, তখন হৃদয়ে নেমে আসে সত্যিকারের প্রশান্তি।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত