দেশের উন্নয়ন ও রাষ্ট্রের পুনর্গঠনে দেশবাসীর সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চব্বিশের আগস্টের মতো দেশের তরুণ সমাজকে আবার পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে দেশ থেকে অন্তত ৮০ শতাংশ ডেঙ্গু সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। গতকাল শনিবার সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তিন মাসব্যাপী সারা দেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আগামী ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশজুড়ে এ কর্মসূচি থাকবে। ঢাকাকেন্দ্রিক উদ্যোগের পাশাপাশি দেশের সব জেলা-উপজেলাপর্যায়েও একযোগে এই সচেতনতামূলক ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার এবং সরকারি-বেসরকারি ও সামাজিক উদ্যোগকে সমন্বিত করার লক্ষ্যে এ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
দেশে তরুণ সমাজের অবদানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটা দেশের তরুণ সমাজ যদি দেশকে পরিবর্তন করতে চায় তাহলে করা সম্ভব। আমাদের তরুণ সমাজ যে পরিবর্তন করতে পারে, সেটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সারাবিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে। পরিবর্তনের সূচনা সেখান থেকেই তরুণ সমাজ করেছে। তাই তাদের কাছে আমার আহ্বান আসুন এবার রাষ্ট্রকে, দেশকে আমরা পুনর্গঠন করি। আগামী তিন মাসে আমাদের ডেঙ্গুর সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করি। হয়তো আমরা শতভাগ পারব না, কিন্তু অন্তত ৮০ শতাংশ আমরা পারব।’
শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্ততার ওপর জোর দিয়ে তিনি জানান, বাংলাদেশে স্কাউটসের সংখ্যা প্রায় ২৩ লাখ, বিএনসিসির সদস্য সংখ্যা ২২ হাজার। এ ছাড়া প্রাথমিক ও এবতেদায়ি মাদ্রাসায় আড়াই কোটি এবং হাইস্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। গার্লস গাইড, বিএনসিসি, স্কাউটস ও স্বেচ্ছাসেবকসহ দেশের প্রতিটি নাগরিকের কাছে দেশ গড়ার এই কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ডেঙ্গু ছড়ানোর কারণ ও পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা জানি কীভাবে ডেঙ্গু হয়। ভাঙাড়ি, কাগজপত্র, প্লাস্টিক ও মাটির বিভিন্ন পাত্রে পরিষ্কার পানি জমে এই ডেঙ্গু বহনকারী এডিস মশার জন্ম হয়। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করলে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারব।’
সপ্তাহে অন্তত এক ঘণ্টা পরিচ্ছন্নতা কাজের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে হয়তো আপনাদের একটু কষ্ট হবে। কিন্তু প্রতি সপ্তাহে এক ঘণ্টা যদি আমরা নিজের বাসা, স্কুল, কলেজ বা প্রতিষ্ঠান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার জন্য কাজ করি, তাহলে অবশ্যই দ্রুত এ পরিবর্তন আনতে আমরা সক্ষম হব।’
রাস্তাঘাটে যেখানে-সেখানে আবর্জনা ফেলার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা রাস্তাঘাট দিয়ে যখন যাই, দেখি বহু মানুষ অসচেতনভাবে যেখানে-সেখানে আবর্জনা ফেলছে। তাদের সচেতন করতে হবে। যারা ময়লা করবে, যারা আবর্জনা তৈরি করবে, তাদের নিরুৎসাহিত করতে হবে।’
বক্তব্যের শেষে তিনি সুনির্দিষ্ট সেøাগান দিয়ে বলেন, ‘তাই কথা একটাই কাজ, কাজ, আর কাজ। এবং পরিচ্ছন্ন, পরিচ্ছন্ন আর পরিচ্ছন্নতাই হতে হবে আমাদের আগামী দিনের মূল লক্ষ্য।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।
আরও বক্তব্য দেন স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এমএ মুহিত, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
এ সময় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীসহ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার, সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী, শিক্ষার্থী, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্য এবং সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া দেশের সব জেলা-উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা অনলাইনে এ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী কর্মসূচি উদ্বোধনের পরপরই মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিদর্শনে নামেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও ডেঙ্গু সংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্স কমিটির সভাপতি মীর শাহে আলম। তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেছেন, ‘যেকোনো মূল্যে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে হবে এবং শুধু নির্দিষ্ট সময়ে অভিযান চালালে চলবে না; বরং সারা বছর নিয়মিতভাবে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে।’
সরকার গবেষক ও উদ্যোক্তাদের পাশে থাকবে : ডেঙ্গু প্রতিরোধ কর্মসূচি উদ্বোধনের পর রাজধানী ঢাকায় ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি একটি সমৃদ্ধ ও কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে দেশপ্রেমিক নাগরিক, ব্যবসায়ী, তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষকসহ সমাজের সর্বস্তরের জনসাধারণকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশ পরিচালনায় সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে এ রকম একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে কাজ করি, যাতে আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত সেই রাষ্ট্র গড়ে তুলতে সক্ষম হই।’
দেশের সার্বিক অগ্রগতিতে উদ্ভাবক ও ব্যবসায়ীদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাষ্ট্র ও সরকারের বর্তমান প্রয়োজনে উদ্ভাবনী শক্তি নিয়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকার উদ্যোক্তা ও গবেষকদের সর্বাত্মক সহায়তায় সব সময় পাশে থাকবে।’
পরে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। অনুষ্ঠানে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, দেশি-বিদেশি উদ্ভাবক ও বিভিন্ন পর্যায়ের গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, বুয়েটের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আনিসুজ্জামান তালুকদার এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ অন্যরা।