সার আমদানিতে প্যাঁচ

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪০ এএম

সারের জন্য মরিয়া হয়ে কৃষকরা কোথাও আন্দোলনে নামছেন, গুদাম লুট করছেন। কোথাও আবার বেশি দাম ছাড়া মিলছে না। এই পরিস্থিতিতে সরকার নানাভাবে পর্যাপ্ত মজুদের কথা জানালেও আসলে সারের সংকট আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংকট কাটাতে সার সংগ্রহে সরকার মরিয়া হলেও প্যাঁচ লেগেছে নন-ইউরিয়া সারের বেসরকারি আমদানিতে। দ্রুত আমদানির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চিন্তা থাকলেও একটি চক্র সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে সচেতনভাবেই দেরির ফাঁদে ফেলা হয়েছে সারের আমদানি।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগে কৃষি মন্ত্রণালয়ই নন-ইউরিয়া সারের বেসরকারি আমদানির চূড়ান্ত অনুমোদন দিত। এবারই প্রথম তা সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদনের জন্য তোলা হচ্ছে। ফলে দরপত্রের বিপরীতে আমদানিকারকদের তালিকা ও আমদানির পরিমাণ চূড়ান্ত হলেও ঋণপত্র খোলার অনুমোদন মেলেনি। অথচ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংকটের সময়ে দ্রুত সার আমদানি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আপতত বিকল্প নেই কৃষি মন্ত্রণালয়ের হাতে।

জানা গেছে, কৃষি মন্ত্রণালয় বেসরকারিভাবে সার আমদানির দরপত্র আহ্বান করে গত ৩ আগস্ট। এর মাধ্যমে ২ লাখ মেট্রিক টন টিএসপি, ৫ লাখ মে. টন ডিএপি এবং ২ লাখ ৫০ হাজার মে. টন এমওপি সংগ্রহ করার কথা। ১৮ আগস্টের পর থেকেই সরকার দরপত্রে অংশগ্রহণকারীদের দর মূল্যায়ন শুরু করে। তবে তাদের প্রস্তাব আমলে না নিয়ে এমওপির জন্য গত ২ সেপ্টেম্বর, টিএসপির জন্য ৩ সেপ্টেম্বর এবং ডিএডির জন্য ৬ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয় অংশগ্রহণকারীদের একটি নির্দিষ্ট দর প্রস্তাব করে এবং তাতে সম্মতি চায়। আমদানিকারকরা সম্মতি দিলেও এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন মেলেনি, যার কারণে তারা ঋণপত্রও খুলতে পারছেন না।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, সাড়ে ৯ লাখ টনের নন-ইউরিয়া সারের মধ্যে গত সপ্তাহে কেবল ৩০ হাজার মে. টন এমওপির চূড়ান্ত অনুমোদন এসেছে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি থেকে। বাকিগুলো এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায়।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া, সৌদি আরবের বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুতিদের দখল নিয়ে এই অঞ্চল দিয়ে সার আমদানি ইতিমধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং এখান থেকে সরবরাহও কমে গেছে। বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ পথ যেমন ঝুঁকিতে পড়ছে তেমনি প্রতিনিয়তই তেলের মতো সারের দামও ঊর্ধ্বমুখী। 

জানা গেছে, এর আগে কৃষি মন্ত্রণালয় সবসময় এই আমদানির দরপত্র আহ্বান করত মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে। পরবর্তী এক মাসের মধ্যেই চূড়ান্তভাবে কার্যাদেশ দেওয়া হতো। ফলে সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের মধ্যে বেসরকারিভাবে আমদানি করা সার সরবরাহ চেইনে যুক্ত হতো এবং সবচেয়ে পিক সিজনে সারের সরবরাহে কোনো সংকট হতো না। এবারে সেই প্রক্রিয়াটাই শুরু হয়েছে আরও তিন মাস দেরিতে। যার গোড়াপত্তন হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের সাবেক কৃষি সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ইমাম ফয়সাল এবং একই বিভাগের সাবেক যুগ্মসচিব মো. খোরশেদ আলম সিন্ডিকেটের হাত ধরে। তারাই ইচ্ছেকৃতভাবে এই আমদানির সময়টা পিছিয়ে দেওয়া শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেট নীলনকশা এঁকেছিল আওয়ামী লীগের পতনের কারণে যে সরকারই থাকুক তাদের সার নিয়ে বেকায়দায় ফেলা।

জানা গেছে, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সাবেক এই কৃষি সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠালেও আহমেদ ইমাম ফয়সাল ও খোরশেদ ছিলেন সার ব্যবস্থাপনার বড় নিয়ন্ত্রক। যাদের হাত ধরেই এবারে সারের আমদানি পিছিয়ে দেওয়া হয় এবং নতুন রীতি চালু করে তা অনুমোদনের জন্য ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।

ডিএপির আমদানি অনুমোদনে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানোর যে সারসংক্ষেপ তৈরি করা হয়েছে তাতে বলা হয়েছে ২০টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত করা হয়েছে। যারা ৯৩৮ (এফওবি মূল্য) মার্কিন ডলারে মরক্কো, রাশিয়া, জর্ডান, সৌদি আরব, মিসর, তিউনিশিয়াসহ কয়েকটি দেশ থেকে সার আমদানি করবে। এই দাম বিএডিসির দামের তুলনায় কম। এই দামে সরকার ৫ লাখ মে. টন ডিএপি নেবে বেসরকারি আমদানিকারকদের কাছ থেকে।

এতে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত অনুমোদনের পর জাহাজযোগে আমদানি ও দেশের অভ্যন্তরে পরিবহনসহ কৃষকের কাছে সার পৌঁছতে ৮০ থেকে ৯০ দিন সময় প্রয়োজন। অর্থাৎ এখন এই সারের অনুমোদন দেওয়া হলেও কৃষক পর্যায়ে পৌঁছতে পৌঁছতে ডিসেম্বর চলে আসবে। অথচ সরকারের কাছে অর্থাৎ বিএডিসির কাছে গত ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ৪১ হাজার মে টন সার রয়েছে। যেখান থেকে চলতি মাসের এক লাখ টনের বরাদ্দ ব্যয় হয়ে থাকবে মাত্র ৪১ হাজার টন। এর সঙ্গে বিএডিসির মরক্কো থেকে একটি ৩০ হাজার টনের লট ইতিমধ্যেই এসে পৌঁছেছে। তবে মরক্কোর দ্বিতীয় ও তৃতীয় লটের মোট ৬০ হাজার মে. টন ডিএপি এখনো জাহাজে লোডিং হচ্ছে, যা এসে কৃষক পর্যায়ে পৌঁছতে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ দিন সময় লাগবে। অথচ আগামী মাসেই প্রায় দেড় লাখ মে. টনের ডিএপির চাহিদা রয়েছে। কারণ অক্টোবর মাস থেকে দেশের খাদ্য উৎপাদনের পিক সিজন শুরু হতে যাচ্ছে। অর্থাৎ পর্যাপ্ত ডিএপি সারের মজুদে ঘাটতি রয়েছে। অথচ কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্যগুলোতে বলা হচ্ছে ৩ লাখ টনের বেশি ডিএপি সারের মজুদ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অবস্থায় দ্রুত বেসরকারি আমদানি শুরু করতে না পারলে নন-ইউরিয়া সারের মজুদে সরকার বেকায়দায় পড়তে পারে। এই বেকায়দার পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টাটাই করে যাচ্ছে সাবেক সচিব মিয়ানের সিন্ডিকেট। এক দেড় মাস ধরে তৈরি হওয়া সার সংকটের মধ্যেই অবশ্য অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ইমাম ফয়সালকে সার বিভাগ থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসনে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে তার রেখে যাওয়া নীতিতে তৈরি হওয়া অরাজকতার খেসারত দিতে হচ্ছে বর্তমান সরকারকে এবং কখন এই পরিস্থিতি শান্ত হবে তারও নিশ্চয়তা তৈরি হয়নি।

এর প্রভাব অবশ্য টের পাওয়া যাচ্ছে কৃষক পর্যায়ে সারের দামে। সরকার নির্ধারিত প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) ডিএপি সারের দাম ১০৫০ টাকা হলেও জেলা ভেদে ১৭০০ থেকে ২২০০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে প্রতি বস্তা সার কিনতে। অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে। সরকার নন-ইউরিয়া সারের মধ্যে ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সারে ভর্তুকি প্রদান করে থাকে। এজন্য কৃষক পর্যায়ে দামও নির্ধারিত।

জানা গেছে, আগামী অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পিক সিজনে শুধু ডিএপি সারের চাহিদা রয়েছে ১০ লাখ মেট্রিক টনের বেশি। আমদানি দেরি হওয়ায় সারের এই সংকট প্রভাব ফেলতে পা্ের পিক সিজনেও। যার শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা এই সারসংক্ষেপে।

বেসরকারি খাতের আমদানিকারকরা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাপী সারের সরবরাহ সংকুচিত হয়েছে এবং দাম প্রতিনিয়তই বাড়ছে। এই অবস্থায় কার্যাদেশ পেতে দেরি হলেও সরবরাহকারীরা নির্ধারিত দামে সার দিতে গড়িমসি করতে পারেন। কারণ বড় রপ্তানিকারক দেশ নিজেদের নিরাপত্তায় নন-ইউরিয়ার রপ্তানি স্থগিত করে দিয়েছেন।

এ ছাড়া এই জরুরি সময়ে বেসরকারি আমদানিকারকরা বিএডিসির চেয়ে কম দামে সরকারকে সার দিতে প্রস্তুতি নিয়েছে। অথচ সরকার বিএডিসিকে ১ বছরের সুদ সহায়তা প্রদান করে এবং বেসরকারি আমদানিকারকদের মাত্র ৪ মাসের সুদ দেয়। অথচ টাকা প্রদানে কখনো কখনো এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে যায়। 

বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) সভাপতি মো. মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সার আমদানির টেন্ডার হওয়ার প্রায় এক মাস হতে চললেও এখনো কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এলসি খোলার বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়নি। সিদ্ধান্ত দেওয়ার পর সময়মতো এলসি খোলা এবং নির্ধারিত সময়ে সার দেশে আনা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘টেন্ডারের পর বিদেশি সরবরাহকারীদের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছিল, তাতে শিপমেন্টের নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল। এরই মধ্যে সেই সময়সীমা পার হয়ে গেছে। কোনো কোনো সরবরাহকারী সার দিতে অস্বীকৃতিও জানাচ্ছেন। ফলে সময়মতো সার আমদানি করা যাবে কি না, তা নিয়ে আমদানিকারকরা শঙ্কায়।’

মোশাররফ হোসেন বলেন, সামনে রবি মৌসুমের পিক সিজন। এ সময়ে সারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সময়মতো সার আমদানি করা সম্ভব না হলে মৌসুমে সারসংকট দেখা দিতে পারে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মৌসুমের মধ্যে ডিলারশিপ নীতিমালার বাস্তবায়ন, ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অস্থিরতা, বেসরকারি আমদানিতে দেরি করা এর সবটাই একই সূত্রে গাঁথা। এটা আওয়ামী সিন্ডিকেটের আমলাদের সরকারকে বেকায়দায় ফেলার একটা কৌশল এবং তা কাজ করতে শুরু করেছে। সারা দেশে কৃষক সার কিনতে হয়রানির মধ্যে পড়ছেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত