কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা বাজার থানা এলাকায় ‘ডাকাত পড়েছে’ বলে মাইকিং করে আনোয়ার হোসেন (৪৫) নামের সাবেক এক ইউপি সদস্যকে কুপিয়ে হত্যা করেছে একদল দুর্বৃত্ত। এ সময় হামলাকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন তাঁর স্ত্রীও।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) ভোর ৪টার দিকে শ্রীকাইল ইউনিয়নের উত্তর পেন্নাই দক্ষিণপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত আনোয়ার ওই এলাকার মৃত মনু মিয়ার ছেলে। তিনি শ্রীকাইল ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য এবং ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি ছিলেন।
নিহতের স্বজন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে আত্মগোপনে ছিলেন আনোয়ার। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাতে গোপনে নিজ বাড়িতে ফেরেন তিনি। রাত ২টার দিকে এলাকায় হঠাৎ মাইকে ‘ডাকাত পড়েছে’ বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। এর পরপরই একদল লোক আনোয়ারের বাড়িতে হামলা চালায়। স্বামীকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে তাঁর স্ত্রীও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন।
নিহতের ভাই জালাল হোসেনের অভিযোগ, প্রায় তিন বছর ধরে আনোয়ারের এলাকায় ফেরার বিষয়ে একটি পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছিল। এর মধ্যে স্থানীয় ফিরোজ মেম্বারের ছেলে আনোয়ারসহ পিন্টু, হাসান ও জালাল নামে কয়েকজন তাঁর ভাইয়ের কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। চাঁদার টাকা না দেওয়ায় পরিকল্পিতভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আনোয়ারের চাচাতো ভাই মো. জসিম উদ্দিন বলেন, কিছুদিন আগে গ্রামে ফেরার চেষ্টা করলে ফিরোজ হোসেনের লোকজন আনোয়ারের কাছে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন বলে তাঁরা জানতে পারেন। টাকা না দিলে এলাকায় এলে তাঁকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, পরিকল্পিত হামলা চালিয়ে আনোয়ারকে হত্যা করা হয়েছে।
নিহতের স্ত্রী মোমেনা বেগম বলেন, হামলার পর ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নিতে এলাকায় ‘ডাকাত পড়েছে’ বলে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়। আহত আনোয়ারকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাঁদের আটকে রাখা হয়। পরে বাঙ্গরা বাজার থানা-পুলিশের সহায়তায় সকাল ৬টার দিকে তাঁকে উদ্ধার করে মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। হামলাকারীদের কয়েকজনকে তিনি চিনতে পেরেছেন বলেও জানান।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আনোয়ারের এলাকায় ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব ছিল। অবৈধ ড্রেজার ও মাটির ব্যবসার একক নিয়ন্ত্রণও তাঁর হাতে ছিল বলে স্থানীয়দের দাবি। ২০২৩ সালে ড্রেজারবিরোধী অভিযানে গেলে তৎকালীন মুরাদনগর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর গাড়িতে হামলার অভিযোগ ওঠে আনোয়ার ও তাঁর লোকজনের বিরুদ্ধে। তবে তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক নাজমুস সাকির বলেন, হাসপাতালে আনার পর পরীক্ষা করে আনোয়ারকে মৃত পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয়দের ধারণা, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ, পূর্বশত্রুতা ও এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। তবে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
বাঙ্গরা বাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিউল আলম বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পূর্বশত্রুতার জের ধরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে।
ওসি আরও জানান, আনোয়ার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এবং মারামারির ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে বাঙ্গরা বাজার থানায় পাঁচটি মামলা রয়েছে।