বাড়ির মেজো মেয়ের বিয়ের আয়োজন ছিল বন্দরনগরী চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে। গত শনিবার সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত বর-কনে পক্ষের আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাক্সক্ষীদের কোলাহলপূর্ণ ছিল বিয়ের অনুষ্ঠানস্থল। সবকিছু গুছিয়ে কনের বাবা-মা, ছোট ভাইবোন, মামা-মামি ও চাচা-চাচিরা কক্সবাজারের ঈদগাঁও সদরের মাইজপাড়াস্থ বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। সুশৃঙ্খলভাবে বিয়ে মিটে যাওয়ার আনন্দে উদ্বেলিত ছিল সবার মন। কিন্তু কর্ণফুলী ব্রিজ পেরিয়ে টোল প্লাজা ক্রস করে কলেজ বাজারে মৃত্যুদূত অপেক্ষা করছিল কেউ অনুধাবন করতে পারেনি। রাত সোয়া ১টার দিকে অকস্মাৎ ইউটার্নে ঘুরে বিয়েবাড়ির লোকজন ভর্তি মাইক্রোবাসের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় একটি কাভার্ড ভ্যান। এতে ঘটনাস্থলে মারা যান কনের বড় মামা ফেরদৌস আলম ফিরোজ (৬০)। হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান কনের ছোট ভাই নিয়াজ মোরশেদ (২৩) ও ছোট বোন মিনতাহ (২১)। সঙ্গে মারা যান মাইক্রো চালক মুন্না (৪০)।
নিহত নিয়াজ মোরশেদ ও মিনতাহ ঈদগাঁও উপজেলা সদরের মাইজপাড়ার মনজুর আলমের সন্তান। অপর নিহত ফেরদৌস আলম ফিরোজ (৬০) ঈদগাঁওর পোকখালীর পশ্চিম গোমাতলীর চরপাড়ার মৃত আবদুল করিম দফাদারের ছেলে। তিনি ঈদগাঁও বাস-স্টেশনে আরাফাত শপিং কমপ্লেক্স নামে মার্কেট গড়ে সেখানেই অবস্থান করতেন।
ফিরোজের এক ছেলে ও তিন মেয়ের বড় মেয়ে গোমাতলী, মেজো মেয়ে চট্টগ্রামের মইজ্জারটেক ও ছোট মেয়ে কক্সবাজারে বিয়ে দেয়। ছেলে তারেক মাহমুদের বিয়েও সম্পন্ন করা হয়েছিল। অপর নিহত মাইক্রোবাস চালক হাসান মাহমুদ মুন্না (৩৮) ঈদগাঁও উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের নতুন অফিস এলাকার মোসতাক আহমেদের ছেলে। এ ঘটনায় আহতরা হলেন, কনের বাবা মনজুর আলম (৫৮), মা নিলুফা ইয়াসমিন (৪৮), নিহত ফিরোজের বউ আরেফা বেগম (৫০), কনের চাচাতো ভাই হেলাল উদ্দিন (৪৫), মনজুরের ছোট ভাই মীর কাশেম (৫৫) ও বন্ধু আবুল কালাম (৫৮)।
নিহত মোরশেদ ও মিনতাহার চাচা ঈদগাঁও সেন্ট্রাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মামুনুর রশীদ জানান, চাচাতো ভাই মনজুর আলম দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলেন। তার তিন মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়েকে ঈদগাঁওতে বিয়ে দিয়েছে। মেজ মেয়ে ফাহিমকে বাঁশখালীতে বিয়ে দিয়েছে গত শনিবার। বরের স্বজনদের চাহিদা অনুসারে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল। সুন্দর মতোই বিয়ে সম্পন্ন হয়। সবকিছু মিটিয়ে আমার ভাই মনজুর আলম ও ফিরোজ পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। কিন্তু চট্টগ্রাম মহাসড়কে জমদূত অপেক্ষা করছিল কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। ভাতিজা নিয়াজ মোরশেদ একটু বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ছিল, কিন্তু মেয়েগুলো মেধাবী। ছোট মেয়ে মিনতাহা চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে অনার্স বর্ষের শিক্ষার্থী।
মাইক্রো-কার সমিতির লাইন পরিচালক রোকন জানান, হাসান মাহমুদ মুন্না প্রসিদ্ধ মাইক্রো চালক। তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অর্ধযুগ ধরে গাড়ি চালিয়ে আসছেন। অত্যাধুনিক টি-আর এক্স মাইক্রো বাসটি ভিআইপি ভাড়া মারা হতো। পূর্বপরিচিত হিসেবে ফিরোজের পরিবার নিয়ে চট্টগ্রাম গিয়েছিল মুন্না। কাভার্ড ভ্যানটি অন্যায়ভাবে এসে মাইক্রোটিতে আঘাত করেছে। আমরা চরম মর্মাহত। এদিকে, মৃত্যুর খবরটি ঈদগাঁওতে পৌঁছালে স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। পুরে পরিবার এবং এলাকায় নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে।
ঈদগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মংচিংনু মারমা বলেন, ঘটনাটি শুনেছি। এটা খুবই মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। বিয়ের আনন্দটা বিষাদে রূপ নিয়েছে একটি দুর্ঘটনা। তবুও আল্লাহর ইচ্ছা হিসেবে তা মেনে নেওয়া ছাড়া অন্য উপায় নেই। পরিবারের অন্য স্বজনদের বিধাতা ধৈর্য ধারণের তাওফিক দিন।