প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের বললেন

বিদ্যুৎ-গ্যাসের সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরবে

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫১ এএম

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে বেসামাল ব্যবসায়ীরা তাদের উদ্বেগের কথা জানাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাতের সময় সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যবসায়ীদের ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা চেয়েছেন।

শিল্প-কারখানায় গ্যাস-সরবরাহ আগামীকালের (আজ) মধ্যে আগের অবস্থায় ফিরবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অস্থির না হয়ে সরকারকে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ দেওয়া উচিত।’ গতকাল সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ব্যবসায়ী নেতা ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব হাসান শিপলু সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন।  বিজিএমইএ, মেট্রো চেম্বার, আইসিসিবি, ঢাকা চেম্বার, বিটিএমএ, বিকেএমইএসহ ২১টি ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সে সময় ব্যবসায়ীরা তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। সভায় ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পথরেখা’ শীর্ষক একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। বৈঠক শেষে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’র (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, ‘আগামীকাল মঙ্গলবার রাত থেকেই গ্যাস-বিদ্যুতের চলমান সংকট কাটানোর উদ্যোগ শুরু হবে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট কাটিয়ে শিল্প-কারখানায় সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।’

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আগামীকাল রাত থেকেই আমরা গ্যাস-বিদ্যুতের আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারব। এটা বৈঠকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর।’

‘আগের অবস্থা’ বলতে কোন সময়ের পরিস্থিতি বোঝানো হয়েছে, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ফজলুল হক বলেন, ‘আগস্ট মাসে যে সংকট ঘনীভূত হয়েছে তার আগের অবস্থায়।’

তিনি বলেন, ‘শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরের লোকজনই জ্বালানিসংকটে কমবেশি ভুগছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আগামীকাল রাত থেকেই গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারব।’

পরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যা। এ সংকট ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সরকার সমস্যা চিহ্নিত করে পরিকল্পনা তৈরি করেছে এবং সেগুলো বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে কাজ করছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতি উপকৃত হবে।’

বর্তমান গ্যাস-সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে দুর্ঘটনার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্প-কারখানাসহ বিভিন্ন খাতে। দুর্ঘটনাজনিত সমস্যাটি ইতিমধ্যে সমাধান করা হয়েছে। ইনশাআল্লাহ, আগামীকাল সন্ধ্যা থেকে গ্যাসের সরবরাহ এক-দেড় মাস আগে যে অবস্থায় ছিল, সে অবস্থায় ফিরবে।’

ঘাটতি মোকাবিলায় তৃতীয় একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জিটুজি ভিত্তিতে গত এক মাসে আরেকটি টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তুতি মোটামুটি সম্পন্ন করা হয়েছে। দ্রুতই এর কাজ শুরু হবে। সরকার আগামী ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তৃতীয় টার্মিনালকে সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে পারবে বলে আশা করছি।’

বিদ্যুৎখাতের সমস্যাও দীর্ঘদিনের বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছে, সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসেছে এবং সেসবের সমাধানে পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এখন সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। পরিকল্পনা করা এবং তার বাস্তবায়ন করায় সময় লাগে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের সমস্যা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। চাইলেই ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে এসবের সমাধান সম্ভব নয়।’

সভায়, সরকার কোন কাজ কখন শেষ করতে চায় তার একটি সম্ভাব্য সময়সীমাও ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে তুলে ধরা হয়। বিষয়টির উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাস্তবায়নে সময়ের কিছুটা এদিক-সেদিক হতে পারে। তবে সরকারের সামনে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সময়সীমা রয়েছে।’

ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রভাব পড়ে পুরো দেশে : ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ব্যবসা ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব দেশের সার্বিক অর্থনীতির ওপর পড়ে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান শুধু ব্যবসায়ীদের স্বার্থের বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গেও সম্পর্কিত।’

তিনি বলেন, ‘২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে তা অর্জন করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ-সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে।’

হতাশ হওয়ার কারণ নেই : প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সমস্যার ব্যাপ্তি ও জটিলতা সম্পর্কে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় আগে থেকেই অবগত। সরকার সমস্যাগুলো আড়াল না করে খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছে এবং কীভাবে সেগুলোর সমাধান করতে চায় সেটিও জানিয়েছে। এতটুকু আমরা আপনাদের জানাতে চেয়েছি যে’ আমরা কাজ করছি। হতাশ হওয়ার মতো কারণ নেই।’

সরকারের পরিকল্পনা যৌক্তিক মনে হলে তার বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শুধু ব্যবসায়ী সম্প্রদায় নয়, পুরো দেশ উপকৃত হবে।’

দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণই ঠিক করবে কাকে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেবে। তবে যে সময় যে সরকার দায়িত্বে থাকে তাকে তার পরিকল্পিত কাজ সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া উচিত।’

গণমাধ্যমের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী : আলোচনায় গণমাধ্যমকর্মী ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের আমন্ত্রণ জানানোর কারণও ব্যাখ্যা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সরকারের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা গণমাধ্যমের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। তা না হলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। গণমাধ্যম সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেলে তা দেশবাসীর কাছেও সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বড় কাজ সফলভাবে করতে হলে একটি কার্যকরী দল প্রয়োজন। সরকার-সংশ্লিষ্ট সবাই একসঙ্গে কাজ করছেন, যাতে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়।’

ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সহযোগিতা করবেন, যাতে আমরা আরও ভালো কিছু করতে পারি।’

সভায় উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রবাসীকল্যাণ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা মাহদী আমিন, ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ ও জ্বালানি সচিব মো. জিয়াউল হক।

ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক, বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ড্রাস্ট্রির সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ, বাংলাাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল কামাল, চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্র্রির সভাপতি আমিরুল হক, বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব আনাম প্রমুখ।

এ ছাড়া, দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ড. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, ইংরেজি দৈনিক ওয়াদা’র সম্পাদক শফিকুল আলম, সাংবাদিক আশরাফ কায়সার, মোস্তাফা ফিরোজ, আব্দুন নূর তুষার, আকবর হোসেন, শাহেদ আলম, রেজাউল করিম রনি, আজিজুর রহমান রিপন, তরিকুল ইসলাম সৌরভ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহরিন ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে সরকার কাজ শুরু করেছে মাহদী আমিন : বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন সাংবাদিকদের জানান, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় পাঁচটি টার্মিনাল নির্মাণসহ দীর্ঘমেয়াদি কয়েকটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। ১৬ বছরের পুঞ্জীভূত সংকট দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের বিদ্যুতের স্বনির্ভরতা থাকবে এবং বিশেষভাবে সৌরশক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সামনের দিনগুলোতে আমাদের বিদ্যুৎ খাত বৈচিত্র্যময় হবে এবং আমরা জ্বালানি সম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণ হব।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত