সিদ্ধিরগঞ্জ পদ্মা ডিপোর তেল চুরি

চেকার ফাহাদের খুঁটির জোর কোথায়

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৩ এএম

অনিয়ম আর চুরির অবৈধ অর্থ লেনদেনের অদৃশ্য শিকড় অনেক গভীরে। অভিযান চালিয়েও বন্ধ করা যাচ্ছে না দেশের অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের তেল চুরির চিরচেনা দৃশ্যপট। দেশে জ্বালানি তেলের চরম সংকট মূহূর্তেও থেমে নেই তেল চুরি। এর কারণ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে শর্ষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভূত।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফারুকুল ইসলাম ফাহাদ নামে চতুর্থ শ্রেণির একজন কর্মচারীর হাতে তেল চুরির চাবি দিয়ে বড় কর্তারা রয়েছেন পর্দার আড়ালে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অদৃশ্য শক্তির ইশারায় সিন্ডিকেট গড়ে তুলে দীর্ঘদিন ধরে লাখ লাখ টাকার জ্বালানি তেল চুরি করছেন সাধারণ একজন চেকার (চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী) ফারুকুল ইসলাম ফাহাদ। তেল চুরিসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গত বছরের ৩ জুন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের পরিচালক বরাবর লিখিতভাবে অনুরোধ করেন মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন (বণ্টন ও বিপণন)। এরও আগে ডিপোর তেল চুরি ও অনিয়ম নিয়ে ফাহাদ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে একটি সংবাদপত্রে খবর প্রকাশ হলে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয় ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি। কমিটি তদন্ত শেষে ফাহাদ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে একই বছরের ১৫ এপ্রিল প্রতিবেদন দাখিল করে। অথচ মহাব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ (বণ্টন ও বিপণন) স্বাক্ষরিত ওই প্রতিবেদনের পরও অদৃশ্য কারণে ফাহাদকে বহাল রাখা হয়েছে। উল্টো করপোরেশন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশকারী কর্মকর্তাকে।

এদিকে তেল চুরি করে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ফাহাদের বক্তব্য ও তথ্য প্রমাণ জমা দেওয়ার জন্য গত বছরের ১০ এপ্রিল নোটিস দেন দুর্নীতি দমন কমিশন নারায়ণগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক বেলায়েত হোসেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে দেড় বছর ধরে ঝুলে রয়েছে দুদুকের তদন্ত তৎপরতা। তবে নোটিস প্রদানকারী দুদক কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন জানিয়েছেন, তদন্ত চলমান।

জানা গেছে, সিদ্ধিরগঞ্জের কদমতলী নয়াপাড়া ভা-ারীপুল এলাকার মৃত আব্দুল হামিদের ছেলে ফারুকুল ইসলাম ফাহাদ ২০১১ সালে পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড পিওসিএল ডিপোতে যোগ দেন। চাকরি পাওয়ার পরেই তেল চুরির রাস্তা পেয়ে তিনি রাতারাতি কোটিপতি হয়ে ওঠেন। কদমতলী এলাকায় কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেন রাজকীয় বাড়ি, নামে-বেনামে গড়ে তোলেন সম্পদের পাহাড়।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় এমপি শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। 

বার্মাশীলের বাসিন্দা তেলবাহী গাড়ির স্টাফ গোলজার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, চেকার ফাহাদ সিন্ডিকেট ডিপো থেকে চুরি করে দৈনিক ২ থেকে আড়াইহাজার লিটার জেডফুয়েল (বিমানের তেল), ২ হাজার লিটার ডিজেল, ৪ হাজার লিটার অকটেন ও পেট্রোল পাচার করছে। দেড়শ থেকে দুশ লিটার করে ৪০ থেকে ৫০টি গাড়ি দিয়ে দৈনিক ৮ থেকে ৯ হাজার লিটার তেল পাচার করে ডিপোর বাইরে বিক্রি করছে। তিনি বলেন, শুধু ফাহাদ নন, জেডফুয়েল, ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোল পাচারের সঙ্গে কাজী মামুন, সাইফুল, রবি, শুভ, শাহিন, শাহ আলম ওরফে কালা শাহ আলম জড়িত। আর এই চুরি তদারকি করেন ফাহাদের নিয়োজিত রবি ওরফে মাইগ্যা রবি।

ডিপোতে সাধারণ একজন চেকারের এত প্রভাব বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় বাসিন্দা তেল ব্যবসায়ী পরাগ মিয়া জানান, স্থানীয় লোক ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই তার বিরুদ্ধে ডিপোর কর্মকর্তারাও দর্শকের ভূমিকা পালন করেন।

এ বিষয় চেকার ফারুকুল ইসলাম ফাহাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার কর্মস্থলে গিয়েও দেখা মেলেনি। ডিপোর সিকিউরিটিরা জানায়, ফাহাদ ঠিকমতো অফিসে আসেন না। এলেও বেশিক্ষণ থাকেন না। পরে তার ব্যবহৃত মুঠোফোন নাম্বারে কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

গোদনাইল পদ্মা ডিপোর ম্যানেজার আমিনুল হক বলেন, ফারুকুল ইসলাম ফাহাদকে তার মূল দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পাম্প লাইনে দেওয়া হয়েছে। চুরি বন্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের অধীন পদ্মা অয়েল কোম্পানি পিওএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বলেন, সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল পদ্মা ডিপোর চেকার ফারুকুল ইসলাম ফাহাদের তেল চুরির অভিযোগের বিষয়ে আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত