অবশেষে হাইকোর্টের নির্দেশে দাফন সেই যুবকের

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৬ এএম

নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত শুভ চন্দ্র দাস ওরফে মো. বিল্লালের (৩২) মরদেহ ৯ দিন হিমঘরে থাকার পর অবশেষে ইসলামি রীতিতে দাফন করা হয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে রবিবার রাত ১০টার দিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মাসদাইর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে জানাজা শেষে তার মরদেহ দাফন করা হয়।

এর আগে শুভর মরদেহ দাফন নাকি দাহ করা হবে, তা নিয়ে তার মা আয়েশা বেগম ও বাবা হরি চন্দ্র দাসের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ালে হাইকোর্ট ইসলামি রীতিতে শুভর মরদেহ দাফনের নির্দেশ দেয়। গত ৪ সেপ্টেম্বর রাতে চাষাঢ়ায় মাদক নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে খুন হন শুভ চন্দ্র দাস ওরফে বিল্লাল। তার বাবা হরি চন্দ্র ছেলের লাশ হিন্দু রীতি অনুযায়ী সৎকার করতে চান। অন্যদিকে, শুভর স্ত্রী, মা, ভাই ও বোন ইসলামি রীতি অনুযায়ী দাফনের দাবি তোলেন। এ নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে শুভর স্ত্রী জ্যোতি ইসলামি রীতিতে দাফনের জন্য প্রথমে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। ওই আবেদনের নিষ্পত্তি না হওয়ায় পরে হাইকোর্টে রিট করেন করেন।

শুভ হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দ পুলিশের (ডিবি) উপপরিদর্শক মফিজুল ইসলাম জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শুভর লাশ ছয়দিন নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে ছিল। গত ১০ সেপ্টেম্বর অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হুদা চৌধুরী মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমাগারে রাখার আদেশ দেন।

পুলিশ ও নিহতের পরিবারের সদস্যদের সূত্রে জানা যায়, শুভর জন্মদাতা বাবা হরি চন্দ্র দাস পেশায় কামার। চাঁদপুর মতলবের বাসিন্দা হরির নারায়ণগঞ্জ শহরে ছোট একটি দোকান রয়েছে। ২০০৩ সালে শুভর মা পার্বতী দাসের সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় হরির। ওই সময় নাবালক চার সন্তানকে নিয়ে ধর্মান্তরিত হয়ে পার্বতী হলফনামা করে আয়েশা বেগম নাম ধারণ করেন। ওই সময় ৭ বছর বয়সী শুভর নাম বিল্লাল রাখেন মা। পার্বতী পরে আরেকজন মুসলমান পুরুষকে বিয়েও করেন। অন্যদিকে, হরি চন্দ্রও আরেকজন হিন্দু নারীকে বিয়ে করেন।

শুভ ওরফে বিল্লাল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুল মান্নানের মেয়ে জ্যোতিকে ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী বিয়ে করেন। তাদের দুই বছর বয়সী একটি সন্তানও রয়েছে। জালকুড়ি এলাকায় স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে ভাড়াবাসায় থাকতেন শুভ। যদিও শুভ তার জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম আর পরিবর্তন করেননি বলে জানান ডিবির এসআই মফিজুল।

জানা যায়, বিচ্ছেদের পর চার সন্তানকে পার্বতী নিয়ে গেলেও পরে শুভ ও তার আরেক বোনকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন হরি চন্দ্র। কিন্তু সাবালক হবার পর শুভ বাবা কিংবা মা কারও সঙ্গেই থাকতেন না। নিজেই আলাদা থাকতেন এবং মাদক কারবারে জড়িত হয়ে পড়েন। কিন্তু জটিলতা বাধে তার জাতীয় পরিচয়পত্রে বাবার নাম হরি চন্দ্র দাস আর মায়ের নামের জায়গায় হরি চন্দ্র দাসের দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম রয়েছে। আর সে তার ধর্মান্তরিত হওয়ার বিষয়টি পরে হলফনামাও করেনি। বিয়ের কাগজেও নাম ব্যবহার করেছে শুধুই শুভ। এ কারণে শেষকৃত্য নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। যদিও শুভর ভাই ইব্রাহিমের দাবি, জন্মদাতা মা ও বাবার বিচ্ছেদের পর তারা দুই ভাই একটি মাদ্রাসায়ও পড়াশোনা করেছেন। ফলে, তাকে দাফন করতে চান তারা।

বিচারপতি মুহাম্মদ ইকবাল কবির ও বিচারপতি মো. সাইফুল ইসলামের বেঞ্চ গত বৃহস্পতিবার শুনানি শেষে বিল্লালের লাশ তার স্ত্রী জ্যোতির কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেয়। ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী তাকে দাফন করতে নির্দেশ দেয়। আদেশের কপি পাওয়ার রবিবার জানাজা শেষে মরদেহ দাফন করা হয়।

রিটকারীর আইনজীবী জুয়েল আজাদ সাংবাদিকদের বলেন, রিটে আইন মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সদর থানার ওসিকে বিবাদি করা হয়। মুসলিম আইন ও সাংবিধানিক অধিকারের কথা উল্লেখ করে ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী বিল্লালের লাশ দাফনের নির্দেশনা চাওয়া হয়।

অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, ‘ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী কোনো মুসলিম নারী মুসলিম পুরুষ ছাড়া অন্য ধর্মের কাউকে বিয়ে করতে পারেন না। মৃত ব্যক্তিকে মুসলমান হিসেবে গণ্য না করা হলে তার বিয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। এতে তাদের দুই বছর বয়সী সন্তানের পিতৃত্ব ও পরিচয় নিয়েও সংকট তৈরি হতে পারে।’

শুনানির সময় বিল্লালের ভাই সজিব আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, তারা দুজনেই মাদ্রাসায় পড়েছেন। পরে অ্যাটর্নি জেনারেল তাকে কোরআন থেকে একটি সূরা পাঠ করতে বলেন। তিনি সূরা ইখলাস পাঠ করে শোনান। শুনানি শেষে হাইকোর্ট বিল্লালের লাশ তার স্ত্রী জ্যোতির কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেন বলে তথ্য দেন রিটকারীর আইনজীবী জুয়েল আজাদ।

গত ৪ সেপ্টেম্বর রাত সোয়া ১টার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটের পেছনে দুর্গামহলের সামনে সড়কে শুভকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি গুলির খোসা এবং মরদেহের পাশ থেকে ১০০টি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়।

হত্যাকা-ের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ সুমন ওরফে মাইগ্যা সুমন (৪৫), সিয়াম আহমেদ সিজান (২১) ও সোহান (২৪) নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের দাবি, ইয়াবার প্রলোভন দেখিয়ে শুভর এক সহযোগীর মাধ্যমে তাকে ঘটনাস্থলে ডেকে আনা হয়। সেখানে আগে থেকে অবস্থান নেওয়া ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল তাকে ঘিরে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে।

হত্যাকা-ে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারে রিমান্ডে থাকা সুমনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৮ সেপ্টেম্বর নবাব সলিমুল্লাহ রোডের রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান ফটকের পূর্ব পাশে একটি ঝোপ থেকে বিদেশি পিস্তল ও ম্যাগাজিন উদ্ধার করে ডিবি পুলিশ। হত্যাকা-ের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত