আজ ১৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ‘আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস’। গণতন্ত্রকে সুসংহত করার লক্ষ্য নিয়ে বিশ^ব্যাপী দিবসটি পালন করা হয়। এ বছরের আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসের প্রতিপাদ্য ‘রেইজিং হ্যান্ডস অ্যান্ড ভয়েসেস ফস্টারিং এজেন্সি অ্যান্ড ওনারশিপ থ্রু ডেলিবারেটিভ ডেমোক্র্যাসি’।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) গণতন্ত্র সূচক অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ১৬৭টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। এ ছাড়াও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বাণী দিয়েছেন।
গণতন্ত্রকে টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান জরুরি: আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সরকার জনগণের ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। গতকাল সোমবার রাতে প্রচারিত এই বাণীতে তিনি বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব গণতন্ত্রকামী মানুষকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান এবং তাদের সব গণতান্ত্রিক ও মানবিক অধিকারের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বাক ও ব্যক্তিস্বাধীনতা, সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠাই হলো গণতন্ত্রের মূল দর্শন। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক অধিকার কেবল ভোটাধিকার প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; গণতন্ত্রকে টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
গণতন্ত্র দিবসের প্রতিপাদ্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। বর্তমান সরকারের প্রধান অঙ্গীকার হলো একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলা, আর সে লক্ষ্যেই ‘সবার আগে বাংলাদেশ সবার জন্য বাংলাদেশ’ প্রত্যয় নিয়ে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
গণতন্ত্রের চর্চা থাকলে স্বৈরশক্তি মাথাচাড়া দিতে পারে না রিজভী : গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে গণতন্ত্র অর্জনের সংগ্রামে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে রিজভী বলেন, মানবাধিকার রক্ষায় গণতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকে এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জনগণের সেবা ও ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সচেষ্ট হন। গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত থাকলে কোনো স্বৈরশক্তিই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে না এবং জনগণকে ক্রীতদাসে পরিণত করাও সম্ভব হয় না।
বিভিন্ন দেশে একদলীয় দুশাসনের কালো থাবা এখনো বিরাজ করছে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, বাংলাদেশেও দেড় দশক ধরে নাগরিক স্বাধীনতা, ভোটাধিকার, মানবিক মর্যাদা ও মানবাধিকার উচ্ছেদ করে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম ছিল। নানা কালাকানুনের মাধ্যমে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল এবং ভিন্নমতের কারণে অনেকে গুম, খুন ও আইনবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
গণতন্ত্র শুধু সরকার গঠনের সাময়িক প্রক্রিয়া নয় জামায়াত আমির : দিবসটি উপলক্ষে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণতন্ত্র শুধু সরকার গঠনের সাময়িক কোনো প্রক্রিয়া নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, বাকস্বাধীনতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান ভিত্তি। গণতন্ত্র সুরক্ষিত থাকলে একটি সমাজ স্বৈরাচার, শোষণ ও বৈষম্য থেকে মুক্ত হয়ে অগ্রগতির পথে এগিয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছে। জনগণ ভোটাধিকার, ন্যায়বিচার, সামাজিক সুরক্ষা ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তবে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করেছে। নির্বাচনের আগে বিএনপি গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় এসে তারা সেই প্রতিশ্রুতি ভুলে গেছে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পুনরুদ্ধার করেছে। ইতিহাসজুড়ে স্বৈরাচারী মনোভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে বিভিন্নভাবে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে দেশের সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে জুলাই বিপ্লব সংঘটিত করেছে। এই বিপ্লব ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। যে কোনো মূল্যে জাতির প্রত্যাশা অনুযায়ী বৈষম্যমুক্ত মানবিক বাংলাদেশ গঠন করতে হবে।
গণতন্ত্র কেবল ভোটের আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় জাতিসংঘ মহাসচিব : এদিকে দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান বিভাজন, সংঘাত এবং নাগরিক ও সরকারের মধ্যবর্তী সামাজিক চুক্তির অবনতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। তিনি বলেন, গণতন্ত্র কেবল ভোটের আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত মানবাধিকার সুসংহত করা, আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বস্তরের মানুষের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার এক দৈনন্দিন অনুশীলন। সুশীল সমাজসহ সমাজের নানা মত ও পথের মানুষের সঙ্গে সংলাপ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার মানসিকতার মাধ্যমেই একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সমৃদ্ধ লাভ করে।