পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের তিন নদীর মোহনা ও গঙ্গামতী এলাকায় দেখা মিলছে বিপুলসংখ্যক ঝিনুকের। বালুচরজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য সাদা ঝিনুক আর সমুদ্রের নীল জলরাশির মেলবন্ধনে সৃষ্টি হয়েছে নয়নাভিরাম দৃশ্য।
প্রকৃতির এমন অপরূপ আয়োজন দেখতে এসে মুগ্ধ হচ্ছেন পর্যটকরা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ আবার সৈকতে হাঁটতে হাঁটতে উপভোগ করছেন ঝিনুকের এই সমারোহ।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে দেখা যায়, কুয়াকাটার তিন নদীর মোহনা ও গঙ্গামতী এলাকার সৈকতের বিভিন্ন অংশে ছোট-বড় অসংখ্য ঝিনুক ছড়িয়ে রয়েছে। কোথাও বালুর ওপর সারি সারি ঝিনুক, আবার কোথাও অগভীর পানির সঙ্গে মিশে আছে সাদা ঝিনুকের খোলস। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, বালুচরে যেন সাদা কার্পেট বিছিয়ে রাখা হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, জোয়ারের পানিতে ভেসে আসা ঝিনুক ভাটার সময় সৈকতের বিভিন্ন অংশে জমা হয়। জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে ঝিনুকের উপস্থিতিও কম-বেশি হয়। তবে এবার তুলনামূলকভাবে বেশি ঝিনুক দেখা যাচ্ছে। এতে পর্যটকদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে বাড়তি আগ্রহ।
খুলনা থেকে কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা পর্যটক সাজিদ বলেন, ‘কুয়াকাটায় এসে এমন দৃশ্য আগে দেখিনি। অসংখ্য ঝিনুক একসঙ্গে দেখে খুব ভালো লাগছে। দৃশ্যটি উপভোগ করছি এবং ছবি তুলছি।’
পর্যটক জাকিয়া বিশ্বাস বলেন, ‘সমুদ্রের নীল পানির সঙ্গে সাদা ঝিনুকের দৃশ্যটি খুবই সুন্দর। তবে এগুলো যেন নষ্ট না হয়, সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে।’
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক আকাশ চৌধুরী বলেন, ‘এরকম ঝিনুক জীবনে দেখিনি। দেখে খুবই ভালো লাগছে।’
কুয়াকাটার ট্যুর গাইড সুরুজ খান বলেন, ‘জোয়ারের সময় সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে ঝিনুকগুলো তীরে চলে আসে। ভাটা হলে সৈকতের বিভিন্ন জায়গায় এগুলো দেখা যায়। কম-বেশি কুয়াকাটায় সবসময়ই ঝিনুক পাওয়া যায়। তবে এবার ঝিনুকের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি। আবহাওয়াও ভালো রয়েছে। সব মিলিয়ে এখন কুয়াকাটা ভ্রমণের উপযুক্ত সময়।’
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের (উপরা) সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান মিরাজ বলেন, ‘কুয়াকাটার সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটকদের সচেতন ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঝিনুক বা প্রাকৃতিক সম্পদ নষ্ট না করে আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। একইভাবে সৈকতে চলাচলকারী ইজিবাইক, অটোরিকশা, ভ্যান ও মোটরসাইকেল চালকদেরও সতর্ক থাকতে হবে, যাতে ঝিনুক, বালিয়াড়ি ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি না হয়।’
লেম্বুরবন বিট কর্মকর্তা আমির হামজা বলেন, ‘লেম্বুরবনের সৈকতে ছড়িয়ে থাকা ঝিনুক পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এসব ঝিনুক ও মোহনার জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটকদের সচেতন হওয়া জরুরি। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শীত মৌসুম পর্যন্ত এখানে ঝিনুকের প্রাচুর্য বেশি দেখা যায়। ঝিনুক সংগ্রহ, ভাঙা বা নষ্ট করা এবং আবর্জনা ফেলার বিষয়ে নজরদারি করা হচ্ছে। বিভাগীয় বন কর্মকর্তার নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত টহল ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সংরক্ষণ কার্যক্রম চলছে। তবে বিস্তীর্ণ এলাকা ও সীমিত জনবলের কারণে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা কঠিন।’
ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা জোনের ইনচার্জ মো. নাজমুল হাসান বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তা ও পর্যটন শিল্প রক্ষায় আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি। সৈকতের এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায়ও আমাদের পুলিশ সদস্যরা কাজ করবে।’
সৈকতে আসা পর্যটকদের অনেকেই ঝিনুকের সঙ্গে ছবি তুলছেন। কেউ বালুচরে হেঁটে হেঁটে ঝিনুক দেখছেন, আবার কেউ প্রিয়জনদের সঙ্গে এসব দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করছেন। কুয়াকাটার চিরচেনা সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সৌন্দর্যের পাশাপাশি ঝিনুকের এই প্রাকৃতিক সমারোহও এখন পর্যটকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
তবে সৈকতের এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধরে রাখতে ঝিনুক নির্বিচারে সংগ্রহ না করার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ঝিনুকগুলো সৈকতে রেখে দিলে অন্য পর্যটকরাও এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।