মহান শিক্ষা দিবস : শিক্ষকদের উদাসীনতায় কমছে প্রাথমিকের শিক্ষার্থী

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে গত কয়েক বছরে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমেছে। এই সময়ে শিক্ষার্থী বেড়েছে মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্টেনগুলোতে। প্রাথমিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে গ্রামে-গঞ্জে অসংখ্য কিন্ডারগার্টেন তথা কেজি স্কুল প্রতিষ্ঠাও দায়ী।

মধ্যবিত্ত অভিভাবকরা বলছেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান নিয়ে তারা সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। এ জন্য সন্তানদের তারা কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করছেন। অন্যদিকে দরিদ্র অভিভাবকদের ভাষ্য অনুযায়ী, খরচ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় তারা তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিচ্ছেন।

জানা যায়, দেশে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। এছাড়া শিক্ষার উন্নয়নে কয়েক বছর আগেও বেশকিছু বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেছে সরকার। শুধু তাই নয়, বছরের প্রথম দিন বিনামূল্যে বই বিতরণ করে উৎসব পালন করছে। সরকারিভাবে শিক্ষার্থীদের উপকরণ কেনা বাবদ দেওয়া হচ্ছে উপবৃত্তি।

এছাড়াও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেওয়া হয়েছে সুসজ্জিত একাডেমিক ভবন। বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা, ক্ষুদ্র মেরামত ও প্লে শ্রেণির কক্ষ সজ্জিতকরণ এবং শিক্ষা উপকরণ কেনার পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রয়েছে একেকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পাশাপাশি পাঠদানের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষকও নিয়োগ রয়েছেন। এরপরও শিক্ষার্থী কমছে প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

জানা গেছে, মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নের অভাবের কারণে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সন্তানদের পাঠাচ্ছেন না অভিভাবকরা। বেশি টাকা খরচ হলেও তারা সন্তানকে দিচ্ছেন কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষা। যদিও ‘অভিভাবকদের কাঙ্খিত শিক্ষার’ উদ্দেশ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কোটি কোটি টাকা খরচ করছে সরকার।

অভিভাবকরা জানিয়েছেন, সঠিক জবাবদিহিতা নেই সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এ কারণে পাঠদানে আগ্রহী নন শিক্ষকরা। একইসঙ্গে সরকারি চাকরি স্থায়ী মনোভাবের কারণে ক্লাসে অনিয়মিত উপস্থিতি থাকে তাদের। পাশাপাশি অনেকেই এসএসসি বা এইচএসসি পাস করেই ঢুকে পড়েছেন এ চাকরিতে। সেক্ষেত্রে দুর্বল মেধার একটা প্রশ্নও থেকে যায়। সবমিলে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার গুণগত মান দিনদিন কমে যাচ্ছে।

তারা বলছেন, শিক্ষকদের পাঠদান নিয়মিত মনিটরিং না করায় তারা এ ব্যাপারে আন্তরিক না। চাকরি বাঁচানোর একটা উপায় হিসেবে তারা পাঠদান করছেন। তাই বাধ্য হয়ে অর্থ ব্যয় করে হলেও সন্তানদের কেজি স্কুলে পাঠাচ্ছি। এছাড়া শুধু আমরাই নয়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ খোদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও নিজেদের সন্তানকে কেজি স্কুলে পাঠাচ্ছেন। ফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন ‘গরিবের সন্তানদের স্কুলে’ পরিণত হয়েছে।

এদিকে, প্রতিবছর ব্যাঙয়ের ছাতার মতো কেজি স্কুলের সংখ্যাও বাড়ছে আনোয়ারায়। এসব স্কুলের অনুমোদন না থাকলেও ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে নানা অফার দিয়ে অভিভাবকদের আকৃষ্ট করে শিক্ষার্থী সংগ্রহ করছে। বহুমুখী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে পোস্টার, লিফলেট, বিলবোর্ডসহ মাইকিং করে শিক্ষার্থী ভর্তি করে তারা। অবশ্য টাকা বেশি নিলেও শিক্ষা দেওয়ায় তাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিকল্প বেছে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। এছাড়া এসব স্কুলে উপজেলা শিক্ষা অফিসকে বিভিন্ন কৌশলে ম্যানেজ করে সরবরাহও করা হচ্ছে সরকারি বই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবক বলেন, প্রাথমিকের সরকারি শিক্ষকরা ১৮ থেকে ২৫ হাজার টাকা বেতন নিয়েও ঠিকমতো ক্লাস নিচ্ছেন না। অথচ যারা সরকারি চাকরি না পেয়ে কেজি স্কুলে মাত্র তিন থেকে চার হাজার টাকা মাসিক বেতনে কাজ করছেন, তাদের পাঠদানে সবাই ঝুঁকে পড়েছেন। এর কারণ সরকারি বিদ্যালয়ে নিয়মিত মনিটরিং করা হয় না। এছাড়া গুণগত মান যাচাই-বাছাই না করে গণহারে বেসরকারি বিদ্যালয়কে সরকারি করায় প্রাথমিক শিক্ষার মান অনেক কমে যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান প্রদীপ চক্রবর্ত্তী বলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির প্রবণতা শুধু জনসংখ্যাতাত্ত্বিক কারণে নয়, বরং অভিভাবকদের পছন্দের পরিবর্তনেরও প্রতিফলন। জনসংখ্যা বাড়তে থাকলেও যদি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আরও বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করতে থাকে তবে সরকারি স্কুলে ভর্তির এই পতন স্পষ্টভাবে অভিভাবকদের পছন্দের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

আনোয়ারা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিন্দোল বারী বলেন, ‘উপজেলায় ১১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিকে ভর্তির সংখ্যা ছিল ২২ হাজার ৫৪ জন শিক্ষার্থী। চলতি শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিকে ভর্তির সংখ্যা ২১ হাজার ৮৭০ জন শিক্ষার্থী। তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে নতুন করে একই স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা বেআইনি। যা কঠোরভাবে দমন করা হবে। প্রাথমিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিষয়ে ধারণা নেই জানিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত