পাঁচ দিন ‘মৃত’ ছিলেন খোরশেদ, নাকি তৈরি করেছিলেন মৃত্যুর গল্প?

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৭ পিএম

পাঁচ দিন মর্গে থেকে জ্যান্ত ফিরে আসার অবিশ্বাস্য গল্প ছড়ানোর পাশাপাশি অভাবের কথা বলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা নিয়েছেন খোরশেদ আলম নামের এক ব্যক্তি। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৭ বছর আগের কথিত 'মৃত থেকে জীবিত' হয়ে ওঠার ঘটনার স্বপক্ষে কোনো নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। এমনকি তার মা ও স্ত্রীর বক্তব্যেই মিলেছে একাধিক অসঙ্গতি।

২০০৯ সালের জুনে চট্টগ্রামের বায়েজিদ কুঞ্জছায়া এলাকার সাবেক হেলপার খোরশেদ দাবি করেন, হাসপাতালে ভর্তির এক দিন পর তার মৃত্যু হয় এবং মরদেহ পাঁচ দিন মর্গে রাখা হয়। পরে বাড়ি নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্স গর্তে পড়ে ঝাঁকুনি খেলে তিনি নড়ে ওঠেন। অতিসম্প্রতি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের কাছে নিজের এই ‘অলৌকিক’ গল্প ও দারিদ্র্যের কথা তুলে ধরলে মেয়র তাকে সহায়তা করেন।

তবে অনুসন্ধানে খোরশেদের মায়ের বক্তব্যের সঙ্গে দাবির অমিল দেখা গেছে। তার মা সায়েরা বেগম জানান, মর্গ থেকে দুই নম্বর গেটে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি ঘটেনি। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ট্রলিতে পড়ে থাকা অবস্থায় ছেলেকে দেখে তার সন্দেহ হলে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান এবং তিনি জীবিত বলে প্রমাণিত হন।

সায়েরা বেগম বলেন, 'আমার জমানো চার লাখ টাকা দিয়ে তার চিকিৎসা করি। সুস্থ হয়ে ফিরলে সে আমার সঙ্গে আর থাকতে চায়নি। নানা জায়গা থেকে আসা সাহায্যও সে আমাদের জানায়নি।'

চিকিৎসা ব্যয়ের হিসাব নিয়েও বড় অসঙ্গতি রয়েছে; মা চার লাখ টাকার কথা বললেও খোরশেদের দাবি ব্যয় হয়েছিল ১২ লাখ টাকা। খোরশেদের দ্বিতীয় স্ত্রী মানসুরা (১৮) জানান, 'তারা মা-ছেলে নানা বিষয়ে অনেক দিন ধরে ঝামেলা করে। তাই কেউ একসঙ্গে থাকে না, আলাদা থাকে। আর এই ঘটনা সবার মুখে শোনা। তাই এ বিষয়ে আমার বিশ্বাস নেই।'

স্থানীয় বাসিন্দা জুয়েল বলেন, 'খোরশেদের অসুস্থতার বিষয়টি তারা জানতেন। কিন্তু তিনি মারা গেছেন এবং কয়েক দিন পর আবার জীবিত হয়ে ফিরেছেন—এমন কথা শুনে অনেকেই বিষয়টিকে সত্য ধরে নেন।'

মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, 'আমার কাছে অনেক ধরনের মানুষ আসে সাহায্যের জন্য। আমি সবাইকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। তবে বিষয়টি যেহেতু জানতে পেরেছি, তাই আমরা এ ব্যাপারটি খতিয়ে দেখব।'

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টি থেকেও ঘটনাটিকে ভিত্তিহীন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক জসিম উদ্দিন বলেন, 'ঘটনাটি একটি বায়বীয় তথ্য বলেই মনে হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি যদি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান, তাহলে ওয়ার্ড থেকেই তার সব কাগজপত্র তৈরি করে স্বজনদের কাছে লাশ বুঝিয়ে দেওয়া হয়। খোরশেদের দাবির পক্ষে তার কাছে কোনো কাগজপত্র থাকলে তিনি আমাদের দেখাতে পারেন।'

একই বিষয়ে ডা. আমির খসরু বলেন, 'যেকোনো রোগীকে মৃত ঘোষণার আগে তার প্রেসার, পালস, চোখের মনি ও ইসিজি পরীক্ষা করা হয়। যদি খোরশেদের বেলায় এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে অবশ্যই সেসবের ডকুমেন্টস তার কাছে থাকবে। যদি সেসব না থাকে, তাহলে এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।'

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত