মানুষের জীবন কখনোই নিরবচ্ছিন্নভাবে স্বস্তির পথে চলে না। সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের পাশাপাশি দুঃখ, সংকট ও বিপদের উপস্থিতি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর মুমিনের জীবনে বিপদ শুধু কষ্টের কারণ নয়, বরং তা বিশ্বাসের মান যাচাইয়ের এক গভীর উপলক্ষ। মহান আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাদের কখনো সুখের মাধ্যমে, কখনো দুঃখের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন। এই পরীক্ষার মধ্য দিয়েই বান্দার অন্তরের দৃঢ়তা, বিশ্বাসের গভীরতা ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার বাস্তব চিত্র প্রকাশ পায়। বিপদ মানুষকে ভেঙে দেওয়ার জন্য আসে না, বরং তাকে পরিশুদ্ধ ও উন্নত করার জন্যই আসে। সংকটের মুহূর্তে একজন মুমিন যদি সঠিক পথ অবলম্বন করতে পারে, তবে সেই বিপদই তার জন্য রহমত ও কল্যাণের দ্বার খুলে দেয়। কোরআন ও হাদিসে বিপদকালে মুমিনের করণীয় বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে, যা অনুসরণ করলে হৃদয় শক্ত হয়, আশা জাগ্রত থাকে এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ সহজ হয়। তাই বিপদের সময় হতাশায় ডুবে না গিয়ে কীভাবে একজন মুমিন আত্মিকভাবে দৃঢ় থাকতে পারে, তা জানা প্রতিটি বিশ্বাসীর জন্য অত্যন্ত জরুরি। বিপদে মুমিনের জন্য কয়েকটি করণীয় উল্লেখ করা হলো, যা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতে কল্যাণ বয়ে আনবে।
আল্লাহমুখী হওয়া : কোনো বিপদ বা সংকটে পড়লে মুমিনের প্রথম ও প্রধান কাজ হলো আল্লাহমুখী হওয়া। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমার শাস্তি যখন তাদের ওপর আপতিত হলো তখন তারা কেন বিনীত হলো না? অধিকন্তু তাদের হৃদয় কঠিন হয়েছিল এবং তারা যা করছিল শয়তান তা তাদের চোখে শোভন করেছিল।’ (সুরা আনআম, আয়াত ৪৩)
আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ করা : বিপদ থেকে মুক্তির ব্যাপারে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখা এবং বিপদে পড়ার কারণে নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ না করা। বরং আল্লাহর কাছে মুক্তি ও কল্যাণ কামনা করা। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি বান্দার সঙ্গে আমার প্রতি তার ধারণার অনুরূপ আচরণ করি।’ (সহিহ বুখারি)
দোয়া করা : অবিরাম দোয়া ও প্রার্থনার মাধ্যমে মহান আল্লাহ মুমিনের বিপদ ও সংকট দূর করে দেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বরং তিনিই আর্তের আহ্বানে সাড়া দেন, যখন সে তাকে ডাকে এবং বিপদ দূর করেন।’ (সুরা নামল, আয়াত ৬২) অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে প্রশ্ন করে, আমি তো তাদের কাছেই। আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে আমি তার আহ্বানে সাড়া দিই। সুতরাং তারাও আমার আহ্বানে সাড়া দিক এবং আমার প্রতি ইমান আনুক, যাতে তারা সঠিক পথে চলতে পারে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৬)
ইসতেগফার করা : ইসতেগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা বিপদ ও দুশ্চিন্তা দূর করে এবং জীবনে প্রাচুর্য আনে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘বলেছি, তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। তিনি তো ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন। তোমাদের সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতিতে এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা।’ (সুরা নুহ, আয়াত ১০-১২)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি নিয়মিত ইসতেগফার পড়লে মহান আল্লাহ তাকে সব বিপদ থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করবেন, সব দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করবেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে জীবিকা দেবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারবে না।’ (সুনানে আবি দাউদ)
জিকির করা : সংকটকালে বেশি বেশি মহান আল্লাহর জিকির বা স্মরণ করা আবশ্যক। কেননা এতে মানসিক অস্থিরতা কমে। তাসবিহ পাঠ, মাসনুন দোয়া, কোরআন তেলাওয়াত ইত্যাদি জিকিরের অন্তর্ভুক্ত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা ইমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের হৃদয় প্রশান্ত হয়। জেনে রেখো! আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ, আয়াত ২৮)
পারস্পরিক সহযোগিতা করা : বিপদ, বিপর্যয় ও সংকটের সময় মুমিনরা পরস্পরের সহযোগিতা করবে। কেননা মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা সৎকাজ ও আল্লাহভীতিতে পরস্পরের সহযোগিতা করবে এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরের সহযোগিতা করবে না।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত ২)
আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা : মুমিন সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর ভরসা করে। কেননা আল্লাহ বলেছেন, ‘যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে তিনি তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক, আয়াত ৩) মহানবী (সা.) বলেন, ‘যদি তোমরা মহান আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে ভরসা করতে পারো, তবে তিনি তোমাদের পাখির মতো জীবিকা দান করবেন। পাখি সকালে খালি পেটে বের হয় এবং বিকেলে ভরা পেটে ঘরে ফেরে।’ (সুনানে তিরমিজি)
ধৈর্যধারণ করা : যেকোনো বিপদ ও সংকটে মুমিন ধৈর্য হারা হবে না, বরং সে ধৈর্যের সঙ্গে তা মোকাবিলা করবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুমিনের বিষয়টি কত চমৎকার। তার জন্য শুধুই কল্যাণ। কল্যাণ ছাড়া আর কিছুই নেই। যদি তার জন্য কোনো খুশির ব্যাপার হয় এবং সে কৃতজ্ঞতা আদায় করে, তবে সেটা তার জন্য কল্যাণকর। আর যদি কোনো দুঃখের বিষয় হয় এবং সে ধৈর্যধারণ করে, সেটাও তার জন্য কল্যাণকর।’ (সহিহ মুসলিম)
নামাজ আদায় : বিপদ ও সংকটে মহান আল্লাহ মুমিনদের নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করতে বলেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। এটা বিনীত ব্যক্তি ছাড়া অন্যদের জন্য অবশ্যই কঠিন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ৪৫)
বিপদ-আপদের কারণে মুমিনের যে পার্থিব ক্ষতি ও কষ্ট হয়, তার বিনিময়ে মহান আল্লাহ তার গুনাহ ক্ষমা করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে কষ্ট-ক্লেশ, রোগব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানি আসে, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে ফুটে, এসবের বিনিময়ে আল্লাহ তার গুণাহগুলো ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহ বুখারি)
বিপদ ও সংকট মানবজীবনের এমন এক অধ্যায়, যা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে একজন মুমিনের জন্য এই বিপদ কেবল কষ্টের বোঝা নয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও মর্যাদা বৃদ্ধির সুবর্ণ সুযোগ। আল্লাহমুখী হওয়া, দোয়া, ইসতেগফার, জিকির, ধৈর্য ও ভরসার মাধ্যমে মুমিন তার বিপদকে শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে।
লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক