ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০১ পিএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ডুজা) প্রতিষ্ঠার ৪১ বছরে পদার্পণ করেছে। ১৯৮৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করা সংগঠনটি চার দশক ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসন, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা ও ক্যাম্পাসের নানা ঘটনা পেশাদারত্বের সঙ্গে গণমাধ্যমে তুলে ধরে আসছে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ক্যাফেটেরিয়ায় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রশাসনের প্রতিনিধি, সমিতির সাবেক ও বর্তমান সদস্য এবং বিভিন্ন পর্যায়ের সাংবাদিকরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, গণমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীলতা এবং ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী বলেন, সাংবাদিকতার পরিধি ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও সাংবাদিকতা কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। গণমাধ্যম ও সাংবাদিকের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি সাংবাদিকতার গুণগত মান এবং সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে হবে’—এ কথা এখন বহুল ব্যবহৃত। তবে সাংবাদিকদের রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার পাশাপাশি নিজেদের কর্মক্ষেত্রের ক্ষমতার কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিক ও সম্পাদকও সাংবাদিকদের কর্মক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাধর ব্যক্তি। সাংবাদিক তাঁর শ্রমের যথাযথ মূল্য ও বেতন পাচ্ছেন কি না, সেটিও আলোচনায় আসা দরকার।

সালেহ শিবলী আরও বলেন, নতুন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান চালুর আগে সাংবাদিক ও কর্মীদের নিয়মিত বেতন দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও আর্থিক সক্ষমতা ছাড়া সংবাদপত্র, টেলিভিশন বা অনলাইন গণমাধ্যম চালু করলে সেখানে কর্মরত সাংবাদিক-কর্মীরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন।

তিনি বলেন, ‘ধুমধাম করে পত্রিকা বের করলাম, দুই মাস পর আর বের করলাম না’—এ ধরনের পরিস্থিতি সাংবাদিকদের পেশাগত অনিশ্চয়তা তৈরি করে। গণমাধ্যমে যোগ দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া বা মালিকপক্ষের খোঁজ না থাকার মতো ঘটনা বন্ধ হওয়া দরকার।

সাংবাদিকতার দায়িত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারকে প্রশ্ন করার অধিকার শুধু সাংবাদিকদের নয়, জনগণেরও রয়েছে। রাষ্ট্র জনগণের এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব জনগণ নির্বাচিত বা দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের দেয়। সাংবাদিকতা একটি প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম হিসেবে জনগণের প্রশ্নগুলোকে আরও সংগঠিত ও কার্যকরভাবে সামনে তুলে ধরতে পারে।

তিনি সাংবাদিকদের নিজেদের কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ ও পেশাগত কাঠামোকে আরও শুদ্ধ ও দায়িত্বশীল করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা ও পেশাগত সৌহার্দ্য বজায় রাখার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাবেক সভাপতি ও গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে অংশ নিতে পেরে তিনি আনন্দিত। সমিতির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বর্তমান ও সাবেক সদস্যদের প্রতি শুভেচ্ছা জানান।

তিনি বলেন, সাংবাদিক সমিতির সঙ্গে যুক্ত থাকার সময়কার সহকর্মী ও সিনিয়রদের সঙ্গে দীর্ঘদিন পর একত্র হওয়ার সুযোগ হয়েছে। এ ধরনের আয়োজন সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক আরও দৃঢ় করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আলমোজাদ্দেদী আলফেসানী বলেন, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করা সহজ কাজ নয়। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস সাংবাদিকরা দীর্ঘদিন ধরে দক্ষতার সঙ্গে এ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাঁদের প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিবাচক কার্যক্রমের পাশাপাশি বিভিন্ন অসংগতি ও সমস্যাও উঠে আসে।

তিনি বলেন, সাংবাদিকদের প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। তাই প্রশাসন ও সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন।

নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের জন্য প্রশিক্ষণের আয়োজনের প্রস্তাব দেন। সাংবাদিকতার নৈতিকতা, তথ্য যাচাই, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে এ ধরনের প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রশাসনের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতে ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম, গবেষণা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা ও অর্জন এবং ক্যাম্পাসের সামগ্রিক পরিবেশ গণমাধ্যমে তুলে ধরার মাধ্যমে সাংবাদিকরা বৃহত্তর সমাজের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র উপস্থাপন করেন।

তারা বলেন, ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তথ্যের যথার্থতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সংবাদ পরিবেশন করা জরুরি। পাশাপাশি সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আলোচনা সভা শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে সমিতির বর্তমান ও সাবেক সদস্যসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা অংশ নেন। প্রতিষ্ঠার চার দশক পেরিয়ে ৪১ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে ডুজার সদস্যরা সংগঠনের ঐতিহ্য, পেশাগত মান ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত