অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কি?

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১২ পিএম

শিশু বিকেলে বাড়ি থেকে বের হয়েছে। সন্ধ্যায় তার সর্বশেষ অবস্থান পাওয়া গেছে। তারপর ফোন নীরব হয়ে গেছে। রাত পেরিয়েছে। পরদিন নির্জন জায়গা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে শিশুর মরদেহ। বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর এমন পরিণতি এখন বিচ্ছিন্ন আতঙ্ক নয়। নিশ্চিত আতঙ্ক হয়ে গেছে। অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড সেই আতঙ্ককে আরও সামনে নিয়ে এনেছে। 

অপ্রতিমের ক্ষেত্রে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে নানান আলোচনা হচ্ছে। তার সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনটি নিখোঁজের পর পাওয়া যায়নি। পরে সন্দেহভাজন তুহিনের বাড়ি থেকে সেটা উদ্ধার করেছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। আবার কোটবাড়ী–সালমানপুর এলাকার মাদকচক্র বা কিশোর গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতার কথাও এসেছে। এমনকি অপ্রতিমের মায়ের সঙ্গে কোনো পূর্বশত্রুতা ছিল কিনা, সেটাও তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার বলেছেন, শুধু আইফোনের জন্য হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে, নাকি এর পেছনে অন্য উদ্দেশ্য ছিল, তা তদন্ত করেই নিশ্চিত হতে হবে।  অপ্রতিমকে কেন লক্ষ্য করা হলো? তাকে কি আগে থেকেই কেউ চিনত? তুহিন কেন তার সঙ্গে ছিল? তাকে কি কোনো প্রলোভনে পাহাড়ের দিকে নেওয়া হয়েছিল? আরও কেউ সেখানে ছিল কিনা? আইফোন নেওয়ার উদ্দেশ্য থাকলে সেটাই কি হত্যার মূল কারণ, নাকি ফোনটি ছিল অন্য কোনো অপরাধের আড়াল? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে শুধু অপ্রতিম হত্যার রহস্য নয়, শিশুদের লক্ষ্য করে অপরাধের ধরন সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।

অপ্রতিম শুক্রবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে কোটবাড়ীর বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বের হয়েছিল। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি। পরিবারের পক্ষ থেকে সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার সন্ধানে কাজ শুরু করেছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়েছে। ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনকে দেখা গেছে। পরে তাকে আটক করা হয়েছে এবং তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও দুজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।  অর্থাৎ সিসিটিভি দেখা হয়নি- বিষয়টি এমন নয়। জানা দরকার-সিসিটিভি, ফোনের অবস্থান, প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য এবং সম্ভাব্য গতিপথ কত দ্রুত একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। অপ্রতিমের ফোনের অবস্থান সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত গন্ধমতী এলাকায় শনাক্ত করা গেছে। তারপর আর অবস্থান পাওয়া যায়নি। প্রায় ২১ ঘণ্টা পর লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকা থেকে উদ্ধার হয়েছে তার মরদেহ। 

এই সময়টি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফোনের সর্বশেষ অবস্থান পাওয়ার পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল? সম্ভাব্য গতিপথ কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল? ফোনের নেটওয়ার্ক তথ্য, সিসিটিভি এবং সন্দেহভাজনদের গতিবিধি কি একই সময়রেখায় বসানো হয়েছিল? প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু কোনো মোবাইল টাওয়ারের অবস্থান পাওয়া যথেষ্ট নয়; নেটওয়ার্কের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করলে অনুসন্ধানের এলাকা আরও সংকুচিত করা সম্ভব। অপ্রতিমের ক্ষেত্রে এসব তথ্য কখন পাওয়া গিয়েছিল এবং সেগুলো কীভাবে কাজে লাগানো হয়েছিল, তার নিরপেক্ষ পর্যালোচনা দরকার।  কারণ অপ্রতিম একা নয়। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ জন শিশু নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা গেলেও ২ হাজার ৩৮ জন তখনো উদ্ধার হয়নি।


পুলিশ বলছে, শিশু-কিশোরদের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে অভিমান, পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক কলহ, বন্ধু বা সহপাঠীর প্রভাব, স্বাধীনভাবে থাকার আকাক্সক্ষা, অর্থ বা অন্য সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা এবং কিছু ক্ষেত্রে অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার পর লজ্জায় পালিয়ে থাকার মতো কারণ আছে। ছোটদের ক্ষেত্রে পথ হারিয়ে যাওয়া বা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাও ঘটে।  শিশু কেন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল, সেটা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, নিখোঁজ হওয়ার পর কোথায় গেল সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সব নিখোঁজ শিশু স্বেচ্ছায় চলে যায় না। কেউ অপরাধীর প্রলোভনের শিকার হতে পারে, কেউ অপহৃত হতে পারে, কেউ পরিচিত কারও সঙ্গে বেরিয়ে বিপদে পড়তে পারে। ফলে নিখোঁজের কারণ নিয়ে প্রাথমিক ধারণা করেই অনুসন্ধানের তীব্রতা কমিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

মরদেহ উদ্ধারের পর তদন্ত যতটা দৃশ্যমান হয়, নিখোঁজ হওয়ার পর অনুসন্ধানও ততটাই দৃশ্যমান হওয়া দরকার। একজন শিশু নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ছবি, সর্বশেষ অবস্থান, ফোনের তথ্য, সিসিটিভি, সম্ভাব্য যোগাযোগ এবং চলাচলের পথকে কেন্দ্র করে দ্রুত সমন্বিত অনুসন্ধান শুরু করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। থানা, ডিবি, সাইবার ইউনিট, মোবাইল অপারেটর, স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবহনব্যবস্থাকে প্রয়োজন অনুযায়ী একই অনুসন্ধানের অংশ হতে হবে। কারণ মরদেহ উদ্ধারের পর তদন্তের সুযোগ থাকে; কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার পর সময় থাকে না। অপ্রতিমের হত্যার প্রকৃত কারণ- আইফোন, নেশার টাকা, কোনো অপরাধচক্র, ব্যক্তিগত বিরোধ নাকি অন্য কিছু- তদন্তেই নির্ধারিত হোক।

এখন সবচেয়ে প্রয়োজন সেই তদন্ত থেকে কার্যকর শিক্ষা নেওয়া: বাংলাদেশে কোনো শিশু নিখোঁজ হলে সেটাকে শুধু জিডি হিসেবে নয়, সময়সীমাবদ্ধ জরুরি অনুসন্ধান হিসেবে বিবেচনা করা।  নিখোঁজ হওয়ার পর প্রতিটি মুহূর্ত শিশুকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ। আর সেই সুযোগ শেষ হয়ে গেলে পরদিন পাহাড়, খাল, ঝোপ কিংবা নির্জন কোনো জায়গা থেকে মরদেহ উদ্ধারের খবর আসবে।  অপ্রতিমের ক্ষেত্রে এখন আমাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই শুধু কে হত্যা করল নয়, প্রশ্নটি আরও বড়: শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে পেতে আমরা কতটা দ্রুত, কতটা প্রযুক্তিনির্ভর এবং কতটা সংগঠিতভাবে কাজ করি!  অপ্রতিমকে আমরা আর ফিরিয়ে আনতে পারব না। কিন্তু তার নিখোঁজ হওয়ার পরের কয়েক ঘণ্টা যদি আমাদের অনুসন্ধানব্যবস্থাকে বদলে দেয়, তবে আগামীতে সেই সময় নিশ্চয় নিখোঁজ শিশুর জীবন বাঁচানোর সুযোগ হয়ে উঠবে।

লেখক: 

দীপু মাহমুদ, চাইল্ড কেয়ার, ইউনিসেফ 

গবেষক ও শিশুসাহিত্যিক 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত