টাঙ্গাইলে ঘন ঘন লোডশেডিং ও তীব্র বিদ্যুৎ সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাহকেরা। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা পর তা ফিরছে। আবার বিদ্যুৎ এলেও স্থায়ী হচ্ছে মাত্র আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা।
তীব্র গরমের মধ্যে এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। পাশাপাশি বিদ্যুৎনির্ভর স্থানীয় কলকারখানাগুলোর উৎপাদনও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ না থাকলেও প্রতি মাসে তাদের অতিরিক্ত ‘ভুতুড়ে বিল’ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলার বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের চার্জিংকে দায়ী করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ ও গ্যারেজ মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় সাধারণত ১৫ অ্যাম্পিয়ারের ৪ থেকে ৫টি ব্যাটারি থাকে। এসব ব্যাটারি চার্জ দিতে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১ থেকে দেড় ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। একটি অটোরিকশার ব্যাটারি পূর্ণ চার্জ করতে দৈনিক ৮ থেকে ১২ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ লাগে।
টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলায় চলাচলকারী প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার ইজিবাইক ও অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ করতে প্রতিদিন গড়ে ৭ লাখ ২০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। মেগাওয়াটের হিসাবে এর পরিমাণ ২৫ থেকে ৩০ মেগাওয়াট। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রায় দুটি উপজেলার দৈনিক চাহিদার কাছাকাছি।
প্রতিদিন রাত ৮টার পর জাতীয়ভাবে বিদ্যুতের চাহিদা যখন সবচেয়ে বেশি থাকে, সেই পিক আওয়ারেই জেলার বিভিন্ন গ্যারেজে সারি সারি অটোরিকশা চার্জে বসানো হয়। একসঙ্গে শত শত যানবাহন চার্জ দেওয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) অধীনে টাঙ্গাইল সদরের বৈল্লা, কচুয়াডাঙ্গা ও ময়মনসিংহ রোড—এই তিনটি ফিডারে মোট গ্রাহক ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৪ জন। এসব এলাকায় দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ১৬০ থেকে ১৭০ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ১০০ থেকে ১১০ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ৬০ থেকে ৭০ মেগাওয়াট, অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ৪১ শতাংশ বিদ্যুতের ঘাটতি থাকছে।
এই ঘাটতির মধ্যেই শুধু পিডিবির আওতাধীন এলাকাতেই প্রতিদিন ৩৩ হাজারের বেশি ব্যাটারিচালিত যান চার্জ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে শহর ও আশপাশের এলাকাতেই রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার যান।
অন্যদিকে, টাঙ্গাইল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকাও বিস্তৃত। জেলা সদরের কিছু অংশ, কালিহাতী, বাসাইল, সখিপুরের কিছু অংশ, মির্জাপুর, নাগরপুর, দেলদুয়ার এবং সিরাজগঞ্জের চৌহালীর কিছু অংশ নিয়ে গঠিত এ অঞ্চলে মোট গ্রাহক সংখ্যা ৬ লাখ ৫১ হাজার।
এসব এলাকায় দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ২১০ মেগাওয়াট। তবে জাতীয় গ্রিড থেকে প্রয়োজনের তুলনায় গড়ে মাত্র ৪৭ থেকে ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের বড় ব্যবধানের কারণে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে প্রতিদিন ৮৫ থেকে ৯০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
দিনের অন্য সময়ের তুলনায় সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এ সময় বাসাবাড়িতে ফ্যান, লাইটসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ে। দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও বিদ্যুতের ব্যবহার থাকে বেশি। এর পাশাপাশি একই সময়ে জেলার বিভিন্ন গ্যারেজে সারি সারি ইজিবাইক ও অটোরিকশা চার্জ দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, চার্জিংয়ের এই অতিরিক্ত লোড বাদ দিতে পারলে প্রায় ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি কমানো সম্ভব হতো। বেশিরভাগ অটোরিকশা গ্যারেজে চার্জ দেওয়া হলেও অনেক যান বাসাবাড়িতেও চার্জ দেওয়া হয়। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
বিদ্যুতের এমন সংকটে ক্ষুব্ধ স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা। তাদের দাবি, পিক আওয়ারে অটোরিকশা চার্জ দেওয়া বন্ধে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে হবে। তা না হলে জেলার শিল্পোৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবন অচিরেই আরও সংকটে পড়বে।
টাঙ্গাইল পৌরসভার একটি স্কুলের শিক্ষক রুমা আক্তার বলেন, ‘গরমে রাতে ঘুমাতে পারি না। যদি দেখা যায় এক ঘণ্টা কারেন্ট থাকে, তাহলে দুই ঘণ্টা থাকে না। বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে খুবই কষ্টে আছি।’
দেলদুয়ারের পাহাড়পুর গ্রামের ছরোয়ার হোসেন বলেন, ‘হিসাব ছাড়াই দিনরাত বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পিক আওয়ারে গ্রামের গ্যারেজগুলোতে শ’ শ’ অটো চার্জ দেওয়া হয়। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে লোডশেডিং কমানো কঠিন হবে।’
নাগরপুরের নয়াপাড়া গ্রামের অটোরিকশাচালক ছানোয়ার বলেন, ‘সারাদিন যা আয় হয়, তার বড় অংশই চার্জিংয়ে চলে যায়। প্রতিটি গাড়ি চার্জ দিতে গ্যারেজে ১০০ থেকে ১২০ টাকা দিতে হয়। বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই এভাবে চার্জ দিচ্ছি। কারণ এই গাড়ি দিয়ে আমাদের কর্ম করে খেতে হয়।’
তবে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও অটোরিকশা শহর ও গ্রামীণ এলাকার মানুষের গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন মাধ্যম। একই সঙ্গে হাজারো মানুষের জীবিকার উৎসও এসব যানবাহন। ফলে নিয়ন্ত্রণহীন চার্জিং ব্যবস্থা বিদ্যুতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করলেও এর সঙ্গে মানুষের জীবিকার বিষয়টিও জড়িত।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসব যানবাহনকে নিবন্ধনের আওতায় আনা, অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন তৈরি এবং বিদ্যুতের পিক আওয়ারে চার্জিং সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
টাঙ্গাইল পিডিবির বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু বকর তালুকদার বলেন, ‘যেখানে আমরা গ্রাহকদের চাহিদামতো বিদ্যুৎ দিতে পারছি না, সেখানে হাজার হাজার ইজিবাইক ও অটো চার্জ দিতে প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। তবে আমরা তাদের বন্ধও করতে পারছি না। পৌর কর্তৃপক্ষ এবং বিআরটিএ সরব না হলে এগুলো বন্ধ হবে না। কারণ হাজার হাজার ইজিবাইক ও অটোরিকশা তাদের অনুমতি না নিয়েই চলাচল করছে। তবে আমরা অবৈধ লাইন নিয়ে যারা চার্জিংয়ের গ্যারেজ বানিয়ে চার্জ দিচ্ছে, সেখানে অভিযান পরিচালনা করছি।’