চট্টগ্রামে পুলিশের মোস্ট ওয়ান্টেড শীর্ষ সন্ত্রাসী ৮টি হত্যা মামলার আসামি মোহাম্মদ রায়হান এখনো অধরা। অথচ তিনি নিজের ফেসবুক পেইজে পুলিশকে কখনো হুমকি দিয়ে, কখনো সতর্ক করে একের পর এক পোস্ট দিয়ে যাচ্ছেন। তাকে ধরার জন্য চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী একটি বিশেষ টিমও গঠন করেছে। এর মধ্যেই সর্বশেষ গত সোমবার বিকেল পৌনে ৬টায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মাসুদ আলম ও রাউজান থানার ওসি সাইফুল ইসলামকে সতর্ক করে একটি পোস্ট দেন রায়হান।
এতে রায়হান দাবি করেন, তাকে ফাঁসাতে প্রতিপক্ষ রাতে দায়িত্ব পালন করা দুই পুলিশ সদস্যকে হত্যার পরিকল্পনা করছে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপ তাকে বড় কোনো অপরাধে ফাঁসানোর জন্য ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি লেখেন, ‘ইতিমধ্যে আমি বিশেষ মাধ্যমে জানতে পেরেছি আমার প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলো আমাকে ফাঁসানোর জন্য ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। তারা এই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, রাতে ডিউটিতে থাকা পুলিশ সদস্যদের মধ্যে থেকে দুজনকে মারতে হবে। এই ঘটনা ঘটানো হতে পারে হয় নোয়ানবাগিচা, না হয় পূর্ব রাউজান এলাকায়। এটি কোনো বানোয়াট তথ্য নয়।’
রায়হান আরও লেখেন, ‘আজিজ নামের এক ব্যক্তি ও ডাকাত গ্রুপ মিলে এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে। এ ছাড়া তারা আমার নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাঁদা দাবি করছে এবং আমার ছবি দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ প্রোফাইল খুলে সাধারণ মানুষকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে।’ এ বিষয়ে রাউজান থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ফেসবুক পোস্টটি আমাদের নজরে এসেছে। রাউজানে পুলিশের রাতের টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।’
স্থানীয় ও পুলিশের একটি সূত্র জানায়, রাউজানে এক সময়ের আলোচিত সন্ত্রাসী আজিজ ও জানে আলমকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন রায়হান। গত ১২ আগস্ট ভোরে রায়হান ও তার বাহিনীর সঙ্গে জানে আলম বাহিনীর মধ্যে অন্তত ২০০ রাউন্ড গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। রায়হানের নিজ গ্রাম উপজেলার কদলপুর গুচ্ছগ্রামে এই ঘটনা ঘটে। সেদিন ভোরে রায়হানকে ধরতে সন্ত্রাসী জানে আলমের সঙ্গে স্থানীয় লোকজনও যোগ দিয়েছিলেন।
রায়হানকে ধরতে না পারার কারণও ব্যাখ্যা করে র্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘রায়হান রাউজানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আস্তানা গড়ে তুলেছেন। অবস্থান শনাক্তকরণ এড়াতে তিনি বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। ওই এলাকায় যানবাহনে দ্রুত যাতায়াতের সুযোগ নেই এবং মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কও দুর্বল বা অনুপস্থিত হওয়ায় অভিযান পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে।’ র্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়, গত ২৯ জুলাই নোয়াখালীর সেনবাগে একটি বাসার ছাদ থেকে পুলিশি অভিযান টের পেয়ে রায়হান পালিয়ে যান।
সর্বশেষ রায়হানের দেওয়া ফেসবুক পোস্টের বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘রায়হানকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। রাউজানে যেকোনো ঘটনা প্রতিরোধে পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে। কোনো ঘটনা ঘটলে পুলিশ তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করে। এখানে কেউ কারও নাম ব্যবহারের সুযোগ নেই।’
এর আগেও রায়হান ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট দেন। দুই দিন আগে দেওয়া একটি পোস্টে তিনি লেখেন, ‘একমাত্র কাছের মানুষের মাধ্যমে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। ঘুরে দাঁড়াতে কারও কাছে মাথা নত করব না। সময় হলে সব হিসাব-নিকাশ বুঝিয়ে দেব।’ ১২ সেপ্টেম্বর দেওয়া আরেক পোস্টে রায়হান লেখেন, ‘ছিলাম সামাজিক, বানিয়ে দিলেন শীর্ষ সন্ত্রাসী। আড়ালের রায়হান কত খারাপ, তা বুঝিয়ে দেব।’
গত ২০ আগস্টও পুলিশের উদ্দেশে ফেসবুকে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ লিখে পোস্ট দিয়েছিলেন রায়হান। পরে ৩ সেপ্টেম্বর রাউজানে যুবদল কর্মী মোহাম্মদ করিম হত্যার কয়েক ঘণ্টা পর তার ফেসবুক স্টোরিতে পিস্তল দিয়ে ফাঁকা গুলি ছোড়ার একটি ভিডিও দেওয়া হয়। ভিডিওটি কখন ধারণ করা, তা পুলিশ নিশ্চিত করতে পারেনি।
উল্লেখ্য, হত্যা, চাঁদাবাজি এবং অস্ত্র আইনের ১৫টি মামলার আসামি রায়হান। বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে ফোন করে নগর ও জেলার বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি করে আসছেন তিনি। আবার চাঁদা না পেলে গুলিও করছেন তার সহযোগীরা। বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী এই রায়হান। তবে সম্প্রতি তার নাম ব্যবহার করে কিছু ‘ছিঁচকে সন্ত্রাসী’ চাঁদা দাবি করছেন বলে অভিযোগ রায়হানের।