বইচিত্র

নবাবি জমানার তাত্ত্বিক সুলুকসন্ধান

নবাবী বাংলার অভিজাত শ্রেণি : রাজনীতি সমাজ ও সংস্কৃতি
মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান 
প্রকাশক : বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি 
প্রথম প্রকাশ : ডিসেম্বর ২০২০
প্রচ্ছদ : এস এম সাইফুল ইসলাম 
মূল্য : ৫০০ টাকা
পৃষ্ঠা : ৪৪৩

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম

আঠারো শতকের ভারতবর্ষ ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও সামগ্রিক অরাজকতায় বিপর্যস্ত। এই অস্থির সময়েও নবাব-শাসিত বাংলা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। নবাবদের দক্ষ শাসন ও দূরদর্শী নীতির ফলে বাংলার রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, অর্থনীতি এবং আর্থ-সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ও অগ্রগতি সাধিত হয়। এ পরিবর্তন ও উন্নয়নের ধারায় সমকালীন অভিজাত শ্রেণি ছিল অন্যতম প্রধান নিয়ামক শক্তি। ফলে নবাবি বাংলার ইতিহাস ও যুগচরিত্র অনুধাবনে এই শ্রেণির গঠন, বিকাশ এবং রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকা বিশ্লেষণের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান রচিত নবাবী বাংলার অভিজাত শ্রেণি : রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি গ্রন্থটি এ প্রয়োজন পূরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় প্রয়াস। গ্রন্থটিতে নবাব পরিষদ ও অমাত্য-অভিজাতদের পাশাপাশি নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির উত্থান, তাদের তুলনামূলক অসাম্প্রদায়িক চরিত্র এবং বাঙালি জাতিসত্তা নির্মাণে তাদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আঠারো শতকের বাংলার সামাজিক ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ও অনালোচিত একটি দিক উন্মোচিত হয়েছে।

ভূমিকা ও উপসংহারসহ গ্রন্থটি মোট সাতটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত। সহায়ক তথ্য-উপাত্তের পর্যালোচনা ও মূল্যায়নের পাশাপাশি পরিশিষ্টে সংযোজিত হয়েছে বেশ কিছু মূল্যবান তথ্য। বিষয়বস্তু বিশ্লেষণে সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতির প্রয়োগ গ্রন্থটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। লেখকের অনুসন্ধিৎসু মনন, স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি ও গভীর বিশ্লেষণী ক্ষমতা এতে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। লেখকের ভাষ্যমতে এতে পর্যালোচনামূলক বিশ্লেষণ এবং তথ্যনিষ্ঠ অনুসন্ধান প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। লেখক যথেষ্ট পরিশ্রম সহযোগে ইতিহাসের মতো কঠিন বিষয়কে সাবলীল ও সহজবোধ্য ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। প্রাথমিক উৎস হিসেবে তিনি একদিকে ফারসি ও ইংরেজি ভাষায় রচিত সমসাময়িক ইতিহাস গ্রন্থাদি, প্রশাসনিক ও বিভিন্ন ইউরোপীয় কোম্পানির দলিল-দস্তাবেজ ব্যবহার করেছেন, অন্যদিকে সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যকেও এড়িয়ে যাননি। ইতিহাসের অনুসন্ধানের পাশাপাশি তার দৃষ্টি পড়েছে সময়ের প্রপঞ্চদর্শনে। তিনি বুঝতে চেষ্টা করেছেন, কীভাবে মানুষের ভাষায়-কর্মে ফুটে ওঠে সময়, জারিত হতে পারে শাসনকাঠামোর নতুন ধরনধারণ। গবেষকের এ চর্চা আমাদের তৎকালীন নবাবি ক্ষমতাতন্ত্রের ভাবাদর্শ বুঝতে সাহায্য করে।

গ্রন্থটির অধ্যায় বিন্যাস সামগ্রিকভাবে সুপরিকল্পিত, ধারাবাহিক এবং বিষয়বস্তুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গ্রন্থটিতে লেখক আলোচ্য বিষয়ের ঐতিহাসিক পটভূমি থেকে শুরু করে নবাবি বাংলার সমাজ, অভিজাত শ্রেণির উত্থান, রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা এবং পলাশীর পরিণতি পর্যন্ত একটি সুসংহত ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। ফলে পাঠক ধাপে ধাপে নবাবি বাংলার রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতা এবং তার ভেতরে অভিজাত শ্রেণির অবস্থান ও ভূমিকা অনুধাবনের সুযোগ পাবেন। প্রথম অধ্যায় ‘প্রাক-নবাবী যুগের বাংলা : রাজনীতি এবং সমাজ-সংস্কৃতি’ মূল আলোচনার ঐতিহাসিক ভিত্তি নির্মাণ করেছে। তুর্কি বিজয় থেকে নবাবি শাসনের পূর্ব পর্যন্ত রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের যে চিত্র এখানে তুলে ধরা হয়েছে, তা পরবর্তী অধ্যায়গুলোর আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় পটভূমি তৈরি করেছে। দ্বিতীয় অধ্যায় ‘মুঘল সাম্রাজ্যের অবক্ষয় ও বাংলায় নবাব সরকার প্রতিষ্ঠা’ প্রথম অধ্যায়ের স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে নবাবি শাসন প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেছে। মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ও বাংলায় নবাব সরকারের উত্থানের কার্যকারণ অনুসন্ধান এ অধ্যায়ের অন্বিষ্ট বিষয়।

তৃতীয় অধ্যায় ‘নবাব সরকার যুগে বাংলার সমাজ কাঠামো ও সামাজিক শ্রেণিসমূহ’তে সমকালীন সমাজের শ্রেণিবিন্যাস ও পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণের মাধ্যমে অভিজাত শ্রেণি আলোচনার ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হয়েছে। চতুর্থ অধ্যায় ‘নবাবী যুগে বাংলার অভিজাত শ্রেণি : অভ্যুদয় ও বিকাশ’ গ্রন্থের কেন্দ্রীয় বিষয়কে সরাসরি সামনে নিয়ে এসেছে। 

পঞ্চম অধ্যায় ‘নবাবী বাংলার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিকাশধারা এবং অভিজাত শ্রেণি’-তে অভিজাতদের রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা মূল্যায়িত হয়েছে। ষষ্ঠ অধ্যায় ‘নবাবী বাংলার অর্থনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি ও অভিজাত শ্রেণি’ রাজনৈতিক আলোচনার পর অভিজাত শ্রেণির আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবকে বৃহত্তর পরিসরে বিচার করেছে। সপ্তম অধ্যায় ‘পলাশী বিপ্লব ও অভিজাত শ্রেণি’ পুরো আলোচনাকে একটি ঐতিহাসিক পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে। পলাশীর ঘটনায় অভিজাতদের ভূমিকা এবং পরবর্তী অবক্ষয় বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে গ্রন্থের মূল প্রতিপাদ্য যথেষ্ট সার্থকভাবে পরিসমাপ্তির দিকে এগিয়েছে।

নবাবি শাসনামল বাংলার ইতিহাসচর্চার বিশ্লেষণ-উপযোগী ও চর্চিত অধ্যায়। বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলেও, এ পর্বে আবিষ্কার করার আরও কিছু নির্ণায়ক বাকিই রয়ে গেছে। সময় পরিসরটিকে নানা রকম ঐতিহাসিক অনুসন্ধানে বিচার করা যেতে পারে। ইতিহাসের বিশেষ বিশেষ সময়ে নির্দিষ্ট একটা শ্রেণির প্রবল প্রতাপ পরিলক্ষিত হয়। ১৯৭১ সালের প্রকাশিত ‘সাউথ এশিয়া’ জার্নালের প্রথম সংখ্যায় জন ব্রুমফিল্ড তার প্রবন্ধে এরিক এরিকসনকে উদ্ধৃত করে লিখেছিলেন : ‘ইতিহাসবিদরা যখন বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার কার্যসূত্র থেকে ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নানান ব্যক্তিগত জীবনের ইতিহাসকে আলাদা করতে চান তখন তারা আসলে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে এড়িয়ে যান।’ ইতিহাসবেত্তা মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান তার নবাবী বাংলার অভিজাত শ্রেণি : রাজনীতি সমাজ ও সংস্কৃতি গ্রন্থে সে দায় এড়াননি। তার সময়পরিকল্পনা ও বিষয়বস্তু আশাবাদী এক উত্তরণের অনুসন্ধানী। আঠারো শতকের নবাবি বাংলার রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি, সামাজিক বিন্যাস ও সাংস্কৃতিক পরিসর নির্মাণে অভিজাত শ্রেণির যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও প্রভাব ছিল, গ্রন্থটিতে তারই বিস্তৃত পর্যালোচনা উপস্থাপিত হয়েছে। এই মূল্যবান গবেষণাগ্রন্থের জন্য লেখক কৃতিত্বের দাবিদার ও ধন্যবাদার্হ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত