নানা চেষ্টা করেও রাহুর দশা থেকে মুক্ত করা যাচ্ছে না রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে। পাওনা টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলেও দিন দিন খরচের খাতা বাড়াচ্ছে সংস্থাটি। এদিকে খোদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অমান্য করেই ১৩ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ায় বেশ চটেছেন ঊর্ধ্বতনরা। এই নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যেও। আর এসবের পেছনে তদবির ও অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। অন্যদিকে প্রতিদিনই কোনো না কোনো ঘটনা ঘটছেই বিমানে। ফ্লাইট ছাড়তে বিলম্ব এবং বিমানবন্দরে লাগেজ পাওয়া নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগের অন্ত নেই।
বিমানের কাছে দুটি সংস্থার প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এসব অর্থ পরিশোধে বারবার তাগাদা দিয়েও সাড়া মিলছে না। বিমানের কাছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) পাওনা ৫ হাজার ৮৪২ কোটি ৯১ লাখ ২৩ হাজার ৯৭৪ টাকা এবং পদ্মা অয়েলের পাওনা ২ হাজার ১০৮ কোটি ১৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। পাওনা পরিশোধ করতে বেবিচক সম্প্রতি বিমান চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দিলেও সাড়া মিলছে না বলে অভিযোগ এসেছে।
অ্যাভিয়েশন-সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, আগের মতোই সিন্ডিকেটের পকেটেই আছে বিমান-প্রশাসন। তাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই। যে যার মতো পারছে সংস্থাটি চালানো হচ্ছে। এমন এমন কর্মকর্তা আছেন যারা বিমান সম্পর্কে কিছুই বোঝেন না। বিভিন্ন সময়ে লিজে আনা উড়োহাজাহজগুলোও আছে নানা সমস্যায়। মেরামতের পরও উড়োজাহাজ থাকছে নষ্ট। করোনার সময় বিমানের নিজস্ব বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর, বোয়িং ৭৩৭ এবং ভাড়ায় আনা উড়োজাহাজকে কার্গোতে রূপান্তরের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়। এ ঘটনায় তদন্তে অভিযুক্তরা এখনো আছে ভালো অবস্থায়।
এই প্রসঙ্গে বিমানের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিমান রাহুর দশা থেকে মুক্ত হচ্ছে না। বিমান হ্যাঙ্গারে নানা সময়ে ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। বড় দুর্ঘটনা ঘটলে ধামাচাপা দেওয়া হয় প্রায়ই। সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে পুরো প্রশাসন। তাদের ইশারায়ই হচ্ছে সবকিছু। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যোগ্যতার পরিবর্তে পছন্দের কর্মকর্তাদের সুবিধা দিচ্ছে। এসব অভিযোগ মন্ত্রণালয়ে জমা পড়লেও কোনো কাজ হচ্ছে না।
সার্বিক বিষয়ে জানতে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাইজার সোহেল আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও সাড়া মেলেনি। এমনকি জনসংযোগ বিভাগও সাড়া দেয়নি।
নির্দেশ অমান্য করে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি : বিমান সূত্র জানায়, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, বিধিমালা অমান্য এবং প্রভাবশালীদের তদবিরের জোরে ১৩ কর্মকর্তাতে পদোন্নতির পরিস্থিতি ঘিরে এক নজিরবিহীন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এটাকে অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা ‘তুঘলকিকাণ্ড’ বলে আখ্যায়িত করছেন। এদিকে পদোন্নতিপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত তাদের পদোন্নতিসংক্রান্ত সব কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছিল বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। কিন্তু সেই নির্দেশনার পরেও গত ১০ সেপ্টেম্বর বিমানের পার্সোনেল শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে ১৩ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়েছে মন্ত্রণালয়। পদোন্নতিপ্রাপ্তরা হলেন জুনিয়র টেকনিশিয়ান শাহ মাহমুদুল হাসান এবং ১২ জন এয়ারক্রাফট মেকানিক মো. আবু ইমরান, মো. শাহীন রেজা, মো. মহসিন আলম, আহনাফ আল নাহিয়ান, কেএম এহতাশিম বিল্লাহ, মোহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ, হাসানুজ্জামান, মোহাম্মদ কামরুল হাসান, মিনহাজুল ইসলাম, এস সাদমান আহমেদ, আব্দুস সালাম ও এয়ারক্রাফট মেকানিক মো. আদনান নাবিল।
মন্ত্রণালয়ের আপত্তি জানিয়ে চিঠি : গত ৩ আগস্ট বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বিমান-১ শাখা থেকে জারি করা চিঠিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে উল্লিখিতদের পদোন্নতিসংক্রান্ত কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। চিঠিতে বলা হয়, প্রকৌশল শাখার পদোন্নতিতে গুরুতর দুর্নীতি ও আওয়ামী সিন্ডিকেটের চক্রান্তের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট পদোন্নতি স্থগিত রাখার জন্য বিমান কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
তদবির ও স্বজনপ্রীতির প্রক্রিয়া : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব মেধা ও সততার চেয়ে ‘তদবির সংস্কৃতির’ প্রাধান্য পাচ্ছে বলে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ। বিভিন্ন বিভাগে যোগ্য, অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সরিয়ে রেখে প্রভাবশালীদের আজ্ঞাবহ ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। বিশেষ কিছু পদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও কেবল ওপরের তদবির ও ব্যক্তিস্বার্থে নীতিমালা শিথিল বা অমান্য করা হচ্ছে। বিমানের একাধিক কর্মকর্তা জানান, জ্যেষ্ঠতার তালিকায় এগিয়ে থাকা অনেক কর্মকর্তা বছরের পর বছর পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে একই পদে অলস বসে আছেন অথচ জুনিয়র বা তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা তদবিরের জোরে ডিঙিয়ে গেছেন তাদের। পদোন্নতির এই সংস্কৃতি কেবল যোগ্যদের অবমূল্যায়নই করছে না, বরং বিমানের সামগ্রিক কর্মপরিবেশে অসন্তোষ সৃষ্টি করছে।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্য : বিমান একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বা করপোরেশন হিসেবে পরিচালিত হলেও এর মূল তদারকির দায়িত্বে রয়েছে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিতে বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রণালয় থেকে নীতিমালা ও নির্দেশনা জারি করা হয়। পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় অনিয়মের তথ্য এলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে লিখিত ও মৌখিকভাবে বেশ কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। মাঝেমধ্যে পদোন্নতি বা লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষায় মেধার চেয়ে বিশেষ সম্পর্কের ভিত্তিতে নম্বর দেওয়া বা ছাড় দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এদিকে প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে নিয়মিত ফ্লাইট বিলম্ব ও বাতিলের ঘটনা ঘটছে। বিমানবন্দরে লাগেজ পেতে দীর্ঘ বিলম্ব ও ক্ষতির অভিযোগ দিন দিন বাড়ছে। কল সেন্টার, টিকিট বুকিং, ইন-ফ্লাইট সার্ভিসে দক্ষ জনবলের অভাবে যাত্রীদের অভিযোগ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই প্রসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ’রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কোনো অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্য করে যে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে সেই বিষয়ে তদন্ত করা হবে। প্রশাসনিক নির্দেশ অমান্যকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জনগণের করের টাকায় পরিচালিত বিমানের কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইচ্ছামতো চালানোর সুযোগ নেই।
সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা পাওনা : সরকারের দুটি সংস্থা বিমানের কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ পাওনা থাকলেও সংস্থাটি বলে আসছে তারা রেকর্ড মুনাফা করছে। পাঁচ বছর ধরে লাভজনক অবস্থানে আছে সংস্থাটি। এমনকি বিমানের বহরে আরও ২১টি উড়োজাহাজ যুক্ত করার তোড়জোড়ও চলছে। বিমানের কাছে বেবিচকের বকেয়া পাওনা ৫ হাজার ৮৪২ কোটি ৯১ লাখ ২৩ হাজার ৯৭৪ টাকা এবং ২০১১ থেকে ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিমানের কাছে পদ্মা অয়েলের বকেয়া ২ হাজার ১০৮ কোটি ১৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। তবে গত বছরের ২১ জানুয়ারি আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভার পর থেকে মাসে ২৫ কোটি টাকা পরিশোধ করছে বিমান। বিমানের বিভিন্ন অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জের বকেয়া এবং সারচার্জ মিলিয়ে ৫ হাজার ৮৪২ কোটি ৯১ লাখ ২৩ হাজার ৮৭৪ টাকা পায় বেবিচক। এই বিষয়ে বিমান কর্তৃপক্ষকে একাধিক চিঠি দেওয়া হলেও পাওনা টাকা পরিশোধ করছে না বলে বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন। তিনি বলেন, বিমান কর্তৃপক্ষের দাবি রেকর্ড মুনাফা করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যাত্রী পরিবহন করে ৭৮৫ কোটি টাকা লাভ করার কথা বললেও কেন দেনা পরিশোধ করছে না তা আমাদের মাথায় আসছে না। অথচ বিমানের বহরে আধুনিক মানের বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর চারটিসহ মোট এয়ারক্রাফট আছে ১৯টি। এসব উড়োজাহাজ অভ্যন্তরীণ রুটসহ বিশে^র নামিদামি বিমানবন্দরগুলোতে উড্ডয়ন-অবতরণ করছে। বহর ভারী করতে বোয়িংসহ ২১টি উড়োজাহাজও ক্রয় করছে।