নেতানিয়াহুবিরোধী বিক্ষোভে অস্কারজয়ী সারান্ডনসহ শতাধিক গ্রেপ্তার

‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকার মূল্য কোনো ক্যারিয়ার ধ্বংসের চেয়েও অনেক বেশি। আমার ছোট ক্যারিয়ারটি কোনো মানুষের একটিমাত্র মূল্যবান জীবনের চেয়ে কখনোই বড় হতে পারে না।’

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪০ পিএম

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভাষণের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে আয়োজিত এক বিক্ষোভ প্রদর্শন থেকে অস্কারজয়ী অভিনেত্রী সুসান সারান্ডন এবং জনপ্রিয় সিরিজ ‘হ্যাকস’-এর তারকা হ্যানা আইনবাইন্ডারকে পুলিশ আটক করেছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ (এনওয়াইপিডি) বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে অভিযান শুরু করলে তারা গ্রেপ্তার হন।

ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ‘থেলমা অ্যান্ড লুইস’ খ্যাত প্রখ্যাত তারকা সুসান সারান্ডনকে হাতকড়া পরাচ্ছেন এনওয়াইপিডির কর্মকর্তারা। নেতানিয়াহু জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে নিউইয়র্কের রাস্তায় এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

নিউইয়র্কে বিক্ষোভ থেকে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার শতাধিক জনকে আটক করে পুলিশ। ছবি: টিভি থেকে নেওয়া

নিউইয়র্ক পোস্টের খবরে বলা হয়, ‘জুয়িশ ভয়েস ফর পিস’ (শান্তির জন্য ইহুদিদের কণ্ঠ) নামক সংগঠনটির ব্যানারে আয়োজিত এই সমাবেশ থেকে অভিনেত্রী হ্যানা আইনবাইন্ডারকেও পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীদের হাতে ‘ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া বন্ধ কর’ এবং ‘গণহত্যা বন্ধ কর’ লেখা বিভিন্ন ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড দেখা যায়।

এনওয়াইপিডির একজন মুখপাত্র জানান, পূর্বনির্ধারিত সূচি ছাড়া রাস্তা অবরোধ করে একটি অবৈধ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হচ্ছে—এমন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের স্পেশাল কমিউনিটি অ্যাফেয়ার্স ব্যুরোর সদস্যরা মাইকে বারবার সতর্কবার্তা দিয়ে স্থান ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা মূল রাস্তার মোড় অবরুদ্ধ করে রাখেন। নির্দেশ অমান্য করা ব্যক্তিদের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।’

তবে ঠিক কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করেনি পুলিশ। তবে আল-জাজিরার খবরে গ্রেপ্তারের সংখ্যা শতাধিক বলে উল্লেখ করা হয়। যদিও পরে সবাইকে ছেড়ে দেওয়ার দাবি করেছে তারা।

গ্রেপ্তারদের তালিকায় কেবল অভিনয়শিল্পীই নন, বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও রয়েছেন। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কংগ্রেস প্রার্থী দারিয়ালিজা অ্যাভিলা শেভালিয়ার এবং নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের সদস্য চি ওসে-কেও পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।

এদিকে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভেতরে যখন নেতানিয়াহু তার ভাষণ শুরু করেন, তখন বিশ্বনেতাদের চরম অসন্তোষের চিত্র ফুটে ওঠে। নেতানিয়াহু মঞ্চে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বহু কূটনীতিক ও প্রতিনিধি কক্ষ ত্যাগ (ওয়াকআউট) করেন।

নিজের দীর্ঘ ভাষণে নেতানিয়াহু সাম্প্রতিক সময়ে তার দেশের সমালোচনাকারী শত্রু ও মিত্র—উভয় পক্ষকেই তীব্র আক্রমণ করেন। বিশেষ করে ব্রিটেন ও ফ্রান্স সম্প্রতি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় তিনি দেশ দুটির কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘তারা খুদে রাষ্ট্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিকতার অভিযোগ তোলে! আর এই অভিযোগ কারা তুলছে? ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের মানুষ, যারা একসময় বিশ্বে ঔপনিবেশিকতার জন্ম দিয়েছিল।’

সুসান সারান্ডন, যার বিখ্যাত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘দ্য রকি হরর পিকচার শো’, ‘ডেড ম্যান ওয়াকিং’ এবং ‘দ্য উইচেস অব ইস্টউইক’—তিনি গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই সোচ্চার। এর আগেও একাধিক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন এই জ্যেষ্ঠ মার্কিন অভিনেত্রী।

সম্প্রতি ইতালি অনুষ্ঠিত ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ৭৭ বছর বয়সী এই অভিনেত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ফিলিস্তিনের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার কারণে হলিউডে কাজের সুযোগ হারাচ্ছেন তিনি।

 

সারান্ডন বলেন, ‘আমি এখনও সাম্প্রতিক অনেক চলচ্চিত্র প্রকল্প থেকে বাদ পড়ছি, কারণ কিছু বড় সংস্থা নির্দেশ দিচ্ছে যেন আমাকে অভিনয় না করানো হয়। বিনোদন জগতের শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলো এভাবেই নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘বিশ্বের সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে বলে আমি মনে করি। কিন্তু আমার শিল্পের সাথে যুক্ত বহু সায়নিস্ট এখনও আমার প্রতি তাঁদের তীব্র মনোভাব এতটুকুও নরম করেননি। তবে আমি আমার পরিবার ও আপন মানুষদের খুঁজে পেয়েছি, তাই আমি ঠিক আছি।’

অন্যদিকে, অভিনেত্রী হ্যানা আইনবাইন্ডারও ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে নিজের অভিনয় জীবন ঝুঁকিতে ফেলার বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। সুসান সারান্ডন এবং মেলিসা ব্যারেরার ওপর মূলধারার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে আইনবাইন্ডার এর আগে বলেছিলেন, ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকার মূল্য কোনো ক্যারিয়ার ধ্বংসের চেয়েও অনেক বেশি। আমার ছোট ক্যারিয়ারটি কোনো মানুষের একটিমাত্র মূল্যবান জীবনের চেয়ে কখনোই বড় হতে পারে না। এটি আমার নৈতিক দায়িত্ব, আর আমি তা সবসময় পালন করে যাব।’

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত