হযরত শাহ মোস্তফার (রহ.) পুণ্যভূমি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর, সবুজ-শ্যামল জেলা মৌলভীবাজার জেলা। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি সব মিলিয়ে এটি একটি সমৃদ্ধ জনপদ। চারদিকে অবারিত সবুজ চা বাগান এর সৌন্দর্যকে বাড়িয়েছে বহুগুণ। এখানে আছে অনেক আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট, যা সবসময় দেশি-বিদেশি পর্যটকে মুখরিত থাকে। পর্যটনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শতাধিক রিসোর্ট-কটেজ-মোটেলসহ নানা স্থাপনা। দেখা যাক, কী আছে মৌলভীবাজারে?
মাধককু- জলপ্রপাত : মাধবকু-ের অবস্থান বড়লেখা উপজেলায়। সুউচ্চ পাহাড় থেকে শুভ্র জলরাশি অবিরাম গড়িয়ে পড়ছে। এই জলপ্রপাতের স্বচ্ছ জলরাশি দেখতে সারা বছরই পর্যটকের ভিড় থাকে।
ইতিহাসবিদদের মতে প্রায় হাজার বছর আগে হিন্দু সন্ন্যাসী মাধবেশ্বর এখানে আস্তানা স্থাপন করেন। পাহাড়বেষ্টিত নির্জন স্থানে তিনি ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। তার এই আস্তানা ঘেঁষে রয়েছে ঝরনাধারা। পাথুরে পাহাড়ের প্রায় ২৫০ ফুট উঁচু থেকে কলকল শব্দে ঝরনাধারা প্রবাহিত হচ্ছে। কথিত আছে সন্ন্যাসী তার প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতেন ঝরনার শীতল জল দিয়ে। সেই থেকে প্রাকৃতিক জলধারাটি মাধবকু- হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পাশেই রয়েছে আরেকটি মনোমুগ্ধকর জলপ্রপাত। এটির নাম পরীকু-। এটির সৌন্দর্যও অসাধারণ।
হামহাম ও সীতাপ জলপ্রপাত : কমলগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে কুরমা বন বিটের গভীর অরণ্যে অবস্থিত হামহাম জলপ্রপাত। এ জলপ্রপাতটির পাশেই অবস্থিত সীতাপ জলপ্রপাত। গহিন দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত এ দুটি জলপ্রপাত দেশের অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষের হৃদয়পটে স্থান করে নিয়েছে। জলপ্রপাত দুটির ওপর থেকে প্রচ- শব্দে গড়িয়ে পড়া ধারা দেখে মনে হবে পাহাড়ের কান্না চলছে।
কমলা রানীর দিঘি : ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে এই রাজা ভানু নারায়ণ দেহত্যাগ করলে তার জ্যেষ্ঠপুত্র সুবিদ নারায়ণ উত্তরাধিকার সূত্রে রাজ্যের শাসনভার নেন। স্ত্রী কমলা রানীর সহায়তায় তিনি বিচক্ষণভাবে রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। মানুষ সুখে-শান্তিতে বসবাস করলেও একসময় খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। কথিত আছে, তখন এক রাতে রাজা সুবিদ নারায়ণ স্বপ্নে দেখেন কে যেন তাকে আদেশ দিচ্ছেন বাংলা ১২ জ্যৈষ্ঠ তারিখে ১২ কেদার ও ১২ হাল জমি নিয়ে একটি দিঘি খনন করতে হবে। প্রজাদের পানের জলের কথা ভেবে রাজা স্বপ্নের নির্ধারিত তারিখেই দিঘি খনন শুরু করেন। ২৬০ জন শ্রমিক প্রায় তিন মাসে দিঘি খনন শেষ করেন। কিন্তু দিঘিতে এক ফোঁটা জলও নেই! দিঘি খনন শেষ হওয়ার পর পরই রাজা সুবিদ নারায়ণ আবারও স্বপ্নে দেখলেন যতক্ষণ রানী কমলাকে জলদেবীর উদ্দেশ্যে প্রেরণ না করবেন, ততক্ষণ দিঘিতে জল উঠবে না। রাজা সুবিদ নারায়ণ রানীকে স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলেন। রানী প্রজাদের কথা চিন্তা করে স্বেচ্ছায় জলদেবীর উদ্দেশ্যে নিজেকে সমর্পণ করতে রাজি হলেন। নির্ধারিত দিনে কমলা রানী বত্রিশ অলংকারে সেজে মাত্র তিন মাসের শিশুসন্তানকে রাজদরবারে রেখে দিঘিতে নেমে গেলেন। রানী দিঘির তলদেশে গিয়ে জলদেবীর স্তুতি বন্দনা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে পুরো দিঘি জলে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল। কিন্তু দিঘি থেকে কমলা রানী আর ফিরে এলেন না। সুবিশাল এ দিঘিটি রানীর মহিমায় আজও এলাকার মানুষের জলের সংস্থান করে আসছে। দিঘিটি দেখতে প্রায় প্রতিদিন শত শত মানুষের ভিড় জমে জেলার রাজনগরে।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান : অনন্য সুন্দর চিরহরিৎ বন লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের অবস্থান কমলগঞ্জ উপজেলায়। উদ্যানের গভীরে কয়েক প্রজাতির দুর্লভ বৃক্ষ, লাখ লাখ বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ ও বন্যপ্রাণী পর্যটকদের মুগ্ধ করবেই। অরণ্যবেষ্টিত নৈসর্গিক শোভার এই সাম্রাজ্যে আছে ১৫৫ প্রজাতির পাখি ও প্রায় ২০ প্রজাতির বুনো অর্কিড। লাউয়াছড়া ভ্রমণে দেখা যেতে পারে খাসিয়াদের পানপুঞ্জি ও ত্রিপুরাপল্লী। লাউয়াছড়া পার্কে প্রবেশ করা মাত্রই পোকামাকড়ের বিচিত্র শব্দে মন ভরে যায়। অনেকে এ শব্দের নাম দিয়েছেন ‘ফরেস্ট মিউজিক’। মাঝে মধ্যে বৃক্ষসারির মগডালে দেখা মেলে বানর ও হনুমানের লাফালাফি। বনের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা পাওয়া যাবে বনমোরগ, উল্লুক, মেছোবাঘ, বনবিড়াল, সাপসহ বিভিন্ন জীবজন্তু।
লাউয়াছড়া বনের পশ্চিম প্রান্তে ‘লাউয়াছড়া পানপুঞ্জি’ এবং পূর্ব প্রান্তে ‘মাগুরছড়া পানপুঞ্জি’ অবস্থিত। এ দুটি পুঞ্জি ঘুরে খাসিয়াদের জীবনযাপন, কৃষ্টি-সংস্কৃতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা নেওয়া যাবে। দক্ষিণ প্রান্তের ত্রিপুরাপল্লীতে ভ্রমণ করা যাবে। লাউয়াছড়ার একপাশে রয়েছে সুমিষ্ট আনারস ও লেবুর বাগান, অন্যপাশে চা বাগান। বনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বেশ কয়েকটি পাহাড়ি ছড়া। বর্ষা মৌসুমে এসব পাহাড়ি ছড়া পানিতে টইটম্বুর থাকে।
মাধবপুর লেক : কমলগঞ্জে মাধবপুর চা বাগান ও পাহাড়ি টিলার মধ্যে আছে সুবিশাল মাধবপুর লেক। এই লেক ভ্রমণে গেলে প্রথমেই মিলবে সবুজ কাঁচা চা পাতার গন্ধ, যা অত্যন্ত মোহনীয়। চারদিকে সবুজ পাহাড়, উঁচু-উঁচু টিলা, চা বাগানে গাছের সারি, এরই মধ্যে মাধবপুর লেকের নীল পদ্ম পর্যটকদের বিমোহিত করবেই করবে। মাধবপুর লেক যেন প্রকৃতির অকৃপণ সৌন্দর্যের এক ভা-ার। প্রতিদিনই দেশ-বিদেশের হাজার হাজার মানুষ আসছেন মাধবপুর লেকের সৌন্দর্য অবলোকন করতে।
বাইক্কা বিল : শ্রীমঙ্গল উপজেলার হাইল হাওরে অবস্থিত বাইক্কা বিল। এটি পরিযায়ী পাখি এবং মাছের অভয়াশ্রম। এক সময় শুধু শীতকালে এখানে পরিযায়ী পাখির আনাগোনা ছিল। বিগত কয়েক বছর বাইক্কা বিল পাখির স্থায়ী অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে। বছরের প্রায় বার মাসই এখানে পাখির দেখা মেলে। পাখি দেখার জন্য বাইক্কা বিলে নির্মাণ করা হয়েছে বহুতল বিশিষ্ট পর্যটন টাওয়ার। টাওয়ারে উঠে সামান্য ফি দিয়ে বাইনোকুলারে দেখা যায় পাখি।
এছাড়াও মৌলভীবাজার জেলায় রয়েছে বিভিন্ন স্থানে ৯২টি চা বাগান, চা বাগানগুলোয় জলাধার বা লেক, কুলাউড়া উপজেলায় হাকালুকি হাওর, পৃথিমপাশা নবাববাড়ি, কালাপাহাড়; কমলগঞ্জে পদ্মছড়া লেক, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ, আদমপুর সংরক্ষিত বনাঞ্চল, কালাছড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল, মণিপুরী পল্লী, শমসেরনগর পরিত্যক্ত বিমানবন্দর, ক্যামেলিয়া লেক, মণিপুরি ললিতকলা একাডেমি, শমসেরনগর গলফ মাঠ; শ্রীমঙ্গল উপজেলায় লাসুবন গিরি খাত, হাজং টিলা, মুর্দাকুল মিনি ঝরনা, অফিং হিল, ডিনস্টন সিমেট্রি, নির্মাই শিববাড়ি, নিরালা পানপুঞ্জি, রাজা সুবিদ নারায়ণের রাজবাড়ি, বিপ্লবী লীলা নাগের পৈতৃক বাড়ি, পাঁচগাঁও লাল দুর্গা মন্দির, বড়লেখা উপজেলায় আগর-আতর শিল্প, মুরইছড়া বনাঞ্চল, পাথারিয়া বনাঞ্চল; জুড়ী উপজেলায় কমলা বাগান, লাটিঠিলা বনাঞ্চল, মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় বর্ষিজোড়া ইকোপার্কসহ শতাধিক মনোমুগ্ধকর স্পট। তাই আর দেরি কেন? এবারের শীত মৌসুমেই ঘুরে আসুন মৌলভীবাজার জেলায়।
জেলার পর্যটন স্পট নিয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাধানগরে অবস্থিত শান্তিবাড়ি ইকো রিসোর্টের স্বত্ব¡াধিকারী তানভীরুল আরেফিন লিংকন বলেন, ‘দেশি-বিদেীি পর্যটকদের কথা চিন্তা করে এখানে গড়ে তোলা হয়েছে অসংখ্য হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট-কটেজ। পর্যটন খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে শত শত কোটি টাকা।’ তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো প্রতি বছর নভেম্বর মাস থেকে পরবর্তী বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত এই তিন মাস এবং দুই ঈদ ও পূজা ছাড়া অন্যান্য সময়ে বিনিয়োগের তুলনায় ব্যবসা ততটা জমজমাট নয়। সরকার এ জেলার পর্যটন খাতকে গুরুত্ব দিয়ে রাস্তাঘাটের সংস্কারসহ সরকারি উদ্যোগে এ খাতের উন্নয়ন ও প্রচার-প্রচারণা চালালে জেলাটি হতে পারে পর্যটনের স্বর্গরাজ্য।