গ্রিন ফাইন্যান্স হবে মূলধারার ব্যাংকিং

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০১:২২ এএম

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সবুজ ও টেকসই অর্থনীতিতে রূপান্তরে ব্যাংকিং খাতকে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছেন পূবালী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী। তিনি মনে করেন, পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়ন বাড়ানোর পাশাপাশি দূষণকারী ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পে অর্থায়ন কমাতে হবে। সবুজ অর্থনীতি নিয়ে দেশ রূপান্তরের বিশেষ আয়োজনে কথা বলেছেন পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

মোহাম্মদ আলী : বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য। যেকোনো বড় রূপান্তরের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়। ব্যাংক খাত সেই অর্থায়নের অন্যতম প্রধান উৎস। পরিবেশের ক্ষতি না করে শিল্পায়ন ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো ‘গ্রিন ফাইন্যান্স’ বা সবুজ অর্থায়নের বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিবেশ দূষণকারী প্রকল্পে অর্থায়ন কমিয়ে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে ঋণ বাড়াতে পারলে দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। তাই ব্যাংক খাত শুধু অর্থদাতা নয়, সবুজ অর্থনীতি বিনির্মাণের অন্যতম চালিকাশক্তি।

দেশ রূপান্তর : আপনার ব্যাংকের মোট ঋণ বিতরণের কত শতাংশ বর্তমানে গ্রিন ও সাসটেইনেবল ফাইন্যান্সে যাচ্ছে? 

মোহাম্মদ আলী : বর্তমানে আমাদের ব্যাংকের মোট ঋণ স্থিতির প্রায় ৩১ শতাংশ সাসটেইনেবল ফাইন্যান্সে এবং এর মধ্যে সরাসরি গ্রিন ফাইন্যান্সের অংশ প্রায় ৮ শতাংশ। এ বছর সাসটেইনেবল ফাইন্যান্সে ঋণ বিতরণের লক্ষ্য প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা এবং গ্রিন ফাইন্যান্সে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমরা কাজ করছি।

আগামী তিন বছরের মধ্যে গ্রিন ফাইন্যান্সের পোর্টফোলিও ১০ শতাংশে উন্নীত করতে চাই। এ জন্য ইটিপি স্থাপন, জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি, পরিবেশবান্ধব আবাসন ও সৌরভিত্তিক প্রকল্পে ঋণের পরিধি বাড়ানো হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য, প্রতি বছর মোট ঋণ পোর্টফোলিওর একটি নির্দিষ্ট অংশ সবুজ প্রকল্পে বিনিয়োগ করা।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ফাইন্যান্স নীতিমালা বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলো কতটা সফল? 

মোহাম্মদ আলী : বাংলাদেশ ব্যাংক অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বিশ^মানের গ্রিন ফাইন্যান্স নীতিমালা তৈরি করেছে। ব্যাংকগুলোও এটি বাস্তবায়নে আন্তরিক এবং অনেকাংশে সফল। তবে নীতিমালা ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে কিছু ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

মাঠপর্যায়ে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের সঠিক মূল্যায়ন বা গ্রিন অডিট করার মতো দক্ষ জনবলের কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। অনেক সময় গ্রাহকদের জন্য গ্রিন ফাইন্যান্সের কঠোর শর্ত পূরণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কাক্সিক্ষত গতিতে ঋণ বিতরণ করা সম্ভব হয় না। প্রক্রিয়াগুলো আরও সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা গেলে সফলতা আরও বাড়বে।

দেশ রূপান্তর : গ্রিন প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা কোথায়?

মোহাম্মদ আলী : চারটি বিষয়ই কমবেশি বাধা হিসেবে কাজ করে। তবে আমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় বাধা হলো উচ্চ বিনিয়োগ ব্যয় এবং যোগ্য ও লাভজনক প্রকল্পের অভাব। সৌরবিদ্যুৎ বা আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি স্থাপনে প্রাথমিক বিনিয়োগ সাধারণ প্রযুক্তির তুলনায় বেশি। উদ্যোক্তারা অনেক সময় অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে চান না, কারণ বিনিয়োগের সুফল পেতে সময় লাগে।

দেশ রূপান্তর : নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে পূবালী ব্যাংক কী ধরনের বিশেষ ঋণ সুবিধা দিচ্ছে?

মোহাম্মদ আলী : পূবালী ব্যাংক নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে ‘গ্রিন ফাইন্যান্স টার্ম লোন পূবালী ধরিত্রী’ চালু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার আওতায় গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। কৃষি খাতের ‘সোলার ইরিগেশন পাম্প’-এর ক্ষেত্রে সুদের হার সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পুনঃঅর্থায়ন পাওয়া না গেলেও সাধারণ হারের তুলনায় পুরুষ উদ্যোক্তাদের জন্য ১ শতাংশ এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ১ দশমিক ৫০ শতাংশ কম সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। গ্রাহকরা সর্বোচ্চ ১২ মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছর মেয়াদে ঋণ পরিশোধের সুযোগ পাচ্ছেন। মাত্র ৩০ শতাংশ নিজস্ব মূলধন থাকলেই এই সুবিধা নেওয়া যায়।

দেশ রূপান্তর : তৈরি পোশাক, চামড়া, টেক্সটাইলসহ রপ্তানিমুখী শিল্পকে সবুজ উৎপাদন ব্যবস্থায় নিতে ব্যাংকগুলোর ভূমিকা কী?

মোহাম্মদ আলী : বিশ^বাজারে টিকে থাকতে রপ্তানিমুখী শিল্পকে গ্রিন করার কোনো বিকল্প নেই। বৈশি^ক ক্রেতারা এখন পরিবেশবান্ধব পণ্যের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো অর্থায়নের পাশাপাশি পরামর্শকের ভূমিকাও পালন করতে পারে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে বিশে^র সবচেয়ে বেশি গ্রিন ফ্যাক্টরি বা এলইইডি সার্টিফায়েড কারখানা রয়েছে। এর পেছনে ব্যাংকগুলোরও অবদান আছে। 

দেশ রূপান্তর : এসএমই উদ্যোক্তাদের গ্রিন ট্রানজিশনে সহায়তা করতে কী ধরনের অর্থায়ন প্রয়োজন?

মোহাম্মদ আলী : এসএমই খাত অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু তাদের পুঁজি ও সক্ষমতা সীমিত। তাই গ্রিন ট্রানজিশনের জন্য কম সুদে এবং জামানতবিহীন অর্থায়ন প্রয়োজন।

আমরা এসএমইদের ক্ষেত্রে জামানতের শর্ত শিথিল করে ব্যবসার নগদ প্রবাহ বা ক্যাশ-ফ্লো বিবেচনায় ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। ছোট আকারের সৌর প্যানেল বা পরিবেশবান্ধব ইটভাটার মতো প্রকল্পেও বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় ঋণ দেওয়া হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে এই অর্থায়ন আরও কার্যকর হবে।

দেশ রূপান্তর : গ্রিন ফাইন্যান্স বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের নীতি সহায়তা প্রয়োজন?

মোহাম্মদ আলী : বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে অনেক ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। তবে গ্রিন ফাইন্যান্সের পরিধি বাড়াতে ব্যাংকগুলোর জন্য তারল্য সহায়তা বাড়ানো যেতে পারে। ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়াতে নীতিগত ও আর্থিক প্রণোদনাও দেওয়া যেতে পারে।

সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে গ্রিন ফাইন্যান্স থেকে অর্জিত মুনাফায় কর রেয়াত বা ট্যাক্স হলিডের সুবিধা দিলে ব্যাংকগুলো নিজ উদ্যোগেই পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়াবে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের আকার বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক আরও কমানো দরকার।

দেশ রূপান্তর : নিজস্ব কার্যক্রমে কার্বন নিঃসরণ কমানো ও পেপারলেস ব্যাংকিংয়ে পূবালী ব্যাংকের উদ্যোগ কী?

মোহাম্মদ আলী : আমরা শুধু অন্যদের গ্রিন হতে বলছি না, নিজেরাও ‘গ্রিন ব্যাংক’ হিসেবে গড়ে উঠছি। এটিকে আমরা ‘ইন-হাউজ গ্রিন ব্যাংকিং’ বলছি। আমাদের প্রধান কার্যালয় ও বড় শাখাগুলোতে পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার শুরু হয়েছে। কাগজের ব্যবহার কমাতে শতভাগ ডিজিটাল ও পেপারলেস ব্যাংকিংয়ের দিকে এগোচ্ছি। ই-ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপ ও ই-স্টেটমেন্টের ব্যবহারও বাড়ছে।

ইতিমধ্যে ৪২০টি শাখা ও ৫২৬টি এটিএম বুথ সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় ৫১৯টি শাখা ও ২৮১টি উপশাখায় কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা হয়েছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে এক্সিকিউটিভ ফ্লোরসহ বিভাগীয় প্রধানদের কক্ষে সেন্সরভিত্তিক বৈদ্যুতিক সুইচ স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া পরিবেশের ক্ষতি কমাতে ব্যাংকটি ১০০ শতাংশ পরিবেশবান্ধব আর-পিভিসি প্লাস্টিক দিয়ে ক্রেডিট কার্ড তৈরি করছে। ক্রেডিট কমিটি ও ম্যানেজমেন্ট কমিটিকেও শতভাগ পেপারলেস বা ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ আমাদের কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমাতে ভূমিকা রাখছে।

দেশ রূপান্তর : আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে গ্রিন ফাইন্যান্সকে কোথায় দেখতে চান?

মোহাম্মদ আলী : আগামী পাঁচ বছরে আমি চাই, গ্রিন ফাইন্যান্স ব্যাংকিংয়ের আলাদা কোনো শাখা হিসেবে না থেকে মূলধারার ব্যাংকিংয়ের অংশ হয়ে উঠুক। যেকোনো ঋণ প্রস্তাব মূল্যায়নের সময় পরিবেশগত বিষয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিবেচনায় আসবে, এটাই প্রত্যাশা। আমাদের ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো ২০৫০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ‘নেট-জিরো’ বা কার্বন-নিরপেক্ষ ব্যাংক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা। 

দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ আলী : দেশ রূপান্তরকে তাদের এই চমৎকার আয়োজনের জন্য এবং আমাকে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত