জলাবন নদী পাথর পাহাড়ের মিতালি

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৪ এএম

প্রকৃতিকন্যা নামে পরিচিত সিলেটে পর্যটনশিল্পের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। সারি সারি চা বাগান, পাহাড়-টিলা, নদীর স্বচ্ছ জল, সাদা-কালো পাথর, জলাবনের মোহনীয় রূপ পর্যটককে কাছে টেনে নেয়।

সিলেট আরেক পরিচিতি পুণ্যভূমি হিসেবে। হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরাণসহ (রহ.) অগণিত ওলি-আউলিয়া শুয়ে আছেন সিলেটের মাটিতে। শ্রীচৈতন্যের স্মৃতিও এখানে জড়িয়ে আছে। মাজার জিয়ারতসহ ধর্মীয় আবেগে বহুকাল আগে থেকেই এখানে আসেন অনেক মানুষ। আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলো দিনে দিনে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

দিনে দিনে সিলেটে বাড়ছে পর্যটকের সংখ্যাও। ছুটির দিনগুলোয় প্রায় সব পর্যটনকেন্দ্রে থাকে উপচেপড়া ভিড়। সারা দেশ থেকে আসেন নারী, শিশু, ছাত্রসহ অনেকেই, সপরিবারে বেড়াতে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রসারিত হয়েছে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্যও। গড়ে উঠেছে বহু হোটেল-রিসোর্ট, পার্কসহ পর্যটকদের থাকা-খাওয়া ও বিনোদনের বিভিন্ন অনুষঙ্গ। পর্যটক পরিবহনে বেশ জমেছে ভাড়ায় চালিত গাড়ির ব্যবসাও।

অবশ্য পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি প্রায়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয় নানা কারণে। তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়, অহেতুক হয়রানি-বিড়ম্বনা করার ঘটনাও ঘটে।

পাশাপাশি রয়েছে অবকাঠামোগত সমস্যা। অনেক পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াতের রাস্তা ভাঙাচোরা। পর্যটনকেন্দ্রে নেই উন্নত টয়লেট ব্যবস্থা। ফলে বিড়ম্বনায় পড়তে হয় মানুষকে; বিশেষ করে নারী-শিশুরা এই সমস্যায় পড়েন প্রতিনিয়ত। সরকার অবশ্য সিলেটের পর্যটনশিল্পের বিকাশের জন্য পর্যটকদের নিরাপত্তা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে বরাবরই জোর দিয়ে কথা বলে। বাস্তবে এ খাতে অনেক সমস্যাই বছরের পর বছর লেগে আছে।

পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংয়ের খ্যাতি অনেক পুরনো। সুউচ্চ টিলা আর পিয়াইন নদীর কলকল ধ্বনিতে মুখরিত জাফলংয়ের গা ঘেঁষেই ভারতের সারি সারি পাহাড়। সেই পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণাধারার দেখা মিলে জাফলংয়ে। পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জলের নিচে চকচক করে বালু-পাথর।

জাফলংয়ের পর সিলেটে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে একে একে জনপ্রিয় হয় আরও অনেক স্থান। বিশেষ করে কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর, গোয়াইনঘাটের রাতারগুল, বিছানাকান্দি, জৈন্তাপুরের লালাখাল এখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এসব পর্যটনকেন্দ্র মূলত নদী আর পাথরের মিতালীতে অপরূপ ও নয়নাভিরাম। তাই বলা চলে সিলেটের পর্যটনশিল্প অনেকটাই প্রকৃতি আর পরিবেশকেন্দ্রিক। পর্যটকরা এখানে আসেন প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিজেকে আরও সজীব করতে। চোখ জুড়ানো সবুজের দেখা মিলে চারদিকে। যদিও জাফলং, ভোলাগঞ্জ, বিছানাকান্দিসহ পাথরকোয়ারিকেন্দ্রিক পর্যটনকেন্দ্রগুলো সবসময়ই পাথরখেকোদের লোলুপ দৃষ্টিতে থাকে।

অতীতে বিভিন্ন ধরনের ভারী যন্ত্র দিয়ে নির্বিচারে পাথর তুলে এসব স্থানকে ছিন্নভিন্ন করা হয়েছে। পরবর্তী সময় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সাল থেকে পাথরকোয়ারিগুলো বন্ধ হয়ে যায়। তবে নানা কৌশলে পাথর উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কোম্পানীগঞ্জের সাদা পাথর পর্যটনকেন্দ্রের সব পাথর নজিরবিহীনভাবে লুটপাট হয়। যে পাথর দেখতে সেখানে পর্যটকরা ছুটে যেতেন, সেই জায়গাকে পাথরশূন্য করে ফেলা হয়। এ নিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হলে টনক নড়ে প্রশাসনের। লুটে নেওয়া কিছু পাথর উদ্ধার করে তা আবার সাদাপাথরে প্রতিস্থাপন করা হয়।

পর্যটনসংশ্লিষ্টরা জানান, এই শিল্পের বিকাশে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয় জরুরি। বেসরকারি খাতে গত এক দশকে সিলেটে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল, রিসোর্ট, পার্ক। তবে রাস্তাঘাট নির্মাণসহ পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। প্রায় সব পর্যটনকেন্দ্র সিলেট নগরী থেকে অন্তত ২০ থেকে ৫০-৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। তাই উন্নত সড়ক যোগাযোগ অত্যন্ত জরুরি। কিছু পর্যটনকেন্দ্রে পৌঁছতে আবার প্রয়োজন হয় নৌকার। এসব নৌকা পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, পর্যটনকেন্দ্রগুলোর সৌন্দর্য অটুট রাখা, পর্যটকদের নিরাপত্তা এসব বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও পর্যটকরা সিলেটে নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যেই ভ্রমণ করতে পারেন।

সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিলেটকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ চলছে। সবুজ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিতে জোর দেওয়া হয়েছে। ফুটপাত দখলমুক্ত করা হয়েছে। পর্যটকরা এই নগরীতে এসে পর্যটনকেন্দ্রের পাশাপাশি নগরীর সৌন্দর্যেও যাতে মুগ্ধ হন সে চেষ্টাই করে যাচ্ছে সিটি করপোরেশন।

সিলেটের পর্যটনকেন্দ্র অধ্যুষিত সীমান্তবর্তী ৩টি উপজেলা কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য, বর্তমান সরকারের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে পর্যটনশিল্পের বিকাশ এবং এ খাতে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলেছিলেন। এ প্রসঙ্গে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, পর্যটনশিল্পের বিকাশে সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। নিরাপত্তা, সীমান্ত এলাকায় মাদক ও চোরাচালান বন্ধসহ বিভিন্ন সমস্যা নিরসনে সরকার কাজ করছে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন এবং এ খাতের বড় ধরনের বিশেষ প্রকল্প আগামী ডিসেম্বরেই দৃশ্যমান হবে। পর্যটনে বদলে যাবে সিলেটের অর্থনীতি। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী উপজেলার মানুষ এর সুফল ভোগ করবেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত