ভোর না হতেই সুন্দরবনের পাশে শাকবাড়িয়া নদীতে নোঙর করা হাসপাতালের সামনে মানুষের ভিড়। কেউ এসেছেন পরিবারের সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে, কেউ একাই। কেউ কয়রা সদর থেকে, কেউ এসেছেন উপজেলার দূরের কোনো গ্রাম থেকে। চিকিৎসকের পরামর্শ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ সবই বিনামূল্যে পাওয়া যাবে। এমন আশায় ভোর থেকেই সিরিয়াল দিতে শুরু করেন তারা।
খুলনার কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের নয়নি গ্রামে নোঙর করা ‘কিং আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজ’ ভাসমান হাসপাতালে শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সরেজমিন গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের সামনে রোগীর সারি দীর্ঘ হতে থাকে। ফ্রেন্ডশিপ এনজিও'র তত্ত্বাবধানে এলাকার শত রোগীকে প্রতিদিন বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, এই হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিদিনই দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে এই হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা স্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে।
কয়রা সদর ইউনিয়নের গোবরা গ্রামের বাসিন্দা জাহানারা পারভীন তার পরিবারের কয়েকজনকে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, এখানে ভালো চিকিৎসা হয় এমন কথা শুনেছি। তাই পরিবারের আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি।
উপজেলার বাগালী ইউনিয়নের বামিয়া গ্রামের লতিকা ঘোড়ামী নামে একজন বয়স্ক রোগী বলেন, চিকিৎসা ও ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে শুনে তিনি হাসপাতালে এসেছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধও পেয়েছেন।
সরেজমিন দেখা যায়, হাসপাতালে সাধারণ রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি দাঁত ও চোখের চিকিৎসা এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ছোটখাটো অস্ত্রোপচারও করা হচ্ছে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়া হচ্ছে।
ভাসমান হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতিদিন গড়ে ১৭০ থেকে ১৮০ জন রোগী চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন। গত ১৫ জুলাই মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের নয়নি গ্রামে হাসপাতালটি নোঙর করা হয়। এখানে একজন মেডিকেল অফিসার, দুজন সহকারী, চারজন টেকনোলজিস্ট, একজন ফার্মাসিস্টসহ মোট ২২ জন কর্মী কাজ করছেন।
ফ্রেন্ডশিপের প্রজেক্ট ম্যানেজার ফিরোজ আক্তার বলেন, হাসপাতালটি এখানে তিন থেকে চার মাস অবস্থান করবে। এ সময় কয়রা উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে।
ফিরোজ আক্তার বলেন, কয়রার প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা নেওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। উপজেলা সদরের হাসপাতাল অনেকের জন্য দূরে। যাতায়াতের সমস্যার কারণে অনেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারেন না। এসব মানুষের কথা বিবেচনা করেই ভাসমান হাসপাতালের মাধ্যমে আমরা সেবা দিচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতালটি যতদিন এলাকায় থাকবে, ততদিন প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হবে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহনেওয়াজ শিকারী বলেন, উপকূলীয় ও দুর্গম এলাকা হওয়ায় কয়রার অনেক মানুষের জন্য নিয়মিত চিকিৎসাসেবা পাওয়া সহজ নয়। এ অবস্থায় কয়েক মাসের জন্য হলেও ভাসমান হাসপাতালের সেবা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হাসপাতালটি আরও কিছুদিন এলাকায় থাকলে প্রত্যন্ত গ্রামের আরও মানুষ চিকিৎসাসেবার আওতায় আসবেন বলে আশা করছেন তিনি।