নদী দখল-দূষণ কারীদের শাস্তির দাবি

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১৯ পিএম

নদী দখলদার ও দূষণকারীদের তালিকা প্রকাশ ও তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানিয়েছেন দেশের সচেতন নাগরিকরা।

‘বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর দখল-দূষণের বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন’ শীর্ষক এক কর্মসুচীতে এ দাবি জানান অংশগ্রহণকারীরা।

আজ শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসিলা লঞ্চ ঘাট থেকে লঞ্চ যোগে এ কর্মসুচী অনুষ্ঠিত হয়। দেশের পরিবেশ ও নদী প্রেমী ২৩টি সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে কর্মসুচী পালন করা হয়। 

এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন (এমপি)।  অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সহসভাপতি মহিদুল হক খান। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির। 

আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপা’র কোষাধ্যক্ষ মো. আমিনূর রসুল, সাংগঠনিক সম্পাদক, মিহির বিশ্বাস, যুগ্ম সম্পাদক, শাহজাহান মৃধা বেনু, হুমায়ুন কবির সুমন, ড. হালিমদাদ খান,, নির্বাহী সদস্য ফরিদুল ইসলাম ফরিদ, বিআইডাব্লিউটিএর পরিচালক,  মো. আলমগীর কবির, ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের পরিচালক, গাউস পিয়ারী, সিডাব্লিউএফএর চেয়ারম্যান শাহ্ ইশরাত আজমেরী, এএলআরডিএর সানজিদা খাতুন রিপা, বারসিক-এর  জাহাঙ্গীর হোসেনসহ বাপা অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং আয়োজক সংগঠনের অন্যান্য শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, এবং গ্রীন ভয়েসের বিভিন্ন শাখার প্রতিনিধিরা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন (এমপি) বলেন, বাংলাদেশের প্রাণ হচ্ছে নদী। এই নদী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ সকল ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রকৃতির সঙ্গে এবং প্রতিটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে নদী ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই নদী আজ হুমকির মুখে। যারা এই নদীকে গলা টিপে হত্যা করার চেষ্টা করছে, আমি মনে করি প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা উচিত। নদী দখলদার ও দূষনকারীদের তালিকা প্রকাশ ও তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির প্রদানের দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, আমার নির্বাচনী এলাকায় মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে যেভাবে ব্যবস্থা নিই, মাদকের বিরুদ্ধে যেভাবে অভিযান পরিচালনা করি এবং অপরাধীদের নাম যেভাবে থানায় লিপিবদ্ধ থাকে, আমি মনে করি পরিবেশ, নদী-খালের ক্ষতি করে যারা, তাদেরও এভাবে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা উচিত। যারা খাল ভরাট করে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে, নিজেদের স্বার্থের জন্য পরিবেশকে গলা টিপে হত্যা করে, পরিবেশের প্রত্যেকটি সেক্টরে যারা ক্ষতি করে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। 

তিনি বলেন বর্তমান সরকার এবং সরকারের প্রধান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একজন পরিবেশবান্ধব নেতা। তিনি পরিবেশের প্রত্যেকটি দিক লক্ষ্য করে পরিবেশবান্ধব কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। আপনারা লক্ষ্য করবেন, নদী খনন, বৃক্ষরোপণ, এগুলো পরিবেশবান্ধব কর্মসূচি। আমরা মনে করি, সরকারপ্রধান ঠিক থাকলে ইচ্ছা ঠিক থাকলে পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব।

এই সরকার চায় নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রাণ এই নদীকে রক্ষা করতে। কৃষিখাতে, দেশের বিভিন্ন কাজে যেন আমরা নদী-নালা, খাল-বিলের পানি ব্যবহার করতে পারি, সেই চেষ্টা এই সরকার করে যাবে এবং সেই কর্মসূচিগুলো হাতে নিয়েছে। এই সরকারের পরিবেশ রক্ষার যতগুলো সেক্টর আছে, এই সেক্টরের দায়িত্বগুলো যোগ্য ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন লোকদের দিয়ে সেই কাজ করা হবে।

সভাপতির বক্তেব্যে মহিদুল হক খান বলেন, বাপা দেশের নদনদী রক্ষায় দুই দশকের বেশীসময় ধরে নিরলসভাবে কাজ করে জাচ্ছে। দেশের সকল নদী আজ দখল দূষণে জর্জরিত। আমরা চাই দ্রুত সকল দখলদারদের তালিকা করে দোষিদের শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

বিআইডাব্লিউটিএর পরিচালক,  আলমগীর কবির বলেন, আমরা শুরুতেই নদী রক্ষার কথা বলে আসছি। কোন কোন জায়গায় আমাদের নদীগুলোকে রক্ষা করতে হবে, কী কী হুমকি আমাদের আছে, সেই বিষয়গুলো আমাদের অনেকটাই আমরা জানি। কিন্তু তারপরেও অনেক বিষয় আছে যেগুলো আমরা জানি না। এজন্য আমার মনে হয় আজকে যারা এই পরিবেশবাদী সংগঠন আছেন, তাদের আন্দোলন এবং পত্রিকা, পত্রপত্রিকা এবং সাংবাদিক ভাইদের কঠোর পরিশ্রম এবং তাদের লেখালেখি—এই কারণেই মূলত একটা সময় ১৯৯৯ সালে প্রথম এই নদীর উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করি। 

এবং সেক্ষেত্রে কিন্তু আপনাদের সবার ভূমিকা ছিল। কারণ সরকার এমন অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল যে সরকারের পক্ষে আর তেমন কোনো করণীয় ছিল না, শক্তি ছিল না এটাকে উদ্ধার করার। আপনাদের প্রেসারে পরবর্তীতে মহামান্য হাইকোর্ট হস্তক্ষেপ করে। এই হাইকোর্টের হস্তক্ষেপই ছিল নদী উদ্ধারের একমাত্র রক্ষাকবচ। এবং তারপরে কিন্তু ধারাবাহিকভাবে ২০০৯, ২০১৪, ২০১৬, ২০১৯, ২০২১ সাল—এতগুলো হাইকোর্টের আদেশ রয়েছে। সেই আদেশগুলোই মূলত এই নদী রক্ষার ক্ষেত্রে একটা ভূমিকা পালন করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বর্তমান সরকারে যারা আছে তাদের যে আগ্রহ আমরা লক্ষ্য করছি, আমরা আশা করি এই সরকারের এই পাঁচ বছরের মধ্যে ইনশাল্লাহ আমরা একেবারেই এই ঢাকার চারপাশের নদী শুধু না, শহরের মধ্য থেকে প্রবাহমান সব নদীগুলোকেই আমরা একটা পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারব।

আলমগীর কবির বলেন, গত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৪১৫ টি নদীর তালিকা করা হয়েছে। আমরা জানি আরও নদী ছিল, সেগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা বলি বাংলাদেশের নদীগুলো আমাদের প্রাণ। এই নদী রক্ষা করার জন্য, তিস্তা, বুড়িগঙ্গাসহ এই ঢাকা শহরের চারপাশের নদীগুলোকে রক্ষা করার জন্য কত রাত-বিরাত কত সময় আমাদেরকে নদীগুলোর কাছে কাটাতে হয়েছে। ২০০৯ সালে আমরা যখন হাইকোর্টে রিট করে নদীর সীমানা নির্ধারণ করার কথা বলেছিলাম। নদীর সীমানা পিলারগুলো জিগজ্যাগ ভাবে বসানো হয়েছে। এই পদ্ধতির ভিতর দিয়ে দখলদারদের বৈধতা দেওয়া হয়েছে। যেখানে দখল হয়েছে, সেই দখলদারদের জায়গা নিরাপদ রেখে পিলারগুলো বসানো হয়েছে। তিনি নদীর একক অবিভাবক ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন স্বাধীন কার্যকরি প্রতিষ্ঠান করার দাবি করেন।

নদী পরিদর্শন শেষে পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, দেশের নদ-নদী ভালো নেই। নদীর কান্না আজ দুচোখে দেখলাম। নদী দখলকারী, নদীর বুকে শাহ সিমেন্ট, স্ক্যান সিমেন্টসহ বেশকিছু কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। সরাসরি নদীর বুকে তাদের মালামাল পরিবহনের জন্য জেটি নির্মাণ করা হয়েছে প্রশাশনের নাকের ডগায়। কিন্তু প্রশাশন নির্বিকার। আমরা এসমস্ত দখলদারদের উচ্ছেদ করে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণসহ শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য দাবি জানাচ্ছি।

মিহির বিশ্বাস বলেন, নদীগুলোকে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়, সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ের সমন্বয়ের মাধ্যমেই রক্ষা করতে হবে। কারণ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের যে আমরা সমন্বয়ের অভাবগুলো দেখছি, সেই জায়গাগুলোকে আমাদের সমন্বয় করতে হবে। আন্তঃমন্ত্রণালয়গুলো যদি সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে, তবেই আমাদের নদীগুলো রক্ষা হবে। 

শাহ ইশরাতে আজমেরী বলেন, আমাদের নদীগুলো দূষণমুক্ত করতে হবে। জীববৈচিত্র রক্ষা করার জন্য আমাদেরকে সচেতন হতে হবে এবং এর পাশাপাশি যারা দখল করছে তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি এবং সকল জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের এই নদী নিয়ে কাজ করতে হবে বলে জানান তিনি।

হুমায়ুন কবির সুমন বলেন, নদীর সাথে সম্পর্কিত মৎস্য, প্রাণবৈচিত্র্য, জীববৈচিত্র্য। আমাদের সকলে মিলে যেন একটা সুন্দর বাংলাদেশে গড়তে পারি সেই লক্ষে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। 

গাউস পিয়ারী বলেন, শুধু দিবস ভিত্তিক নদী দিবস পালন না করে বরং প্রতিদিনই যেন আমরা নদী রক্ষার জন্য কাজ করি। আমাদের নিজ জায়গা থেকে যেন নদী রক্ষায় কাজ করতে হবে।

সানজিদা খাতুন রিপা বলেন, দূষণের জন্য দায়ী ব্যক্তি সংস্থাগুলোকে শাস্তি নিশ্চিত না করা পর্যন্ত দখল দূষণ কমবে না। পাশাপাশি যে কলকারখানাগুলো, যে ইন্ডাস্ট্রিগুলো নানাভাবে আমাদের নদীগুলোকে দূষিত করতেছে, নানা তাদের ইটিপি ব্যবহার করছে না, সেই জায়গায় পরিবেশ মন্ত্রণালয়ও তাদের সেই ভূমিকাটা পালন করবে এই মনিটরিং জায়গাটা জোরদার করতে হবে।

বিশেষ এ কর্মসূচি থেকে ১০ দফা দাবি জানানো হয়। দাবি গুলো হলো-

১. বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীর পুণরায় সীমানা জরিপ করে নদীভূমি দ্রুত দখলমুক্ত করতে হবে।
২. নদীতে সরাসরি শিল্পবর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য ফেলার সব অবৈধ সংযোগ বন্ধ করতে হবে।
৩. সব শিল্পকারখানার ঊঞচ সার্বক্ষণিক চালু রাখা এবং অনলাইন মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।
৪. দূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. নদীর তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদীর মূল প্রবাহ ও জায়গা ফিরিয়ে দিতে হবে।
৬. বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীর পানি, তলানি ও জীববৈচিত্র্যের নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করতে হবে।
৭. নদীতে প্লাস্টিক, পলিথিন, বাজারের বর্জ্য ও জাহাজের তেল-বর্জ্য ফেলা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
৮. বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থাকে নিয়ে সময়বদ্ধ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। 
৯. রাষ্ট্র দেশের নদী, সমুদ্র, পাহাড়, বন, হ্রদ, পুকুরসহ প্রাকৃতিক সম্পদের ট্রাস্টি বা অভিভাবকসুলভ রক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। 
১০. জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করতে হবে।

প্রসঙ্গত, বিশেষ এ কর্মসুচীতে অংশ নেয় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বেলা, এএলআরডি, নাগরিক উদ্যোগ, বারসিক, বাদাবন সংঘ, ক্যাপস, ডব্লিউবিবি ট্রাস্ট, অনুসন্ধানী ক্রিডস, সিডিপি, ইকিউএমএস, গ্রীন ভয়েস, আরডিআরসি, সিডাব্লিউএফ, শিসউক, বাংলাদেশ সেন্টার ফর কোস্টাল এন্ড মেরিন স্ট্যাডিজ, ঢাকা ইউনিভার্সিটি ফেন্ডস এলায়েন্স (ডুফা), নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন আন্দোন, লিডার্স, বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলন, কোস্ট ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ঘুড়ি ফাউন্ডেশন এবং শীতলক্ষ্যা বাঁচাও আন্দোলন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত