শুধু উঁচু ভবন আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়া পর্যটনের উপযোগী আর কী আছে কক্সবাজারে? দরকার নিরাপত্তা, পর্যটন উপযোগী পরিবেশ, নিরাপদ খাবার, বিনোদনের ব্যবস্থা, স্থানীয়দের অংশগ্রহণ, সবকিছুতে পেশাদারত্বেও প্রতিফলন এবং সার্বিক সমন্বয়। এগুলো কি আছে? এমন প্রশ্নে স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ অধিকাংশ জবাব ‘নেই’।
অথচ বিশাল সমুদ্র আর পাহাড়সহ পর্যটনের বিকাশে সহায়ক হতে পারে, এমন অনেক কিছু আছে এখানে। নুনিয়াছড়ায় রয়েছে মিনি ‘সুন্দরবন’। এক পাশে সমুদ্র আর অন্যপাশে পাহাড় রেখে দক্ষিণে গেলেই পাহাড়, ঝরনা আর গুহার সংমিশ্রণের দরিয়ানগর। মেরিন ড্রাইভ দিয়ে ছুটলেই হিমছড়ির ঝরনা। আরেকটু এগোলেই দেখা মিলবে পেচারদ্বীপের বামের দুই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া সড়ক যাকে স্থানীয়রা ‘মিনি বান্দরবান’ বলে ডাকে। এর বাঁকে বাঁকে রয়েছে অসংখ্য ঝরনা, গুহা আর আঁকাবাঁকা বয়ে চলা খাল। মেরিন ড্রাইভ ধরে আরেকটু সামনে গেলেই দেখা মিলবে ইনানীর পাথুরে বীচ, লাল কাকড়ার রাজত্ব, শাপলার বিল পাটুয়ারটেক, মনখালীর গর্জন বাগান, টেকনাফের জিরো পয়েন্ট, মাথিনের কূপ ও নেটং পাহাড়ে ব্রিটিশ আমলে তৈরি ব্যাংকার।
শহর থেকে মাত্র ২২ কিমি দূরে রামুতে ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের বাড়ি, রামকোট বৌদ্ধবিহার, ১০০ ফুট শয্যা বৌদ্ধমূর্তি, চা বাগান ও রাবার বাগান।
সাগরের বুক চিরে সেন্টমার্টিন, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর তিনটি দ্বীপ রয়েছে। মহেশখালীতে রয়েছে আদিনাথ মন্দির, রাখাইন পল্লী, প্রজাপতির বন সোনাদিয়া এবং মাতারবাড়িতে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প। কুতুবদিয়ায় রয়েছে মালেকশাহর মাজার ও বাতিঘর। কিন্তু প্রচার না থাকায় সমুদ্র ছাড়া এসবের কিছুই চেনে না কক্সবাজার বেড়াতে আসা অতিথিরা।
এতকিছু থাকতেও কেন কেবল ‘নেই’ ‘নেই’ অভিযোগ! এ বিষয়ে ট্যুর অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) আহ্বায়ক মিজানুর রহমান মিল্কী বলেন, ‘এই জেলাতেই দেখার জন্য পঞ্চাশের বেশি স্পট রয়েছে। কিন্তু প্রচার নেই। এ কারণে এখানে যারা আসেন, তারা শুধু সাগরপাড়েই সময় কাটায়।’
কক্সবাজার হোটেল মোটেল অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ বলেন, ‘লোকজন আসে আনন্দ-ফুর্তি করতে। অথচ এখানে বিনোদনের কোনো ব্যবস্থা নেই। সন্ধ্যা নামলেই রুমে ফেরা ছাড়া অতিথিদের করার কিছুই থাকে না।’ তিনি আরও বলেন, এখানে একটি শিশুপার্ক নেই, নাইট বাজার নেই, মুভি কমপ্লেক্স তো দূরের কথা, সিনেমা হল পর্যন্ত নেই। অ্যামিউজমেন্ট পার্ক নেই, আন্তর্জাতিক মানের শপিং কমপ্লেক্স নেই, ক্যাবল কারের ব্যবস্থা নেই, পর্যাপ্ত বার নেই, ডিসকো নেই, ক্যাসিনো নেই। আছে প্যারাসাইকেলিং তারও মান ঠিক নেই। এভাবে তো পর্যটন চলতে পারে না।
কলিম উল্লাহ যোগ করেন, বালিয়াড়ি দখল করে বস্তি তৈরি হচ্ছে। সৈকতে সড়ক নির্মাণের মতো পরিবেশবিরোধী কর্মকা-েই যেন সংশ্লিষ্টরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অথচ তাদের সমন্বয়হীনতার কারণে দেশে-বিদেশে কক্সবাজারের দুর্নাম হচ্ছে।
পর্যটন জোনে হোটেল-মোটেলে যখন-তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ডুকে পড়ে, তল্লাশি চালায়, এমন তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, একটি হোটেলে ইনডোর ডিজে হচ্ছিল। সেখানে হঠাৎ পুলিশ হানা দেওয়ায় পর্যটকরা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। অথচ বিষয়টিকে সুন্দরভাবে সমাধান করা যেত। এতে পর্যটনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
অবিচ্ছিন্ন বালুকাময় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ। কিন্তু শহরের লাবনী পয়েন্ট থেকে কলাতলী পর্যন্ত মাত্র তিন কিলোমিটারেই লোকের সমাগম হয়।
ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তামজিদ হাসান বলেন, সৈকতের অবস্থাও খারাপ। যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা পড়ে রয়েছে। চেয়ারের জন্য দাঁড়ানোর, কিংবা বালিতে বসার কোনো জায়গা নেই। এক মিনিটে দাঁড়ালেই হয় ভিক্ষুক আসে, নতুবা হকার, নতুবা ছোট ছোট শিশু আসে ম্যাসাজ করা কিংবা গান শোনানোর আবদার নিয়ে।
লাবনী পয়েন্টে তিন যুগ ধরে চা, পানি, সিগারেট ও শুকনা খাবার বিক্রি করে শহরের সমিতিপাড়ার বাসিন্দা আবদুল গফুর। তিনি বলেন, ৩০ বছর আগেও কক্সবাজারে এত দালান কোঠা ছিল না। তবে ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। যেমন লাবনী পয়েন্টেই ছিল শাপলা বিল ও গলফ মাঠ। এখন বিলকে করা হয়েছে নালা আর গলফ মাঠকে করা হয়েছে গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান।
তিনি বলেন, ‘সে সময় এখনকার মতো লাখ লাখ লোক কক্সবাজারে আসত না সত্যি। তবে বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা ছিল দেখার মতো। তারা নির্জনে ‘সান বাথ’ নিতেন। এখন সেই দৃশ্য আপনি হারিকেন দিয়ে খুঁজলেও পাবেন না। এই হচ্ছে আমাদের পর্যটন।’
কক্সবাজার সিটি কলেজের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রধান মইনুল হাসান পলাশ বলেন, উঁচু উঁচু ভবন উঠলেই পর্যটন হয় না। মূলত পর্যটনের প্রাথমিক ভিত্তি হচ্ছে চারটি নিরাপত্তা, সুষম পরিবেশ, নিরাপদ খাদ্য ও পেশাদারত্ব। এই চারটির কোনোটিই এখন কক্সবাজারে নেই। এখনকার চেয়ে কক্সবাজারের পর্যটন ৩০-৪০ বছর আগে ভালো ছিল।
এখন হোটেল-মোটেল জোনে অনেক মাদককারবারি টাকা লগ্নি করছে জানিয়ে তিনি বলেন, দিন দিন পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাসী দৌরাত্ম্যে অসহায় হয়ে পড়েছে এখনকার ব্যবসায়ীরা।
তিনি যোগ করেন, এখানকার বেশিরভাগ হোটেলের ম্যানেজমেন্টে বিদেশি রয়েছে। তাদের সঙ্গে কোম্পানির ৫-১০ বছরের আয়ের চুক্তি হয়। তারা আয় বাড়াতে এখানে আসা অতিথিদের শোষণ করে। এতে পর্যটনে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এর থেকে বেরিয়ে আসতে স্থানীয় ছেলেমেয়েদের তৈরি করতে হবে।
হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, পর্যটন এগিয়ে নিতে হলে প্রশাসনিক জটিলতা ও সমন্বয়হীনতা দূর করতে হবে। ট্যুরিস্ট পুলিশকে ঢেলে সাজাতে হবে।
পর্যটন করপোরেশনের কক্সবাজার অফিসের ম্যানেজার ও বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব রায়হান উদ্দিন আহমদ বলেন, স্থানীয় লোকদের সঙ্গে পর্যটকেদের চাহিদার বিস্তর ফারাক রয়েছে। তাই চাইলেই অনেক কিছু করা সম্ভব হয় না। তবুও সরকার পর্যটনের স্বার্থে অনেক প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে বিদেশিদের টানতে টেকনাফের সাবরাং ও জালিয়াপালংয়ে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিজমের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
সৈকতে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকা ও ডুবুরি দল নিয়ে তিনি বলেন, শহরের সুগন্ধা পয়েন্টে প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্রের জন্য ভবন হয়েছে। কিন্তু (২০২৪ সালের) ৫ আগস্টের পরের প্রেক্ষাপটের কারণে সেটি চালু করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লাইফগার্ডরা সদস্যরা পানিতে ভেসে যাওয়া লোকজনকে উদ্ধারে কাজ করে।
সমুদ্রশহর কক্সবাজার থেকে সাবরাংয়ের দূরত্ব প্রায়ই ৯০ কিলোমিটার। পর্যটকদের শহর থেকে সেখানে সড়কপথে যেতে ৩ ঘণ্টা সময় লাগে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, পর্যটনকে গুরুত্ব দিয়ে বর্তমান সরকার একটি সংসদীয় কমিটি রয়েছে। কমিটি নাইট বাজার স্থাপনে গুরুত্ব দিয়েছে। এ ছাড়া বিগত আমলের মেগা প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।
কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, ‘পর্যটনের জন্য কক্সবাজারে কিছুই নেই। ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার নেই, মানি এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থা নেই। পর্যটনের যে সংস্কৃতি তার সঙ্গে এখনো আমাদের লোকজন সম্পৃক্ত হতে পারেনি। এটাই আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ।’ পরিবেশবাদীদের একটু ছাড় দিতে হবে, এমনটি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন করতে গেলে পরিবেশের কিছুটা ক্ষতি হবেই, এটা মানতে হবে।’