 ভোলায় সম্ভাবনা

পর্যটনের স্বর্গ, তবু অচেনা

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪৩ এএম

নদী, সাগর, চর, বন আর সবুজের অপার সৌন্দর্য প্রকৃতি যেন ভোলাকে সাজিয়েছে নিজের হাতে। একদিকে মেঘনার বিশাল জলরাশি, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর; মাঝখানে সবুজে মোড়া চর, ম্যানগ্রোভ বন, নির্জন সৈকত, নদীর পাড়ে সূর্যাস্ত, বন্যপ্রাণীর বিচরণ আর নদীকেন্দ্রিক জনজীবন। প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের এমন বৈচিত্র্য এক জেলার মধ্যে খুব বেশি জায়গায় দেখা যায় না। অথচ এত সম্পদ থাকার পরও দেশের পর্যটন মানচিত্রে ভোলা এখনো অনেকটাই অচেনা।

২৭ সেপ্টেম্বর বিশ^ পর্যটন দিবসকে সামনে রেখে দেশের এই অবহেলিত পর্যটনভূমিকে নতুন করে চেনার সময় এসেছে। ভোলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ দক্ষিণের চর কুকরি-মুকরি। মেঘনা ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় গড়ে ওঠা এই চরে রয়েছে বিশাল ম্যানগ্রোভ বন, বন্যপ্রাণী ও অতিথি পাখির মেলা। এর পাশেই ঢালচরের তারুয়া সমুদ্রসৈকত, যেখানে দীর্ঘ নির্জন সৈকত আর সাগরে সূর্যাস্তের দৃশ্য চোখ জুড়ায়। শহরের কোলাহলমুক্ত ভোলা একই ভ্রমণে নদী, বন, সাগর ও চরাঞ্চলের বৈচিত্র্যময় জীবনের এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা দিতে পারে।

চরফ্যাশন শহরের পর্যটন আকর্ষণের অন্যতম নাম জ্যাকব টাওয়ার। উঁচু এই পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে বিস্তীর্ণ জনপদ ও আশপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার সুযোগ রয়েছে। স্থাপত্যের দিক থেকেও এটি দক্ষিণাঞ্চলের পরিচিত একটি স্থাপনা। শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্য রয়েছে শেখ রাসেল শিশু পার্ক। ভোলা শহরে রয়েছে ড্রিমল্যান্ড পার্ক। ভোলার পর্যটনের আসল সৌন্দর্য শুধু স্থাপনা বা পার্কে নয় ছড়িয়ে আছে নদীর পাড়ে, চরের বুকে, সাগরের কিনারায়। তুলাতুলি, ইলিশবাড়ি, ইলিশা ও ভোলার বিভিন্ন নদীভিউ পয়েন্টে বিকেল নামলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। মেঘনা-তেঁতুলিয়ার তীরে বসে সূর্যাস্ত দেখা, নদীর বুকের নৌযান দেখা কিংবা খোলা বাতাসে সময় কাটানোর সুযোগ স্থানীয়দের পাশাপাশি জেলার বাইরের পর্যটকদেরও আকৃষ্ট করতে পারে।

বোরহানউদ্দিনের ইকোপার্ক এবং তেঁতুলিয়া নদীকে ঘিরে থাকা প্রাকৃতিক পরিবেশ ভোলার পর্যটন সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করেছে। নদী, সবুজ ও খোলা প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে এসব স্থানকে পরিকল্পিতভাবে সাজানো গেলে জেলার পর্যটন শুধু চরফ্যাশনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

ভোলার পর্যটন সম্ভাবনা ও পর্যটকদের জন্য আবাসন সুবিধা নিয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহাম্মদ সোহেল মঞ্জুর বলেন, ‘ভোলার পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে আমরা ইতোমধ্যে কথা বলেছি। বিশেষ করে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের যাতায়াত ও থাকার সুবিধা কীভাবে বাড়ানো যায়, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেওয়া হবে। ভোলায় এ বিষয়গুলো সরেজমিন দেখার পাশাপাশি ঢাকায় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি আমরা বিবেচনা করব।’

এ বিষয়ে জেলা পরিষদ প্রশাসক আলহাজ গোলাম নবী আলমগীর বলেন, ‘ভোলার পর্যটন সম্ভাবনা অত্যন্ত ব্যাপক। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের ভোলায় আসার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। একই সঙ্গে পর্যটন খাতের উন্নয়নে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে সম্ভাবনাময় স্থানগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা নেওয়া হবে। এসব পরিকল্পনা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে। এ বিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে।’

নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব এস এম বাহাউদ্দিন বলেন, ‘ভোলাকে পর্যটন জেলা হিসেবে গড়তে সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে স্থানীয় উদ্যোগের সমন্বয় প্রয়োজন। এ জন্য স্থানীয়দের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তুলে ধরা, ছোট রিসোর্ট ও হোটেল তৈরি এবং সেবামূলক ও সহযোগিতাপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে পর্যটকদের দর্শনীয় স্থান ঘোরার সুযোগ বাড়াতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোলার পর্যটনকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি স্পট হিসেবে না দেখে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ট্যুরিজম সার্কিট’ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। ভোলা শহর থেকে নদীপাড়ের তুলাতুলি, ইলিশবাড়ি ও ইলিশা, বোরহানউদ্দিনের ইকোপার্ক, চরফ্যাশনের জ্যাকব টাওয়ার, শেখ রাসেল শিশু পার্ক, বেতুয়া, চর কুকরি-মুকরি, খেজুরগাছিয়া, ঢালচর ও তারুয়াকে একটি পরিকল্পিত ভ্রমণ রুটের আওতায় আনা গেলে পর্যটকদের সামনে ভোলাকে নতুনভাবে তুলে ধরা সম্ভব।

এতে শুধু পর্যটন নয়, স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। পর্যটক বাড়লে নৌযান, পরিবহন, হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য ও ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রসার ঘটবে। প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের মানুষও পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন। ইলিশের জেলা হিসেবে পরিচিত ভোলা চাইলে নতুন আরেক পরিচয় তৈরি করতে পারে নদী, সাগর, চর ও সবুজ প্রকৃতির অনন্য পর্যটনভূমি হিসেবে। প্রকৃতির বুকে ছড়িয়ে থাকা এই অপার সম্ভাবনাকে পরিকল্পিত পর্যটনে রূপ দিতে পারলেই একদিন দেশের পর্যটন মানচিত্রে ভোলা আর অচেনা থাকবে না।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত