সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় উপজেলা খুলনার কয়রায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধ উন্নয়ন ও নির্মাণের মেগা প্রকল্পে কাজের মান নিয়ে একের পর এক অভিযোগ উঠছে। ব্লক তৈরিতে নির্ধারিত মানের সিলিকন বালুর পরিবর্তে নিম্নমানের লোনা বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বাঁধের বিভিন্ন অংশে মাটি দেবে যাওয়া, সড়কের সেøাপ যথাযথভাবে না করা এবং কোথাও কোথাও প্রয়োজনীয় পরিমাণ মাটি না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ভিডিওতে দেখা যায়, উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের চরামুখো এলাকায় সাতক্ষীরা পাউবোর পোল্ডার ১৪/১ প্রকল্পের জন্য ব্লক তৈরি করা হচ্ছে। সেখানে নিম্নমানের ব্লক তৈরির কারণে স্থানীয় বাসিন্দা মো. শামীম হোসেনসহ এলাকাবাসীকে এর প্রতিবাদ করছেন।
সরেজমিন চরামুখা এলাকায় ব্লক তৈরির স্থান ঘুরে দেখা যায়, সেখানে বিপুল পরিমাণ লোনা বালু স্তূপ করে রাখা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এগুলো কপোতাক্ষ নদের বাঁধের নিকট হতে উত্তোলন করা নিম্নমানের লোনা বালু। ওই বালু দিয়েই ব্লক তৈরির কাজ চলছে। যে ভাঙনকবলিত বাঁধ রক্ষার জন্য হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প সেই একই বাঁধের নিকট হতে বালু উত্তোলন করে ব্লক তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রকল্পের নকশা ও নির্ধারিত মান অনুযায়ী ব্লক তৈরিতে সিলিকন বালু ব্যবহারের কথা থাকলেও সেখানে তা ব্যবহার করা হচ্ছে না। তুলনামূলকভাবে কম দামের নদীর লোনা বালু ব্যবহার করে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এমআরজেড ও পাউবোর কর্মকর্তারা অর্থ আত্মসাৎ করছেন। নদীর পাড় ও বাঁধের পাদদেশের কাছ থেকে বালু উত্তোলন করলে নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়বে এবং নির্মাণাধীন বাঁধই হুমকির মুখে পড়তে পারে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কয়রা এলাকায় এক ফুট সিলিকন বালুর দাম প্রায় ১৩০ টাকা। বিপরীতে নদীর নিম্নমানের লোনা বালু পাওয়া যায় মাত্র ২ থেকে ৩ টাকায়। ফলে নির্ধারিত মানের বালুর পরিবর্তে কম দামের বালু ব্যবহারে বিপুল অর্থ লোপাট হবে। খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চলের নদ-নদীগুলোর পানি লবণাক্ত হওয়ায় সেগুলোর বালিও লবণাক্ত। ফলে উন্নয়নকাজে এই লোনা বালু ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু কয়রায় পাউবোর ১ হাজার ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে মেগা প্রকল্পে নির্ধারিত সিলিকন বালুর পরিবর্তে লোনা বালু ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্থানীয় সুন্দরবন সিদ্দিকীয়া মাদ্রাসার সহকারী প্রধান শিক্ষক মাওলানা মতিউর রহমান বলেন, ‘চরামুখো এলাকায় যে ব্লক তৈরি করা হচ্ছে, সেগুলো অত্যন্ত নিম্নমানের। সিলিকন বালুর পরিবর্তে নিম্নমানের লোনা বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। সামান্য আঘাতেই ব্লক ভেঙে যাচ্ছে। এ ধরনের ব্লক দিয়ে তৈরি বাঁধ বেশি দিন টিকবে না। হাজতখালী এলাকায় নির্মিত বেড়িবাঁধের একটি অংশ নিচু হয়ে গেছে। কাজটি ভালো হয়নি এবং এভাবে হলে দীর্ঘদিন টিকবে না।’
বেড়িবাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি রাস্তার সেøাপ নিয়েও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন জনপ্রতিনিধি। স্থানীয় ইউপির সংরক্ষিত নারী সদস্য বিথীকা রানী বলেন, ‘বিনাপানি সøুইসগেট থেকে কিবরিয়া মেম্বারের ডিপো ঘর পর্যন্ত সড়কের সেøাপ ঠিকমতো করা হয়নি। এ নিয়ে এলাকাবাসী আমার কাছে অভিযোগ করেছে। আমি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সাতক্ষীরা পাউবোকে বিষয়টি জানিয়েছি। কিন্তু তারা তা আমলে নেয়নি।’
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ‘বাঁধ নির্মাণের পর কিছু অংশের মাটি দেবে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও রাস্তার ঢাল বা সেøাপ যথাযথভাবে না থাকায় বৃষ্টির পানি ও জোয়ারের চাপে ভবিষ্যতে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
ব্লক তৈরির কাজে যুক্ত কয়েকজন শ্রমিকও অভিযোগ করেছেন, তারা নিম্নমানের বালু ব্যবহারের বিষয়টি জানতেন। কিন্তু কাজ হারানোর আশঙ্কায় তারা শুরুতে প্রতিবাদ করেননি। শ্রমিক আলামিন ইসলাম, মহারাজপুর গ্রামের আবুল কালাম ও মোবারক হোসেনের দাবি, প্রকল্পের ব্লক তৈরির সাইটের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম তাদের ওই বালু ব্যবহার করে ব্লক তৈরিতে বাধ্য করেছেন।
চরামুখো এলাকায় ব্লক তৈরির দায়িত্বে রয়েছে এমআরজেড নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তাদের বিরুদ্ধে আগেও ব্লক নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগে পাউবো থেকে চিঠি দিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তবে ওই সময় একটি পরীক্ষায় গাফিলতি ধরা পড়লেও পাউবো কর্মকর্তারা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সাইট ইঞ্জিনিয়ার মনিরুল ইসলাম ব্লক তৈরিতে লোনা বালু ব্যবহারের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘ভুল হয়ে গেছে। আমি সাইটের বাইরে থাকায় শ্রমিকরা ভুল করে লোনা বালি ব্যবহার করেছে।’
প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা সাতক্ষীরা পাউবোর-২ এর উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মমিনুর হক বলেন, অভিযোগ পেয়ে তিনি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে লোনা সাদা বালু দেখতে পেয়েছেন। তবে সেগুলো ব্লক তৈরিতে নয়, অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মজুদ করেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পূর্বের অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের চিঠি দেওয়া হয়েছিল।