দখলে নিতেই স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুর

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪৬ এএম

দশ কাঠা জায়গা দখলে নিতেই রাজধানীর মিরপুর ১-এর স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি রাতের আঁধারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি সংস্থা রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটির জায়গার প্রতি নজর পড়ে শাহ আলী থানা বিএনপির সদস্য মো. হানিফ মিয়ার। গত বৃহস্পতিবার নেতাকর্মীদের লেলিয়ে দিয়ে গুঁড়িয়ে দেন স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি। তাকে সংরক্ষিত সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ইন্ধন দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টরা। এদিকে হামলা-ভাঙচুরের সময় প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ বিষয়টি শাহ আলী থানা পুলিশকে অবহিত করে। খবর পেয়ে পুলিশও আসে। কিন্তু তারা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। আর তাদের সামনেই হামলা, ভাঙচুর ও ট্রাকবোঝাই করে মালামাল লুট করা হয়।

ঘটনা তদন্তে পুলিশের মিরপুর বিভাগ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। সেই কমিটির প্রাথমিক তদন্তে এমনটি উঠে এসেছে। এমপি মিষ্টির বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে তাকে আইনের আওতায় আনার এবং পুলিশের গাফিলতি থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। এদিকে ঘটনায় জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে মূল হোতা হানিফ মিয়া এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। গুঁড়িয়ে দেওয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তাঁবু টানিয়ে গতকাল শনিবার  টিকাদান কার্যক্রম চালিয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, স্থানীয় বিএনপির দুটি পক্ষ দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটি দখল করার চেষ্টা করে আসছিল। এর আগে ২০২২ সালে ‘সমমনা সমবায় সমিতির’ নামে কিছু লোক জায়গাটি দখলের চেষ্টা করেছিল। তখন না পারলেও এবার ঠিকই তারা সবাই মিলে ন্যক্কারজনক ঘটনাটি ঘটিয়েছে। ঘটনার সময় আমরা পুলিশকে খবর দিয়েছি। পুলিশ এলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

এদিকে এ ঘটনায় মো. সোহেল, মো. জুয়েল, মো. জিহাদ হাসান ও মো. রাবিব নামে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের তথ্যমতে দারুস সালাম থানাধীন দিয়াবাড়ি এলাকার একটি ভবন থেকে লুট হওয়া মালামাল উদ্ধার করা হয়। শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চারজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা ভাঙচুরে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। জড়িত অন্যদেরও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অধিকাংশ মালামালই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

তাঁবু টানিয়ে টিকাদান : গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, গুঁড়িয়ে দেওয়ায় টিকাদান কেন্দ্রটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রটিতে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। তবে বাইরে তাঁবু টানিয়ে কোনোরকমে হাম-রুবেলার টিকা দিতে দেখা গেছে। এতে বাচ্চাদের টিকা দিতে আসা অভিভাবকদের বেশ ভিড় ছিল। এ সময় অনেকেই প্রতিষ্ঠানটি গুঁড়িয়ে দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বাচ্চাকে টিকা দিতে আসা সুমাইয়া সুমি নামে এক নারী বলেন, প্রতি বছর বাচ্চাকে এখানে টিকা দেন। হাতের কাছেই প্রতিষ্ঠানটি। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রয়োজন পড়লেই ছুটে আসি। অথচ এ রকম একটি প্রতিষ্ঠানও রেহাই পেল না।

জায়গার মালিকানা দাবি : তবে প্রতিষ্ঠানটির জায়গা নিয়ে নতুন দাবি তুলেছে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড। সমিতির দাবি, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ২০০৬ সালে বরাদ্দ পাওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে জমিটি তাদের দখলে দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে একাধিকবার উচ্ছেদ আদেশ হলেও তারা জমির দখল বুঝে নিতে পারেনি। সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম এমনটি দাবি করেন। প্রতিষ্ঠানটি ভাঙার ঘটনার সঙ্গে সমিতির কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করেন তিনি। 

পুলিশের গাফিলতি থাকলে ব্যবস্থা : গতকাল ঘটনাস্থলে পরিদর্শনে যান ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এ ধরনের একটি জনাকীর্ণ জায়গায় দীর্ঘ সময় ধরে ধ্বংস করা হয়েছে। সংরক্ষিত সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এ ঘটনা ঘটিয়েছেন এবং সে সময় তিনি পুলিশকে ব্যবহার করেই ঘটনা ঘটিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে কমিশনার বলেন, ওনার (এমপি) বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে আইনের আওতায় আনা হবে। এ ছাড়া পুলিশের গাফিলতি থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এডিসি দারুস সালামকে প্রধান করে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী, ডিএনসিসি প্রশাসক ও জামায়াত আমিরের প্রতিক্রিয়া : গতকাল এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রটির মালিকানা নিয়ে সমস্যা থাকলেও রাতের অন্ধকারে এভাবে স্থাপনা ভেঙে ফেলা অনাকাক্সিক্ষত। টিকাদান কর্মসূচি চালু রাখার ব্যবস্থা করব। পুলিশ সেটা দেখভাল করবে। ভবিষ্যতে যেন এটা নিয়ে আর বাড়াবাড়ি কেউ না করতে পারে, সে ব্যাপারেও ব্যবস্থা নেব। একই অনুষ্ঠানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, এ ঘটনায় জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে। অন্যদিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এ ঘটনায় জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত