নদীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন, জীবিকা, কৃষি, যাতায়াত, জনপদ ও সভ্যতা। ছুটে চলাই নদীর মূল কাজ। নদী ছুটে চলে সাগর মোহনায়। জলে ভেসে যায় নৌযান। তীরে গড়ে ওঠে জনপদ। নদীর জলসিঞ্চন করে মাটি। জন্ম দেয় ফসল। জীবিকার পথ খুলে দেয় অসংখ্য মানুষের। কোরআনে নদীর এই দুনিয়াবি বাস্তবতার পাশাপাশি জান্নাতের নদীর কথাও এসেছে। কোরআনে কখনো জান্নাতের পুরস্কার হিসেবে নদীর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। কখনো দুনিয়ার নদী ও পানি প্রবাহের কথা বলা হয়েছে। এভাবে কোরআনে মোট ৫৪ বার নদীর কথা এসেছে। হাদিসে এসেছে দুনিয়ার কয়েকটি নদীর বিশেষ মর্যাদা এবং জান্নাতের নদীর বিস্ময়কর বিবরণ। নদী একই সঙ্গে আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন, মানুষের জীবনের নেয়ামত এবং পরকালের অনন্ত পুরস্কারের স্মারক।
কোরআনে দুনিয়ার নদী : কোরআনে নদীকে আল্লাহর সৃষ্টির নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও মানুষের জন্য তার অনুগ্রহ ও নেয়ামতের কথা বোঝানো হয়েছে। আবার কোথাও নদী এসেছে সভ্যতা, ক্ষমা, ক্ষমতার অহংকার ও মানুষের দায়িত্ব প্রসঙ্গে। দুনিয়ার নদী সম্পর্কে কোরআনের এসব বর্ণনা মানুষকে আল্লাহর সৃষ্টির দিকে দৃষ্টি দিতে এবং তার ক্ষমতা উপলব্ধি করতে আহ্বান জানায়।
পৃথিবীর গঠন ও সৌন্দর্যের বিষয় স্মরণ করিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন এবং তাতে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বত ও নদী।’ (সুরা রাদ ৩)
আয়াতটি পৃথিবীর বিস্তৃতি, পাহাড় ও নদীর মতো আল্লাহর সৃষ্ট নিদর্শনের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন, যাতে তা তোমাদের নিয়ে আন্দোলিত না হয় এবং নদী ও পথ সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তোমাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারো।’ (সুরা নাহল ১৫)
এখানে নদীর পাশাপাশি পথের কথাও এসেছে। উভয়টিকেই মানুষের গন্তব্যে পৌঁছানোর উপায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘কে পৃথিবীকে করেছেন বসবাসের উপযোগী এবং কে তার মধ্যে নদী প্রবাহিত করেছেন এবং কে তাতে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বত?’ (সুরা নামল ৬১)
পৃথিবী মানুষের বসবাসের উপযোগী হওয়া এবং নদীর সৃষ্টি একই সঙ্গে এসেছে। এতে নদীর পার্থিব প্রয়োজনীয়তার দিকটি স্পষ্ট হয়।
মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘এরপরও তোমাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেল, তা পাথর কিংবা তদপেক্ষা কঠিন। আর নিশ্চয়ই কোনো কোনো পাথর এমন আছে, যা থেকে নদী-নালা প্রবাহিত হয়। আবার কোনো কোনো পাথর বিদীর্ণ হয়ে তা থেকে পানি বের হয়।’ (সুরা বাকারা ৭৪)
এখানে মূল বক্তব্য হলো, মানুষের কঠিন হৃদয়ের নিন্দা। বনি ইসরাইলের লোকরা মহান আল্লাহর বহু নিদর্শন দেখার পরও তাদের অন্তর কঠিন হয়ে গিয়েছিল। সেই প্রসঙ্গে আল্লাহ পাথরের উদাহরণ দিয়েছেন। পাথরের মধ্য থেকেও পানি ও নদীর প্রবাহ বের হয়, অথচ মানুষের হৃদয় আল্লাহর নিদর্শন দেখেও নরম হয় না।
মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘তিনি নৌযানগুলোকে তোমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন করে দিয়েছেন, যাতে সেগুলো তার নির্দেশে সমুদ্রে চলাচল করে। আর তিনি নদীগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন।’ (সুরা ইবরাহিম ৩২)
এতে বোঝা যায়, নদী মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্য আল্লাহর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ নেয়ামত।
নদী মানুষের জন্য যেমন নেয়ামত, তেমনি তা অহংকারের কারণও হতে পারে। ফেরাউন নিজের ক্ষমতা প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! মিসরের রাজত্ব কি আমার নয়? আর এই নদীগুলো কি আমার পাদদেশ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে না?’ (সুরা যুখরুফ ৫১)
ফেরাউন নদীকে নিজের ক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে দেখেছিল। অথচ এগুলো ছিল আল্লাহর সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণাধীন। তার এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে সতর্ক করে যে, আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতকে নিজের শক্তি ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ মনে করা যাবে না।
হজরত নুহ (আ.) তার সম্প্রদায়কে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ তাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তাদের সম্পদ ও সন্তান বৃদ্ধি করবেন এবং তাদের জন্য বাগান ও নদী সৃষ্টি করবেন। (সুরা নুহ ১০-১২)
এখানে নদীকে বৃষ্টি, সম্পদ, সন্তান ও বাগানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। পানির সঙ্গে মানুষের জীবন ও জীবিকার যে গভীর সম্পর্ক, আয়াতটি তার একটি সুন্দর চিত্র তুলে ধরে।
কোরআনে জান্নাতের নদী : জান্নাতের সৌন্দর্যের বর্ণনায় কোরআনে বারবার নদীর কথা এসেছে। কোথাও বলা হয়েছে, জান্নাতের নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত। কোথাও নদীর প্রবাহকে জান্নাতবাসীর স্থায়ী সুখ, প্রশান্তি ও সম্মানের অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে জান্নাতের সৌন্দর্য, সজীবতা ও প্রশান্তির চিত্র মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘মুত্তাকিদের যে জান্নাতের ওয়াদা দেওয়া হয়েছে তার উপমা হলো, তাতে আছে নির্মল পানির নদী, আছে দুধের নদী, যার স্বাদ অপরিবর্তনীয়, আছে পানকারীদের জন্য সুস্বাদু মদের নদী এবং পরিশোধিত মধুর নদী। তাদের জন্য সেখানে আছে সব রকম ফলমূল এবং তাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে ক্ষমা।’ (সুরা মুহাম্মদ ১৫)
এই আয়াতে জান্নাতের নদীর সৌন্দর্য খুব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। দুনিয়ার পানিতে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন আসে। পানীয়ের স্বাদ বদলে যায়। কিন্তু জান্নাতের নদীতে এমন কোনো পরিবর্তন নেই। সেখানে রয়েছে পূর্ণতা ও স্থায়িত্ব। নদী সেখানে খাদ্য, পানীয়, প্রশান্তি ও আনন্দের সঙ্গে যুক্ত।
মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘যারা ইমান আনে এবং সৎকর্ম করে তাদের সুসংবাদ দিন, তাদের জন্য আছে জান্নাত, যার তলদেশে নদীগুলো প্রবাহিত। তাদের যখনই ফলমূল খেতে দেওয়া হবে, তখনই তারা বলবে, পূর্বে জীবিকা হিসেবে আমাদের যা দেওয়া হতো, এ তো তারই মতো। একই রকম ফল তাদের দেওয়া হবে এবং সেখানে রয়েছে তাদের জন্য পবিত্র সঙ্গিনী, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে।’ (সুরা বাকারা ২৫)
নদী এখানে জান্নাতের সামগ্রিক নেয়ামতের একটি অংশ হিসেবে এসেছে। ফলমূল, পবিত্র সঙ্গিনী এবং চিরস্থায়ী জীবনের পাশাপাশি নদীর প্রবাহ জান্নাতের সৌন্দর্য ও নেয়ামতের চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে।
মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘আপনি বলুন, আমি কি তোমাদের এসব হতেও অতি উত্তম কোনো কিছুর সংবাদ দেব? যারা মুত্তাকি তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে এমন বেহেশত রয়েছে, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত, তারা তাতে চিরকাল থাকবে। আর সেখানে রয়েছে পবিত্র সঙ্গিনী এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি।’ (সুরা আলে ইমরান ১৫)
মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘যারা ইমান আনে এবং নেক আমল করে তাদের জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তারা তাতে তাদের রবের অনুমতিক্রমে স্থায়ী হবে। সেখানে তাদের শান্তির বার্তা দিয়ে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হবে।’ (সুরা ইবরাহিম ২৩)
মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘তাদের জন্য আছে স্থায়ী জান্নাত, যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত। সেখানে তাদের অলংকৃত করা হবে স্বর্ণ-কংকণে। সূক্ষ্ম ও গাঢ় রেশমের সবুজ পোশাক তারা পরিধান করবে। তারা গদি লাগানো উচ্চাসনে হেলান দিয়ে বসবে। কতই না উত্তম পুরস্কার! কতই না উত্তম আশ্রয়স্থল!’ (সুরা কাহাফ ৩১)
মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘যারা ইমান আনে, সৎকাজ করে, আমি তাদের অবশ্যই জান্নাতে সুউচ্চ প্রাসাদে বাসস্থান দেব, যার তলদেশে নদীগুলো প্রবাহিত, তার ভেতরে তারা চিরকাল থাকবে। সৎকর্মশীলদের প্রতিদান কতই না উত্তম!’ (সুরা আনকাবুত ৫৮)
হাদিসের বর্ণনায় নদী : হাদিসেও নদীর বিষয়ে অনেক বর্ণনা এসেছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সাইহান, জাইহান, ফোরাত ও নীল নদ এই সবই জান্নাতের নদীগুলোর অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সহিহ মুসলিম ২৮৩৯) এই হাদিস নদীর সঙ্গে জান্নাতের একটি বিশেষ সম্পর্কের কথা জানায় এবং হাদিসের এই বর্ণনা নদীগুলোর বিশেষ মর্যাদা প্রকাশ করে।
মেরাজের বর্ণনায় নদীর কথা এসেছে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি সিদরাতুল মুনতাহায় উন্নীত হলাম। সেখানে চারটি নদী দেখলাম। দুটি প্রকাশ্য এবং দুটি অভ্যন্তরীণ। প্রকাশ্য দুটি হলো নীল নদ ও ফোরাত। আর অভ্যন্তরীণ দুটি হলো জান্নাতের নদী। আমার সামনে তিনটি পেয়ালা তুলে ধরা হলো। একটি পেয়ালায় দুধ, একটি পেয়ালায় মধু আর একটিতে শরাব ছিল। আমি দুধের পেয়ালাটি গ্রহণ করলাম এবং পান করলাম। তখন আমাকে বলা হলো, আপনি এবং আপনার উম্মত স্বভাবজাত বিষয় গ্রহণ করেছেন।’ (সহিহ বুখারি ৫৬১০)
কাওসার নদীর বর্ণনাও অত্যন্ত বিস্ময়কর। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি জান্নাতে চলছিলাম। হঠাৎ আমার সামনে একটি নদী প্রকাশ পেল। তার দুই তীরে মুক্তার গম্বুজ ছিল। আমি ফেরেশতাকে জিজ্ঞেস করলাম, এটি কী? তিনি বললেন, এটি কাওসার, যা আল্লাহ আপনাকে দান করেছেন।’ (জামে তিরমিজি ৩৩৬০)
দুনিয়ার নদীর সৌন্দর্য ও প্রকৃতি : নদীর সৌন্দর্য ফুটে ওঠে তার চারপাশের প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে। নদীর তীরে কাশফুল দোলে। কাদামাটির গন্ধ আসে। দূরে নৌকা দেখা যায়। মাঝির বৈঠা পানিতে পড়ে। ঢেউ তৈরি হয়। পাখি নদীর ওপর দিয়ে উড়ে যায়। জেলেদের নৌকা ভোরের অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে যায়।
সকালের নদী শান্ত। দুপুরের নদী উজ্জ্বল। বিকেলের নদীতে নামে এক ধরনের শান্ত সৌন্দর্য। সূর্যাস্তের সময় নদীর বুক লালচে হয়ে ওঠে। রাতে চাঁদের রূপালি আলোয় নদীর পানি ঝলমল করে। বর্ষায় নদীর স্রোত বেড়ে যায়। তখন নদী ধারণ করে আরও উচ্ছল রূপ।
এই পরিবর্তনশীল সৌন্দর্যের মধ্যেই নদীর বিশেষ আকর্ষণ। একই নদী প্রতিদিন একই রকম থাকে না। তার রঙ বদলায়। স্রোত বদলায়। তীর বদলায়। ফলে নদী কখনো পুরনো হয় না।
নদীর সঙ্গে মানুষের জীবিকার সম্পর্ক রয়েছে। জেলে নদীতে মাছ ধরে। মাঝি মানুষ পারাপার করে। কৃষক নদীর পানি ব্যবহার করে। ব্যবসায়ী নৌপথে পণ্য বহন করে। চর জেগে উঠলে সেখানে কৃষিকাজ শুরু হয়। নদীর তীরে বাজার ও বন্দর গড়ে ওঠে। নদীকে কেন্দ্র করে অর্থনীতি তৈরি হয়। নদী শুকিয়ে গেলে মানুষের আয় কমে। নৌযান চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। কৃষিতে প্রভাব পড়ে। নদী শুকিয়ে গেলে বা তার প্রবাহ নষ্ট হলে জনপদেও সংকট তৈরি হয়।
বিশ্বের বহু প্রাচীন সভ্যতা নদীকেন্দ্রিক। নদীর তীরে মানুষের বসতি তৈরি হয়েছে। কৃষি বিস্তার লাভ করেছে। বাণিজ্য গড়ে উঠেছে। শহর তৈরি হয়েছে। মানুষের ভাষা, খাদ্য ও সংস্কৃতিতেও নদীর প্রভাব পড়েছে।
নদীর সঙ্গে নৌযানের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। নৌযান নদীর বুক চিরে এগিয়ে যায়। মাঝি বৈঠা চালায়। কখনো বাতাসে পাল ফুলে ওঠে। কখনো ইঞ্জিনের শব্দে নদীর নীরবতা ভাঙে। আর ঘাট হলো মানুষের অপেক্ষার জায়গা। কেউ ঘাটে আসে। কেউ বিদায় নেয়। কেউ প্রিয়জনের অপেক্ষা করে। কেউ নদী পার হয়ে নিজ গন্তব্যের দিকে যায়।
নদীর সবচেয়ে বড় পরিচয় তার প্রবাহ। নদীর জল থেমে থাকে না। মানুষের জীবনও তেমন। শৈশব চলে যায়। যৌবন আসে। মানুষ বদলায়। সম্পর্ক বদলায়। এক সময় পুরনো মানুষগুলো হারিয়ে যায়। কিন্তু সময়ের স্রোত থামে না। নদী জীবনের পাশাপাশি মৃত্যুরও সাক্ষী। নদীতে মানুষ ডুবে যায়। নৌকাডুবি হয়। স্রোতে হারিয়ে যায়। নদীর তীরে শোক নেমে আসে।
নদীর একটি নির্মম রূপ হলো ভাঙন। নদী পলি এনে নতুন জমি তৈরি করে। আবার স্রোতের টানে পুরনো জমি ভেঙে নেয়। মানুষ ঘর হারায়। মানচিত্র থেকে গ্রাম হারায়। মানুষ নতুন জায়গায় চলে যায়। নতুন ঘর তৈরি করে। এই ভাঙনের মধ্যে মানুষের অসহায়ত্ব আছে। আবার আছে বেঁচে থাকার অদম্য চেষ্টা। নদী মানুষকে বারবার নতুন করে শুরু করতে শেখায়।
জান্নাতের নদীর সৌন্দর্য : জান্নাতের সৌন্দর্য মানুষের কল্পনাতীত। সেখানে থাকবে না কোনো দুঃখ, ক্লান্তি কিংবা বিষাদ। চারদিকে বিরাজ করবে অনাবিল শান্তি। সবুজে ঘেরা উদ্যান, মনোরম পরিবেশ, সুস্বাদু ফলমূল এবং নির্মল পানির নদী জান্নাতের সৌন্দর্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে।
জান্নাতের নদীগুলো দুনিয়ার নদীর মতো নয়। দুনিয়ার নদীর পানি কখনো ঘোলা হয়, কখনো দূষিত হয়। নদীর প্রবাহে ভাঙন সৃষ্টি হয়। কখনো নদী শুকিয়ে যায়। কিন্তু জান্নাতের নদীগুলো সম্পূর্ণ নির্মল ও পবিত্র। সেখানে থাকবে না কোনো দূষণ ও দুর্গন্ধ এবং পানির স্বাদ ও গন্ধের কোনো পরিবর্তন হবে না। নদীর প্রবাহ হবে চিরস্থায়ী। জান্নাতিরা ইচ্ছেমতো এসব নদীর পানি পান করবেন এবং আল্লাহর অফুরান নেয়ামত উপভোগ করবেন।
জান্নাতের নদীর সৌন্দর্যের আরেকটি দিক হলো, সেগুলো জান্নাতের উদ্যান ও প্রাসাদের নিচ দিয়ে প্রবাহিত। নদীর পাশে থাকবে সবুজ উদ্যান, ছায়াঘেরা বৃক্ষ এবং নানা ধরনের ফলমূল। সেখানে নদীর নির্মল প্রবাহের সঙ্গে মিশে থাকবে অনন্ত শান্তি।
নদী আল্লাহর অপার কুদরতের নিদর্শন। এর প্রবাহে বেঁচে থাকে প্রকৃতি, সমৃদ্ধ হয় জনপদ, সচল থাকে মানুষের জীবন ও জীবিকা। দুনিয়ার নদী যেমন আল্লাহর নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, তেমনি জান্নাতের নদী মুমিনের হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে চিরস্থায়ী সুখের প্রত্যাশা। নদীর সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি আমাদের উচিত মহান আল্লাহর কুদরত উপলব্ধি করা এবং তার সন্তুষ্টি অর্জনে সচেষ্ট হওয়া। যেন পরকালে তার অনুগ্রহে জান্নাতের নির্মল নদীর তীরে চিরশান্তির জীবন লাভ করতে পারি।