জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘোড়া দিয়ে জমিতে হালচাষের চাহিদা বেড়েই চলেছে। ফলে এ সব গ্রামের বেশকিছু কৃষক অর্থের বিনিময়ে অন্যের জমিতে ঘোড়া দিয়ে হালচাষ ও মই দেওয়ার কাজ স্থায়ী পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
এতে ওই এলাকার কৃষকদের বাড়তি জ্বালানি খরচ সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি ঘোড়া দিয়ে হালচাষে নিয়োজিত কৃষকদের নতুন আয়ের পথ তৈরি হয়েছে। ফলে এসব গ্রামগুলিতে দিন দিন ঘোড়া দিয়ে হালচাষ ও মই দেওয়ার কাজের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রামগুলি হল, তাড়াশ উপজেলার তালম ইউনিয়নের গোস্তা, জন্তিপুর, পাড়িল, লাউতা,হারিসেনা, রোকনপুর, গুল্টা প্রভৃতি।
রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) তাড়াশ উপজেলার তালম ইউনিয়নের গোন্তা গ্রামের কৃষিজমিতে দেখা যায়, ঘোড়া দিয়ে মই দিচ্ছেন কৃষক শফিকুল ইসলাম। কাদামাটির জমিতে ঘোড়াটিকে নিয়ন্ত্রণ করে জমির উঁচু-নিচু অংশ সমান করছিলেন তিনি।
এ বিষয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রায় পাঁচ বছর আগে ২৪ হাজার টাকা দিয়ে ঘোড়াটি কিনেছি। এরপর থেকে বিভিন্ন কৃষকের জমিতে হালচাষ ও মই দেওয়ার কাজে ঘোড়াটি ব্যবহার করছি। বর্তমানে এটিই আমার আয়ের অন্যতম মাধ্যম।
প্রতি বিঘা জমিতে মই দেওয়ার জন্য ২৫০ টাকা করে নেন। দিনে প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে মই দিতে পারেন। এতে দৈনিক তার আয় হয় প্রায় ১ হাজার ২৫০ টাকা। আমন ও বোরো মৌসুমে ঘোড়া দিয়ে জমি হালচাষ করে তিনি প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় করেন। বীজতলা তৈরির কাজেও ঘোড়াটি ব্যবহার করা হয়।
স্থানীয় একাধিক কৃষক জানান, তাড়াশে গরুর জোয়াল-মই এখন প্রায় নেই। কোথাও কোথাও মহিষ দিয়ে মই দেওয়া হলেও প্রয়োজনের সময় ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার পাওয়া যায় না। আবার আধুনিক যন্ত্র দিয়ে চাষ করতে জ্বালানি খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। বেশি দামে জ্বালানি কিনতে কৃষকেরা হিমশিম খাচ্ছে। এ কারণে কম খরচে ঘোড়া দিয়ে হালচাষ ও মই দেওয়ার কাজের দিকে ঝুঁকছেন কৃষকেরা।
কৃষকদের দাবি, ঘোড়া দিয়ে জমিতে হালচাষ ও মই দিলে জমির মাটি ভালোভাবে সমান করা যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী একই জায়গায় কয়েকবার ঘুরানো সম্ভব হয়। ফলে জমির উঁচু-নিচু অংশ ঠিকভাবে সমান হয়। এতে সেচের পানি জমিতে সমান ভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে তালম ইউনিয়নের জন্তিপুর গ্রামের আয়েজ উদ্দিন ফকির বলেন, আগে ঘোড়ার গাড়িতে ধান ও বিভিন্ন মালামাল পরিবহণ করা হোত। এখন ঘোড়া দিয়ে জমিতে হালচাষ ও মই দেওয়ার কাজ শুরু করেছেন তিনি। তাকে দেখে তাঁর নাতি আশরাফুল ইসলামও এ কাজ শুরু করেছেন। তাদের আয় উপার্যনও ভালো হচ্ছে।
এ বিষয়ে আশরাফুল ইসলাম বলেন, প্রায় চার বছর আগে বোরো মৌসুমে তার নানা তাড়াশে ঘোড়া দিয়ে হালচাষ করার পেশা শুরু করেন। পরে আরও কয়েকজন এ কাজকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। তাদের দেখে তিনিও আমন ও বোরো মৌসুমে ঘোড়া দিয়ে অন্যের জমিতে অর্থের বিনিময়ে হালচাষ ও মই দেওয়ার পেশা শুরু করেছেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ বিঘা জমিতে হালচাষ ও মই দেওয়া যায়। প্রতি বিঘায় ২০০ টাকা করে নেওয়া হয়।
তাড়াশের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী নাটোরের সিংড়া ও গুরুদাসপুর উপজেলাতেও কয়েকজন ঘোড়া দিয়ে জমিতে মই ও হালচাষ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
সিংড়া উপজেলার মোখলেছুর রহমান বলেন, শুরুতে ঘোড়ার গাড়িতে মালামাল পরিবহণ করতেন তিনি। পরে আরও একটি ঘোড়া কিনে প্রশিক্ষণ দিয়ে জমি চাষের কাজ শুরু করেছেন। এখন প্রতিদিন তিনি তিন থেকে সাড়ে তিন বিঘা জমি চাষ করতে পারেন। এতে তার আয় হয় প্রায় ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। তবে দুটি ঘোড়ার খাবার বাবদ প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা খরচ হয়।
মোখলেছুর রহমানের দাবি, ঘোড়ার হালচাষে জমি তুলনামূলক ভালোভাবে চাষ হয়। ইরি-বোরো মৌসুমে এ কাজের চাহিদা আরও বেড়ে যায়। তখন আয়ও বেশি হয়। তিনি বলেন, অনেক কৃষক এখন পাওয়ার টিলারের পরিবর্তে ঘোড়ার হাল দিয়ে জমি চাষ করাচ্ছেন।
কৃষক হযরত আলী বলেন, এলাকায় গরুর হাল নেই। আবার প্রয়োজনের সময় পাওয়ার টিলারও পাওয়া যায় না। তাই কম খরচে ঘোড়ার হাল দিয়ে জমি চাষ করাচ্ছেন তারা।
ট্রাক্টর চালক সেরাজুল ইসলাম বলেন, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় জমি চাষের খরচও আগের তুলনায় বেড়েছে। এতে বিঘাপ্রতি চাষাবাদে কৃষকদের বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। ফলে খরচ কমাতে অনেক কৃষক ট্রাক্টরের পরিবর্তে ঘোড়া দিয়ে জমি চাষ করাচ্ছেন। ঘোড়া দিয়ে চাষে জ্বালানি খরচ লাগেনা। আবার ব্যয় তুলনামূলক কম হয়।
তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা বলেন, আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহারের কারণে বর্তমানে ঘোড়া দিয়ে জমি চাষের ঘটনা সচরাচর দেখা যায় না। তবে প্রয়োজন ও বাড়তি আয়ের জন্য তাড়াশ উপজেলার কিছু কৃষক ঘোড়া দিয়ে জমি চাষ ও মই দেওয়ার কাজ করছেন। কৃষি বিভাগ কৃষকদের আধুনিক ও উন্নত কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকে।
ট্রাক্টর-পাওয়ার টিলারের যুগে তাড়াশের মাঠে ঘোড়ার হালচাষ যেন পুরোনো দিনের কৃষি চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। সেই পুরোনো পদ্ধতি এখন কয়েকজনের জীবিকার পাশাপাশি এ এলাকায় কম খরচে চাষাবাদের বিকল্প হয়ে উঠেছে।