বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও লাভজনক ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে হলিউড। কিন্ত প্রশ্ন উঠেছে হলিউডের পরের অবস্থা কোনটির? অনেকেই কোনো রকম চিন্তা-ভাবনা না করেই বলিউডের নাম বলে ফেলেন। আসলেই কি তাই! না, হলিউডের পরের অবস্থান এখন নলিউডের। এখন আফ্রিকার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম শক্তিশালী বাহক। শুধু তাই নয়, সিনেমা নির্মাণের সংখ্যার বিচারে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চলচ্চিত্রশিল্পও এখন নাইজেরিয়ার। ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অ্যামিনিস্ট্রেশন-এর তথ্যমতে, প্রতি বছর আড়াই হাজারের বেশি সিনেমা নির্মিত হয় দেশটিতে! তালিকায় তারা ভারতের ঠিক পেছনেই। নাইজেরিয়ার বিনিয়োগ উন্নয়ন কমিশনের হিসাবে দেশটির ক্রিয়েটিভ ইকোনমির মূল্য প্রায় ৬.৪ বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ নলিউড। একই সূত্রে জানা যায়, বিনোদন খাতের প্রবৃদ্ধি বছরে প্রায় ৮.৮ শতাংশ।
নাইজেরিয়ান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তথা নলিউডের শক্তির জায়গাটি শুরু থেকেই ছিল এর গতি ও দর্শক বোঝার ক্ষমতা। ১৯৯২ সালে ‘লিভিং ইন বন্ডেজ’ সিনেমার সাফল্যকে আধুনিক নলিউডের অন্যতম সূচনাবিন্দু হিসাবে ধরা হয়। এরপর ডিজিটাল ক্যামেরা, সস্তা নির্মাণপ্রযুক্তি এবং ভিডিওভিত্তিক বিতরণব্যবস্থা পুরো শিল্পকে বদলে দেয়। একসময় সপ্তাহে প্রায় ৫০টি পর্যন্ত সিনেমা নির্মাণ হতো। বছরে ২ হাজার ৫০০-এর বেশি সিনেমা তৈরির এ বিশাল উৎপাদনক্ষমতাই নলিউডকে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ফিল্ম সেন্টারে পরিণত করেছে। তবে ‘বেশি সিনেমা’ মানেই ‘ভালো সিনেমা’-এ সমীকরণ নলিউডের ক্ষেত্রে সবসময় কাজ করেনি। দ্রুত মুনাফার জন্য কম বাজেটে তাড়াহুড়া করে সিনেমা বানানোর প্রবণতা ছিল দীর্ঘদিন। গল্পে পুনরাবৃত্তি, সীমিত লোকেশন, দুর্বল প্রযুক্তি এবং পাইরেসির মতো সমস্যা শিল্পটির বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইউনেসকোর বিশ্লেষণেও নলিউডের দ্রুত বিস্তারের পাশাপাশি অর্থায়ন, অবকাঠামো ও বিতরণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে।
কিন্তু গত এক দশকে চিত্রটি দ্রুত বদলেছে। উন্নত ক্যামেরা, পোস্ট-প্রোডাকশন, আন্তর্জাতিক মানের চিত্রনাট্য এবং পেশাদার প্রযোজনার ফলে নলিউডের সিনেমা এখন শুধু নাইজেরিয়ার দর্শকের জন্য তৈরি হচ্ছে না। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে শুরু করে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত আফ্রিকান প্রবাসীদের কাছেও এসব সিনেমার বড় দর্শকগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় অনুঘটক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম। নেটফ্লিক্স নাইজেরিয়ার স্থানীয় কনটেন্টে বিনিয়োগ করে নলিউডকে আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও-ও নাইজেরিয়ার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করেছে। ফলে স্থানীয় গল্প, অভিনেতা ও নির্মাতারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দর্শকের কাছে পৌঁছানোর নতুন পথ পেয়েছেন।
তবে স্ট্রিমিংয়ের গল্পটিও এখন নতুন মোড় নিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নেটফ্লিক্স ও অ্যামাজন প্রাইম আফ্রিকায় নিজেদের অরিজিনাল কনটেন্ট বিনিয়োগ ও কার্যক্রম কিছুটা কমিয়েছে। ২০২৪ সালে অ্যামাজন প্রাইম আফ্রিকায় তাদের কর্মীসংখ্যা কমানোর পাশাপাশি অরিজিনাল কনটেন্ট অধিগ্রহণও সংকুচিত করে। নেটফ্লিক্সও নাইজেরিয়ার অরিজিনাল কনটেন্ট গ্রহণের গতি কমিয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যায় এর পেছনে মূল কারণ লাভজনকতা। তাহলে কি নলিউডের উত্থান থেমে গেছে? বরং তার বিপরীত চিত্রই দেখা যাচ্ছে। স্ট্রিমিং জায়ান্টদের কিছুটা পশ্চাদপসরণের জায়গা দখল করছে ইউটিউব ও স্থানীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। ২০২৫ সালে ‘লাভ ইন এভরি ওয়ার্ড’ সিনেমাটি ইউটিউবে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ১০ লাখ এবং তিন দিনে ৫০ লাখ ভিউ অতিক্রম করে। ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, নলিউডের দর্শক এখন কেবল সিনেমা হল বা বড় স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল নয়।
সিনেমাহলের বাজারও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের নাইজেরিয়া বক্স অফিস ইয়ারবুক অনুযায়ী, দেশটিতে সিনেমাহলের সংখ্যা ২০২৪ সালের ১০৭টি থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ১২২টিতে দাঁড়িয়েছে। পর্দার সংখ্যা হয়েছে ৩৬৯। ২০২৫ সালে মোট ২৪৮টি সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় এবং মোট দর্শকসংখ্যা ছিল প্রায় ২৭ লাখ ৯৫ হাজার। একই বছরে মোট বক্স অফিস আয় দাঁড়ায় প্রায় ১৫.৬ বিলিয়ন নাইরা। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্থানীয় সিনেমার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের নাইজেরিয়া বিষয়ক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে নাইজেরিয়ার মিডিয়া ও বিনোদন খাত-সংগীতসহ-দেশটির জিডিপিতে প্রায় ১.৯৭ ট্রিলিয়ন নাইরা বা ১.৪ বিলিয়ন ডলার অবদান রেখেছে। ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে নলিউডের বক্স অফিস আয় ৫ বিলিয়ন নাইরা ছাড়ায় এবং মোট বক্স অফিস আয়ের ৫৬ শতাংশ আসে স্থানীয় সিনেমা থেকে।