ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ের কারণে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে ভারতে ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে; আর নেপালে ১৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন, নিখোঁজ রয়েছেন আরও ১১ জন। গতকাল সোমবার উত্তরপ্রদেশের রাজ্য সরকারের ত্রাণ কমিশনারের দপ্তর থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে এ তথ্য। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, উত্তরপ্রদেশের ৭৫টি জেলার মধ্যে ৬৩টিতে স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। বিবৃতির তথ্য অনুসারে, রাজ্যজুড়ে ২০০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ১৯ গুণ বেশি। ত্রাণ কমিশনার হৃষিকেশ ভাস্কর যশোদা জানান, ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারতের সবচেয়ে জনবহুল এই রাজ্যে ৬৬.৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই সময়ে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৭.৬ মিলিমিটার।
গত ৪৮ ঘণ্টায় উত্তরপ্রদেশের আমেথি, বাহরাইচ, বান্দা, বারাবাঙ্কি, বাস্তি, ফতেহপুর, হামিরপুর, হারদোই এবং কানপুর জেলা থেকে একজন করে, অযোধ্যায় দুজন এবং লখিমপুর খেরিতে চারজনের মৃতুর খবর পাওয়া গেছে বলা হয়েছে ত্রাণ কমিশনারের বিবৃতিতে। কৃষকরা জানিয়েছেন, ভারী বৃষ্টিপাতের জেরে মাঠে থাকা ফসল তলিয়ে গেছে। কর্র্তৃপক্ষ জলমগ্ন এলাকাগুলোতে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে এবং ত্রাণ বিতরণ করছে। ভারতের সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশন জানিয়েছে, সাতটি রাজ্যের ৩০টি নদী-পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ‘গুরুতর পরিস্থিতি’ নির্দেশ করছে। এ ছাড়া ফসলের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে ক্ষতিপূরণ দিতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের জনসংখ্যা ২৪ কোটির বেশি। প্রতি বছর জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষাকালে রাজ্যটিতে প্রায়ই ভারী বৃষ্টি ও বজ্রঝড় হয়।
উত্তরপ্রদেশের মতো ঝড়বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত ওড়িশা রাজ্যও। গত ৪৮ ঘণ্টায় ওড়িশায় দুর্যোগের কারণে ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৪০ হাজার মানুষকে নিরাপদে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। ঝড়বৃষ্টির প্রভাবে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ওড়িশার দক্ষিণ প্রান্ত। ওড়িশার রাজ্য সরকার জানিয়েছে, অতি বৃষ্টির কারণে কয়েক হাজার হেক্টর ফসলি জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। ছত্তিশগড়েও প্রবল বর্ষণ হয়েছে। প্রশাসনিক কর্তারা জানিয়েছেন, বৃষ্টির কারণে আটটি জেলায় স্কুল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে নেপালের কর্র্তৃপক্ষ দেশের ৭৭ জেলার মধ্যে ৪৯টিতে আকস্মিক বন্যার সম্ভাবনার বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। প্রধান নদী ও উপনদীগুলোতে পানি বাড়তে থাকায় দেশটির অর্ধেকেরও বেশি জেলায় প্রবল বন্যা বা আকস্মিক বন্যার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। জ¦ালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন মানাং, মুস্তাং, ম্যাংদি ও বাগলুং জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কর্র্তৃপক্ষ বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরুদ্ধারে কাজ করছে। গতকাল সোমবারও গঙ্গা, গণ্ডক, কোশী, বাগমতী ও নর্মদাসহ বেশ কয়েকটি প্রধান নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
বাংলাদেশিদের নেপালে ভ্রমণে সতর্কতা : ভারী বৃষ্টিপাত, বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত নেপালের কয়েকটি এলাকায় বাংলাদেশিদের ভ্রমণের ক্ষেত্রে সাময়িক ভ্রমণ সতর্কতা দিয়েছে কাঠমান্ডুস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস। গতকাল সোমবার ভ্রমণ সতর্কতায় বলা হয়, ‘সব বাংলাদেশি পর্যটক ও ট্রেকারদের নেপালে চলমান ভারী বৃষ্টিপাত, বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ভ্রমণে সতর্ক থাকতে এবং আবহাওয়া ও সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি বিবেচনায় ভ্রমণে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছে দূতাবাস।’ সতর্কবার্তায় বিশেষত পিসাং, চামে, মানাং ও আশপাশের পর্যটন এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে দূতাবাস বলেছে, ‘অব্যাহত বৃষ্টিপাতের কারণে ভূমিধস এবং তুষারপাতের ফলে অনেক স্থানে সড়ক যোগাযোগে বিঘিœত হয়েছে। দুর্গম ভূপ্রকৃতি ও যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় উদ্ধার কার্যক্রম কঠিন হয়ে পড়েছে।’
বাংলাদেশের দূতাবাস বলেছে, কর্র্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে মানাংয়ের বিভিন্ন এলাকায় ট্রেকিং স্থগিত করেছে। এর মধ্যে তিলিচো লেক, থরং লা পাস, আইস লেক, কাংলা ও ভীমথাং উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া ভূমিধসের কারণে সড়ক যোগাযোগ এবং নিকটবর্তী ট্রেকিং গন্তব্যে যাতায়াত ব্যাহত হওয়ায় পোখারা ও আশপাশের এলাকা ভ্রমণেও সতর্কতা অবলম্বন করার আহ্বান জানানো যাচ্ছে। মুস্তাং, জমসম এবং অন্যান্য পার্বত্য এলাকার ভ্রমণের আগে গান্দাকি প্রদেশের বিভিন্ন সড়ক যোগাযোগ সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত থাকা প্রয়োজন, কেননা এসব সড়ক ব্যবস্থা তাৎক্ষণিক বিঘিœত হতে পারে।
এ ছাড়া অন্নপূর্ণা, মানাং, মুস্তাং ও মানাসলু অঞ্চলসহ পার্বত্য ও ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় ট্রেকিং, পর্বতারোহন এবং ভ্রমণের পরিকল্পনা করার আগে সব তথ্য যাচাই করা এবং নেপাল সরকার ও স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষের জারি করা নির্দেশনা অনুসরণ করতে বাংলাদেশি পর্যটকদের পরামর্শ দিয়েছে দূতাবাস। তবে দূতাবাস ভাষ্য অনুযায়ী, এ ভ্রমণ সতর্কতা সাময়িক এবং কাঠমান্ডু ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা এ সতর্কতার আওতামুক্ত।