অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক পরিশ্রমের অভাবে বিপদ

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৫ এএম

সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ক্রমবর্ধমান হৃদরোগ স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ৯২ লাখ মানুষ কার্ডিওভাসকুলার রোগে আক্রান্ত হন, যার প্রায় ৮৫ শতাংশ ঘটনাই হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের মতো জটিলতা। উদ্বেগের বিষয় হলো, কর্মক্ষেত্রের অতিরিক্ত মানসিক চাপ, কায়িক পরিশ্রমের অভাব এবং অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের দরুন দেশের তরুণরাও এখন মারাত্মক ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, সচেতনতা ও জীবনযাত্রার ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে হৃদরোগ অনেকাংশে প্রতিরোধযোগ্য। সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট শারীরিক পরিশ্রম করা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং ক্ষতিকর অভ্যাস বর্জন করে নিজের হৃদয়কে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। বিশ্ব হৃদরোগ দিবস উপলক্ষে সময়মতো স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে সবাই মিলে একটি হৃদরোগমুক্ত ও সুস্থ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটালের কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী কনসালট্যান্ট ডা. দেবাশীষ দেবনাথ।

দেশ রূপান্তর : বর্তমানে দেশে হৃদরোগের পরিস্থিতি কেমন?

ডা. দেবাশীষ দেবনাথ : বাংলাদেশে তথা সারা বিশ্বে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে। সারা বিশে^ প্রায় ১ কোটি ৯২ লাখ মানুষ কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজে আক্রান্ত হচ্ছে। এর মধ্যে ৮৫ শতাংশ করোনারি আর্টারি ডিজিজ, যেটাকে আমরা হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক রোগ বলি। তো এর মধ্যে বাংলাদেশে ও এশিয়ার দেশগুলোতে হৃদরোগের ঝুঁকি দিনে দিনে শুধু বাড়ছেই।

দেশ রূপান্তর : একজন ব্যক্তি কীভাবে হৃদরোগ না হওয়ার চেষ্টা করতে পারে?

ডা. দেবাশীষ দেবনাথ: নিকটাত্মীয় ও বন্ধু-বান্ধবের হার্ট অ্যাটাক করলে আমরা খুব চিন্তিত হয়ে যাই। তখন নিজের হার্টের কী অবস্থা, এটা বুঝতে অনেকে তড়িঘড়ি চিকিৎসকের কাছে আসেন। হয়তো তার নন-স্পেসিফিক কিছু চেস্ট পেইন হয়। হয়তো সে পরিচিত কাউকে দেখেছে, তার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। তারপরও তার সচেতনতার জন্য তাকে হৃদরোগের বিষয়ে সচেতন করি। ধরা যাক, এই মুহূর্তে আপনার হার্টের কোনো রোগ নেই, আপনি এখন ভালো আছেন। কিন্তু আপনি পরবর্তী সময়ে কী করলে ভালো থাকবেন? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডেটা অনুযায়ী, নিষ্ক্রিয় (ইনঅ্যাক্টিভ) মানুষদের মধ্যে প্রায় ২০ থেকে ৩০ ভাগের হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব শুধু সচল থাকার মাধ্যমে। এ বিষয়ে যদি সচেতনতা তৈরি না হয়, তাহলে হৃদরোগের ঝুঁকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে, কোনোভাবেই কমার সম্ভাবনা নেই।

দেশ রূপান্তর : হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে প্রাথমিকভাবে কী লক্ষণ দেখা যেতে পারে?

ডা. দেবাশীষ দেবনাথ : সবাই হৃদরোগ বলতে চিন্তা করে হার্ট অ্যাটাক। কিন্তু অ্যাটাক হওয়ার আগেও কিছু কিছু লক্ষণ মানুষের হতে পারে। যখন হৃদরোগ শুরু হয়, তখন মানুষের বুকে ব্যথা থাকে, যা দিনে দিনে বাড়তে থাকে। এটা একটা প্রোগ্রেসিভ ডিজিজ। এই বিষয়গুলো যখন আমরা গুরুত্ব না দিই, তখনই ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে হার্ট অ্যাটাকের দিকে যায়। বড় কোনো বিপদ হওয়ার আগে সৃষ্টিকর্তা আপনাকে ছোট ছোট ইশারা দেবেন। ইশারা যে বুঝলেন সে বুদ্ধিমানের কাজ করলেন। আর ইশারা বুঝতে না পারলে বড় বিপদের সম্মুখীন হতে হবে।

দেশ রূপান্তর : হৃদরোগের চিকিৎসা ব্যয়বহুল। সাধারণ মানুষ কীভাবে চিকিৎসা পেতে পারেন?

ডা. দেবাশীষ দেবনাথ : এটা ঠিক, হৃদরোগের চিকিৎসাটা কিছুটা ব্যয়বহুল। তবে অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের দেশে হৃদরোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো এখন অনেকটাই সাধ্যের মধ্যে চলে এসেছে। একটা সময় ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাম বা ইটিটি করার জন্য চট্টগ্রাম বা দূরদূরান্ত থেকে ঢাকায় আসতে হতো, মেশিনের অনেক দাম ছিল। এখন এই মেশিনগুলো সহজলভ্য হওয়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাম ও ইটিটি (ট্রেডমিল) মেশিন আছে। সরকারও এ বিষয়ে অনেক এগিয়ে এসেছে। আগে যেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা ২ থেকে ৩ লাখ টাকা ছিল, এখন ভালো মানের সেই সুবিধা ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এটা কিছুটা খরচের মনে হলেও মানুষের সাধ্যের তেমন বাইরে নয়। আমাদের হসপিটালে তো খরচের বিষয়ে বেশ সহনশীল, আমরা ফ্রি বেড থেকে শুরু করে ওয়ার্ড, কেবিন সর্বস্তরের মানুষের কথা বিবেচনা করে সাজিয়েছি।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যাবে না, বাইরে যেতে হবে এই ধারণাকে চিকিৎসক হিসেবে আপনি কীভাবে দেখেন?

ডা. দেবাশীষ দেবনাথ : রোগীদের যতটুকু কাউন্সেলিং করি ও সময় দিয়ে বুঝেছি, আমার রোগীদের খুব কম সংখ্যকই মনে করেন যে, দেশে ভালো চিকিৎসা হয় না। মূল ব্যারিয়ারটা হলো রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যকার কাউন্সেলিং। আমি যদি রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দিয়ে রোগের গতিপ্রকৃতি ও করণীয় বুঝিয়ে বলতে পারি, তবে বাইরে রোগী চলে যাওয়া অনেকাংশে কমানো সম্ভব। সবাই শহরকেন্দ্রিক হতে চায়, এতে রোগী ও চিকিৎসকের অপ্রতুলতা থেকে যায়। চেম্বারের বাইরে ১০ জন রোগী থাকলে যেভাবে কাউন্সেলিং করা যায়, ৪০ থেকে ৫০ জন থাকলে সেই সময়টা কমে যায়। এই জায়গাটায় নজর দিলে আরও ভালো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। আরেকটি বিষয় বলব, দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে গেলে বেশ ভোগান্তিও নিতে হয়, সঙ্গে কাউকে যেতে হয়, তাদের থাকা খাওয়া, এসব হ্যাসেল থেকে দেশে আমাদের মতো হসপিটালে চিকিৎসা নেওয়া সহজ ও সাশ্রয়ী বলে আমি মনে করি।

দেশ রূপান্তর : হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখতে কী করণীয়?

ডা. দেবাশীষ দেবনাথ : বিশ্বব্যাপী শারীরিকভাবে সচল থাকার কথা বলা হচ্ছে। তাই জীবনযাপন পদ্ধতি বদলাতে হবে। সপ্তাহে অন্তত ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট শরীরচর্চা করা উচিত। আর কঠোর এক্সারসাইজ করলে সপ্তাহে ৭৫ মিনিটই যথেষ্ট। বিশ্বে কার্ডিওভাসকুলার রোগে আক্রান্তদের প্রায় ৩১ শতাংশ ইনঅ্যাক্টিভ থাকে; তাদের অ্যাক্টিভিটির মধ্যে আনলে ২০-৩০ শতাংশ হার্ট অ্যাটাক কমানো সম্ভব।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশে হৃদরোগের সবচেয়ে বড় তিনটি ঝুঁকি কী?

ডা. দেবাশীষ দেবনাথ : প্রথমত, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা। দ্বিতীয়ত, অনিয়ন্ত্রিত বা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং তৃতীয়ত, ক্রনিক ডিজিজ ডায়াবেটিস ও হাই ব্লাড প্রেশার সম্পর্কে সচেতন না হওয়া ও তা নিয়ন্ত্রণে না রাখা। এগুলোতে সচেতন থাকলে এবং নিয়ন্ত্রণে রাখলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

দেশ রূপান্তর : তরুণদের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ার বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

ডা. দেবাশীষ দেবনাথ : আজকাল ২০ থেকে ২২ বছরের তরুণদের মধ্যেও হার্ট অ্যাটাক প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে, যা খুবই অ্যালার্মিং। এর পেছনে পারিবারিক বা জেনেটিক কারণ তো আছেই, পাশাপাশি মানসিক চাপ, মাদক, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও পরিশ্রমবিমুখ থাকা দায়ী। আমরা ক্যারিয়ার ও অর্থ উপার্জনে এত ব্যস্ত থাকি যে, স্বাস্থ্য খোয়াই; অথচ দিন শেষে স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে গাড়ি-বাড়ি কিছুই ভোগ করা যাবে না। তাই প্রতিটি সেক্টরে নজর দিয়ে ঝুঁকি কমাতে হবে।

দেশ রূপান্তর : কোন বয়সে এই ঝুঁকি মারাত্মক?

ডা. দেবাশীষ দেবনাথ : ৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়সের মধ্যে এই ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে। কারণ ২৫ বছরে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে মানুষ চরম স্ট্রেসের মধ্য দিয়ে যায় এবং নিষ্ক্রিয় থাকে, যার ফলে ৩৫ থেকে ৪০ বছরে ঝুঁকি বাড়ে।

দেশ রূপান্তর : চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সরকারের করণীয় কী?

ডা. দেবাশীষ দেবনাথ : সরকার স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে এসেছে। এখন বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে স্ট্যান্টিং, বাইপাস সার্জারি ও সব ইনভেস্টিগেশন হচ্ছে; আগে যা ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে খেলার মাঠগুলো খেলার উপযোগী করা, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে বাচ্চারা খেলাধুলা ও শারীরিক সক্রিয়তার মধ্যে থাকতে পারে।

দেশ রূপান্তর : নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে হৃদরোগের ঝুঁকির তারতম্য কেমন?

ডা. দেবাশীষ দেবনাথ : মহিলাদের শরীরে এস্ট্রোজেন নামক হরমোন থাকে, যা ৪৫ থেকে ৪৮ বছর বয়স (মেনোপজের আগে) পর্যন্ত তাদের হার্টকে প্রটেকশন দেয়। কিন্তু মেনোপজের পর বা ৫০ বছরের পরে হরমোন কমে গেলে নারীদের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। অন্যদিকে পুরুষরা কম বয়স থেকে স্ট্রেসফুল লাইফ ও নিষ্ক্রিয়তার মধ্য দিয়ে গেলে কম বয়সেই হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

দেশ রূপান্তর : পারিবারিক বা বংশগত হিস্ট্রি থাকলে করণীয় কী?

ডা. দেবাশীষ দেবনাথ : ফ্যামিলি হিস্ট্রি থাকলে আরও বেশি সচেতন হতে হবে। বাবা-মায়ের ৫০ বছর বয়সে হৃদরোগ হলে সন্তানদের আরও আগেই হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই অল্প বয়স থেকেই শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ানো, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা এবং রোগ সচেতন হওয়া জরুরি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত