প্রতিদিন হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত প্রায় ৫০০ জন

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৯ এএম

বিশ্ব হার্ট দিবস আজ ২৯ সেপ্টেম্বর। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘একটি স্পন্দনও যেন মিস না হয়’। বিশ্বজুড়ে হৃদরোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে দিবসটি পালিত হয়। বাংলাদেশেও হৃদরোগ এখন মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ। এ প্রেক্ষাপটে হৃদরোগ প্রতিরোধ, চিকিৎসা, জন্মগত হৃদরোগ এবং দেশের চিকিৎসা অবকাঠামো নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ উল্লাহ।

দেশ রূপান্তর: বিশ্ব হার্ট দিবসের মূল উদ্দেশ্য কী? এবারের প্রতিপাদ্যের তাৎপর্য কী?

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ উল্লাহ : বিশ্ব হার্ট দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো হৃদরোগ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা। এবার এ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘একটি স্পন্দনও যেন মিস না হয়’এর অর্থ হলো, হৃদরোগের ঝুঁকি, লক্ষণ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে মানুষকে এমনভাবে সচেতন করা, যাতে একটি জীবনও অকালে হারিয়ে না যায়।

পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি মানুষ কার্ডিওভাসকুলার রোগে মারা যায়। বাংলাদেশেও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মৃত্যুর ৩২ শতাংশ কারণ হচ্ছে এই হৃদরোগ। তাই প্রতিরোধ, সময়মতো রোগ শনাক্ত করা এবং সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করাই বিশ্ব হার্ট দিবসের প্রধান লক্ষ্য।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কেন বাড়ছে?

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ উল্লাহ : হার্ট অ্যাটাক বা ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজের পেছনে কয়েকটি বড় ঝুঁকির কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, স্থূলতা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে একটি বিশেষ বাস্তবতা হলো পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় আমাদের মানুষের প্রায় ১০ বছর কম বয়সে হার্ট অ্যাটাক হয়। সেখানে সাধারণত ৬০ বছরের পর হার্ট অ্যাটাক বেশি দেখা যায়। কিন্তু আমাদের দেশে ৫০ বছর বয়স থেকেই এর প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। অনেক ক্ষেত্রে আরও কম বয়সী মানুষও আক্রান্ত হচ্ছেন। তাই তরুণ বয়স থেকেই সচেতনতা তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে ধূমপান বন্ধে আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, বিড়ি-সিগারেটের খুচরা বিক্রি বন্ধ করা এবং জনসমক্ষে ধূমপান রোধে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি।

দেশ রূপান্তর : হৃদরোগ প্রতিরোধে সাধারণ মানুষ কী করতে পারেন?

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ উল্লাহ : হৃদরোগের বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য। কয়েকটি বিষয় নিয়মিত অনুসরণ করলে ঝুঁকি অনেক কমানো সম্ভব। প্রথমত, সবাইকে নিয়মিত রক্তচাপ মাপতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ থাকলে ওষুধ নিয়মিত খেতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে সরকার বিনামূল্যে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ দিচ্ছে। মানুষকে এ সেবা গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ডায়াবেটিস সময়মতো শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বর্তমানে উপজেলা পর্যায়ের এনসিডি কর্নারে ডায়াবেটিসের প্রাথমিক চিকিৎসা ও কিছু ওষুধ পাওয়া যায়। এ ছাড়া নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, লবণ কম খাওয়া, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা এবং ধূমপান সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : যাদের হার্ট অ্যাটাক হয়, তাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী?

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ উল্লাহ : সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সময় নষ্ট না করা। হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে এবং বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা নিতে হবে। বর্তমানে জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং জাতীয় পর্যায়ের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসার সক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। প্রয়োজন হলে এনজিওপ্লাস্টি, স্টেন্ট বসানো কিংবা বাইপাস সার্জারিও করতে হবে। চিকিৎসা দেরি করলে হৃদযন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

দেশ রূপান্তর : হার্ট অ্যাটাক ছাড়াও কোন হৃদরোগগুলো এখন বেশি উদ্বেগের?

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ উল্লাহ : হার্ট ফেইলিউর এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সমস্যা। হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা কমে গেলে রোগী দ্রুত জটিল অবস্থায় চলে যেতে পারেন। সময়মতো রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তাই হার্ট ফেইলিউরকে অবহেলা করা যাবে না। দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : জন্মগত হৃদরোগ নিয়ে পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক?

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ উল্লাহ : বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার শিশু জন্মগত হৃদরোগ নিয়ে জন্মায়। কিন্তু তাদের বড় অংশ সময়মতো শনাক্ত হয় না। প্রতি বছর মাত্র ৪ থেকে ৫ হাজার শিশুর জন্মগত হৃদরোগের অস্ত্রোপচার বা ইন্টারভেনশন হয়। অর্থাৎ বিপুল শিশু প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছে। যদি জন্মের পরপরই বা স্কুলে যাওয়ার আগেই রোগ শনাক্ত করা যায়, তাহলে অধিকাংশ শিশুই চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। সে ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

দেশ রূপান্তর : জন্মগত হৃদরোগের লক্ষণ কী? অভিভাবকরা কীভাবে বুঝবেন?

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ উল্লাহ : জন্মের পর কোনো শিশুর শ্বাসকষ্ট হলে, শরীর নীলচে হয়ে গেলে, কান্নার সময় অজ্ঞান হওয়ার মতো অবস্থা হলে বা খাওয়াতে সমস্যা হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। আসলে প্রতিটি নবজাতকের জন্মের পর জন্মগত হৃদরোগ আছে কি না, সেটি পরীক্ষা করা উচিত। আমাদের দেশের প্রসূতিবিদ, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা এই পরীক্ষা করেন, তবে এটিকে আরও বিস্তৃত ও নিয়মিত করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : আপনি বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলছেন। কী ধরনের বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন?

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ উল্লাহ : বর্তমানে পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি ও পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সার্জারির বেশিরভাগ সেবা ঢাকাকেন্দ্রিক। এটি ধাপে ধাপে বিভাগীয় শহর এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সম্প্রসারণ করতে হবে। সরকার নয়টি বিভাগীয় শহরে বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ করছে। সেখানে কার্ডিওলজি, কার্ডিয়াক সার্জারি এবং পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজির সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো চালু হলে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয় শ্রেণির রোগী বিভাগীয় পর্যায়েই উন্নত চিকিৎসা পাবেন।

দেশ রূপান্তর : দেশে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসা অবকাঠামো কি পর্যাপ্ত?

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ উল্লাহ : না, এখনো পর্যাপ্ত নয়। হৃদরোগীর সংখ্যার তুলনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, কার্ডিয়াক সার্জন, প্রশিক্ষিত নার্স ও প্যারামেডিক্সের ঘাটতি রয়েছে। সব জেলা হাসপাতালে এখনো আইসিইউ, সিসিইউ বা ক্যাথল্যাব সুবিধা নেই। যদিও আগের তুলনায় অনেক উন্নতি হয়েছে, তবু পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি ও কার্ডিয়াক সার্জারির জনবল এখনো খুব সীমিত এবং ঢাকাকেন্দ্রিক। সরকারকে চিকিৎসক, নার্স ও প্রযুক্তিবিদ নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ আরও বাড়াতে হবে।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় কোন ধরনের হৃদরোগ?

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ উল্লাহ : সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ, অর্থাৎ হার্ট অ্যাটাকজনিত হৃদরোগ। এর পরেই রয়েছে হার্ট ফেইলিউর। আগে বাতজ¦রজনিত হার্ট ভাল্বের রোগ অনেক বেশি ছিল। এখন এর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, এটিকে আমরা জনস্বাস্থ্যের একটি ইতিবাচক সাফল্য বলতে পারি।

দেশ রূপান্তর : দেশে প্রতি বছর বা প্রতিদিন কত মানুষ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন?

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ উল্লাহ : আমাদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষ হার্ট ফেইলিউরে ভুগছেন। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ থেকে ২ শতাংশ এই রোগে আক্রান্ত। আর ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ বা হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে গড় হিসেবে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মানুষ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি সংখ্যা।

দেশ রূপান্তর : ঢাকায় সবাইকে আনা সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে করণীয় কী?

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ উল্লাহ : এ কারণেই চিকিৎসার বিকেন্দ্রীকরণ অত্যন্ত জরুরি। প্রতিটি জেলা হাসপাতালে সিসিইউ চালু করতে হবে। দেশের প্রায় ৪০টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ কার্ডিওলজি সেবা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতকেও জেলা পর্যায়ে কার্ডিয়াক সেন্টার গড়ে তুলতে উৎসাহিত করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ একসঙ্গে এগোলে হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত