দেশে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী মানুষ হৃদরোগে তুলনামূলকভাবে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। এই হার ক্রমশ বাড়ছে। গবেষণার তথ্য বলছে, কম বয়সীদের আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ধূমপান ও পারিবারিক হৃদরোগের ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে বয়স বাড়ার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরলের সমস্যা এবং একাধিক করোনারি রক্তনালিতে রোগের প্রবণতা বাড়তে দেখা গেছে।
চলতি বছরের ৩০ মার্চ রংপুর মেডিকেল কলেজ জার্নালে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তীব্র হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চিকিৎসা নেওয়া ১৬০ জন রোগীকে গবেষণার আওতায় আনা হয়। এর মধ্যে ৮০ রোগীর বয়স ছিল ৩০ বছরের কম, গড়ে ২৬ বছর। আর ৮০ জনের বয়স ছিল ৫০ বছর বা তার বেশি।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আহসানুল হক রাজীব মূলত এ গবেষণাটি করেন। জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালের পরিচালক ও অধ্যাপক ডা. আবদুল ওয়াদুদ চৌধুরী ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের একজন মেডিকেল অফিসার ছিলেন সহ-গবেষক।
গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, হৃদরোগের ঝুঁকির কারণ বিশ্লেষণের সময় তরুণ ও বয়স্কদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া গেছে। ৩০ বছরের কম বয়সী রোগীদের ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশই ধূমপায়ী ছিলেন। অন্যদিকে, ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী রোগীদের মধ্যে ধূমপানের হার ছিল ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ, অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ধূমপানের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। হৃদরোগে আক্রান্তের ক্ষেত্রে ধূমপান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, পারিবারিকভাবে করোনারি হৃদরোগের ইতিহাস কম বয়সীদের ক্ষেত্রে বেশি পাওয়া গেছে। ৩০ বছর বা কম বয়সী রোগীদের ৪২ দশমিক ৫ শতাংশের পরিবারের হৃদরোগের ইতিহাস ছিল। আর বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ২০ শতাংশ। অর্থাৎ অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাক হওয়া রোগীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের ক্ষেত্রে পারিবারিক হৃদরোগের ঝুঁকি বেশি।
অন্যদিকে, উচ্চ রক্তচাপের হার বয়স্কদের মধ্যে অনেক বেশি। কম বয়সীদের ৩৫ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও বয়স্কদের মধ্যে এ হার ছিল ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ।
একইভাবে ডায়াবেটিস ছিল কম বয়সীদের ২৫ শতাংশ এবং বয়স্কদের ৬৫ শতাংশ। এ ছাড়া কোলেস্টেরলের সমস্যা কম বয়সীদের ৫০ শতাংশ এবং বয়স্কদের ৭০ শতাংশ পাওয়া যায়।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, কম বয়সে প্রথমবারের হার্ট অ্যাটাক হওয়া রোগীদের মধ্যে ধূমপান প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আর বয়স্ক রোগীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও রক্তে চর্বির অস্বাভাবিক মাত্রার মতো একাধিক ঝুঁকি বেশি ছিল। অল্প বয়সী ও বয়স্ক রোগীদের হার্ট অ্যাটাকের ধরন এবং করোনারি রক্তনালির অবস্থার মধ্যে পার্থক্য পাওয়া গেছে। ৩০ বছর বা কম বয়সী রোগীদের মধ্যে এস-টি-এলিভেশন মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (স্টেমি) তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা গেছে। এটি হার্ট অ্যাটাকের একটি গুরুতর ধরন, যেখানে হৃদযন্ত্রের কোনো একটি করোনারি ধমনিতে রক্তপ্রবাহ তীব্রভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।
অল্প বয়সী রোগীদের মধ্যে সিঙ্গেল ভেসেল করোনারি ডিজিজ বা হৃদযন্ত্রের একটি রক্তনালিতে রোগ (ব্লকেজ) থাকার প্রবণতা বেশি ছিল। আর বয়স্কদের হৃদযন্ত্রের রক্তনালির মধ্যে তিনটি ব্লকেজও পাওয়া গেছে। বয়স্ক রোগীদের মধ্যে হাসপাতালে একটি থাকার সময়, হার্ট ফেইলিউর, শক ও মৃত্যুর মতো জটিলতাও তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। আর অল্প বয়সী রোগীদের হৃদযন্ত্রের পাম্পিং ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, তরুণ বয়সে বুকে ব্যথা হলে অনেকেই সেটিকে গ্যাস, অ্যাসিডিটি বা অন্য কোনো সাধারণ সমস্যা বলে ধরে নেন। ফলে চিকিৎসা নিতে দেরি হয়। কিন্তু বুকে চাপ বা ব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঠা-া ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা কিংবা ব্যথা হাত, কাঁধ, পিঠ বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতালের চিফ কার্ডিয়াক সার্জন অধ্যাপক ডা. লুৎফর রহমান তরুণদের হৃদস্বাস্থ্য নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, বয়স কম বলে হৃদরোগের ঝুঁকি নেই এমন ধারণা ঠিক নয়। জীবনযাপনের ধরন, ধূমপান, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং পারিবারিক ইতিহাস এসব বিষয় অল্প বয়সেও হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে।
ডা. লুৎফর রহমান বলেন, অল্প বয়সে ধূমপানের অভ্যাস দীর্ঘদিন চলতে থাকলে হৃদযন্ত্রের রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে হার্ট অ্যাটাকের মতো জটিলতা কম বয়সেই দেখা দিতে পারে। তাই হার্ট নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
দেশে প্রতি বছর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ২ লাখ ৮৩ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। হৃদরোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে বিশ্বে প্রতি বছর ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস পালিত হয়। আজ মঙ্গলবার বিশ্ব হার্ট দিবস-২০২৬। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘হৃদয়ের কোনো স্পন্দন যেন বাদ না যায়’। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারিভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হৃদরোগের উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে রোগ নির্ণয় না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। বিশেষ করে ধূমপায়ী ব্যক্তি, উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত কিংবা পরিবারের অল্প বয়সে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে সতর্কতা আরও জরুরি।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৪০টি হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচার হচ্ছে। তবে চিকিৎসাসেবার বড় অংশ এখনো রাজধানী ও বড় শহরকেন্দ্রিক।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী বলেন, দেশে হৃদরোগের চিকিৎসাব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত। সরকারি হাসপাতালে রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে দেশে আইসিইউ বেড রয়েছে প্রায় ৩ হাজার, যার বেশিরভাগই ঢাকাকেন্দ্রিক।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিসংখ্যানেও হৃদরোগের চিকিৎসায় চাপের চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৫ সালে জরুরি বিভাগে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৭০৩ জন এবং বহির্বিভাগে ২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬ জন চিকিৎসা নেন। ওই বছর ভর্তি হন ১ লাখ ২১ হাজার ৩১৯ জন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ৭ হাজার ৩৪৮ জন।
২০২৪ সালে জরুরি বিভাগে ১ লাখ ৭০ হাজার ৮৯৭ জন এবং বহির্বিভাগে ২ লাখ ৭২ হাজার ২৬০ জন চিকিৎসা নেন। ওই বছর ভর্তি হন ১ লাখ ৭ হাজার ২১৫ জন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ৭ হাজার ১৪৭ জন।
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে হাসপাতালটির জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯০ জন এবং বহির্বিভাগে ৩ লাখ ৭৮ হাজার ২৪৪ জন। এ সময়ে ভর্তি হয়েছেন ৮১ হাজার ৮৪১ জন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৫ হাজার ৫৫২ জন।
দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সরকারি-বেসরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালেও লাখ লাখ রোগী চিকিৎসা নিয়ে থাকেন।
খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী বলেন, দেশের দুই শতাধিক কার্ডিয়াক সার্জনের মধ্যে ঢাকার বাইরে আছেন মাত্র ১৫ থেকে ২০ জন। কার্ডিয়াক নার্স ও টেকনিশিয়ানেরও ঘাটতি রয়েছে। হৃদরোগের চিকিৎসা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হলে বিভাগীয় পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হৃদরোগের চিকিৎসায় হাসপাতাল ও আইসিইউ বাড়ানোর পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধে জোর দিতে হবে। হৃদরোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো ঝুঁকি কারণগুলো নিয়ন্ত্রণ করা। ধূমপান ও তামাক বর্জন, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, অতিরিক্ত লবণ ও চিনি কমানো, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত ঘুম হৃদস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যাদের পরিবারে অল্প বয়সে হৃদরোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদেরও প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা কোলেস্টেরলের সমস্যা থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই) গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা আয়োজিত গতকাল সোমবার এক সভায় জানানো হয়, বিশ্বে প্রতি বছর হৃদরোগের কারণে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ অকাল মৃত্যুবরণ করেন, যার অন্যতম প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপ। বাংলাদেশেও হৃদরোগজনিত মৃত্যু উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৪ শতাংশই হৃদরোগের কারণে ঘটে। ২০২৪ সালে দেশে হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন, যার ৫২ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই মৃত্যুর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অকাল মৃত্যু।