দৃঢ় মনোবল সফলতার চাবিকাঠি

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৯ এএম

ইসলাম মানুষকে উচ্চ মর্যাদা অর্জনে উৎসাহিত করে। দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মানজনক জীবন গড়তে অনুপ্রাণিত করে। মানুষের মর্যাদা বাড়ায় এবং হীনতা ও অক্ষমতা থেকে দূরে রাখে, এমন গুণগুলোর মধ্যে দৃঢ় মনোবল ও উচ্চাকাক্সক্ষা অন্যতম। দৃঢ় মনোবল সফলতার চাবিকাঠি, কল্যাণ অর্জনের পথ এবং দ্বীন ও দুনিয়ার জীবনে উন্নতির সোপান।

ইসলামের বাণীগুলো এমন শিক্ষায় পরিপূর্ণ, যা মানুষের উদ্যম জাগ্রত করে, তাদের মহৎ গুণাবলি অর্জনে দ্রুত অগ্রসর হতে এবং কল্যাণ ও উত্তম কাজের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে উৎসাহিত করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং তোমরা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করো।’ (সুরা বাকারা ১৪৮)

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যখন আল্লাহর কাছে জান্নাত চাইবে, তখন জান্নাতুল ফেরদাউস চাইবে। কেননা এটাই হলো সবচেয়ে উত্তম ও সর্বোচ্চ জান্নাত।’ (সহিহ বুখারি ২৭৯০)

হুসাইন ইবনে আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মহৎ ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন কাজ ভালোবাসেন এবং তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট কাজ অপছন্দ করেন।’ (আল-মুজামুল কাবির ২৮৯৪)

দৃঢ় মনোবল ও সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণের ক্ষেত্রে আমাদের নবীজি (সা.) ছিলেন সর্বোত্তম আদর্শ। তার উচ্চাকাক্সক্ষার মূল লক্ষ্য ছিল তাওহিদের প্রচার এবং মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর ইবাদতের দিকে নিয়ে আসা। তিনি দাওয়াতের গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। ধৈর্য ধারণ করেছেন, অবিচল থেকেছেন এবং অবিরাম প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। অবশেষে তার কাছে দুনিয়া নত হয়েছে, তার রিসালাতের আলোয় হৃদয়গুলো আলোকিত হয়েছে এবং মানুষ দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করেছে।

তার সম্মানিত সাহাবিরাও তার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন এবং তার আদর্শ দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেছেন। তারা ছিলেন সর্বোচ্চ উদ্যমী, দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী এবং সৎকাজ ও মহৎ গুণাবলি অর্জনে সবচেয়ে বেশি প্রতিযোগিতাকারী। তারা নিজেদের জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করেছেন দ্বীনের সাহায্য, উম্মাহর সেবা এবং নিজেদের সমাজ ও দেশের অধিকার আদায়ের জন্য। তারা ইমানের আলো, কোরআনের হেদায়েত এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মানবের সুন্নাহর মাধ্যমে পৃথিবী আলোকিত করেছেন। তার প্রতি সর্বোত্তম দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক। এরপর নেককার পূর্বসূরি এবং তাদের অনুসারীরাও তাদের পথ ও আদর্শের ওপর চলেছেন। তাদের আকাক্সক্ষা উচ্চ হয়েছে, সংকল্প দৃঢ় হয়েছে এবং তারা গৌরব ও মর্যাদার উঁচু স্তরে পৌঁছেছেন।

সুতরাং ইমানদারদের জন্য কখনোই নিম্নমানের লক্ষ্য নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা সমীচীন নয়। সুসংবাদ সেই ব্যক্তির জন্য, যে সর্বোচ্চ মর্যাদার শিখরের দিকে দ্রুত অগ্রসর হয় এবং উচ্চ সম্মান ও মহত্ত্ব অর্জনের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে।

ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, ‘উচ্চাকাক্সক্ষা হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে থেমে না যাওয়া এবং তিনি ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে হৃদয়কে সম্পৃক্ত না করা। আর আকাক্সক্ষার পতনের লক্ষণ হলো, নিম্নমানের বিষয়ে সন্তুষ্ট থাকা এবং তুচ্ছ কাজে প্রশান্তি লাভ করা।’

উচ্চাকাক্সক্ষা ও দৃঢ় মনোবল হলো সুস্থ বিবেক, নির্মল চিন্তাভাবনা, সঠিক সিদ্ধান্ত, মহৎ লক্ষ্য এবং আত্মার উন্নত অবস্থার অন্যতম নিদর্শন। যার আকাক্সক্ষা উচ্চ, মহান আল্লাহ তার জন্য সম্মান নির্ধারণ করেছেন। আর যার সংকল্প সত্য ও দৃঢ়, মহান আল্লাহ তাকে হেদায়েত দান করেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথের হেদায়েত দান করব।’ (সুরা আনকাবুত ৬৯)

যে ব্যক্তি নিজের নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, মহান আল্লাহ তার জন্য বরকতের দরজাগুলো খুলে দেন, কল্যাণের উপায়গুলো সহজ করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। হে আল্লাহর বান্দারা! এসব থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, উচ্চাকাক্সক্ষা কোনো বিলাসী চিন্তা কিংবা দার্শনিক বিষয় নয়। বরং এটি মহান লক্ষ্য অর্জনের পথ এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যম।

হে দৃঢ় সংকল্পের অধিকারীরা! জীবন সীমিত, নিঃশ্বাসগুলো গণনাযোগ্য, আর প্রতিযোগিতা অব্যাহত। এ প্রতিযোগিতায় কেবল দৃঢ় সংকল্প ও উচ্চাকাক্সক্ষার অধিকারীরাই সফলতা অর্জন করে। যখন মানুষের আকাক্সক্ষা বড় হয়, তখন সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিশ্রম করতে হয়।

যে ব্যক্তি নিজেকে আরাম-আয়েশ ও অলসতায় অভ্যস্ত করে তোলে, তার অবহেলা ও শৈথিল্য তাকে ক্রমে ক্রমে হীনতার গভীরে নামিয়ে দেয়। আকাক্সক্ষা উচ্চ হলে তা মানুষকে সৌন্দর্য ও পূর্ণতার দিকে উন্নীত করে। আর আকাক্সক্ষা নিচু হলে তা তাকে দুর্বলতা ও দুরবস্থার দিকে ঠেলে দেয়।

আকাক্সক্ষা জাগ্রত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো, নিজের জীবনের মূল্য উপলব্ধি করা। মনে রাখতে হবে, আপনার দিনগুলোই আপনার মূলধন। জীবনের যে সময় চলে গেছে, তা আর কখনো ফিরে আসবে না। মানুষকে অনর্থক সৃষ্টি করা হয়নি। বরং তাকে আল্লাহর ইবাদত এবং তার সন্তুষ্টি অনুযায়ী পৃথিবীকে আবাদ করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদের অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের আমার কাছে ফিরিয়ে আনা হবে না?’ (সুরা মুমিনুন ১১৫)

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, ‘পাঁচটি বিষয়কে পাঁচটি বিষয়ের আগে কাজে লাগাও। তোমার বার্ধক্য আসার আগে যৌবনকে, অসুস্থ হওয়ার আগে সুস্থতাকে, দারিদ্র্য আসার আগে সচ্ছলতাকে, ব্যস্ত হয়ে পড়ার আগে অবসরকে এবং মৃত্যু আসার আগে জীবনকে।’ (মুস্তাদরাক আলাস সহিহাইন ৭৮৪৬)

সুতরাং আপনাদের আকাক্সক্ষা হোক সুউচ্চ এবং আপনারা সর্বোচ্চ মর্যাদা অর্জনে অগ্রগামী হোন। যা আপনাদের উপকারে আসে, তার প্রতি যতœবান হোন এবং আল্লাহর সাহায্য চান। কখনো অক্ষম হবেন না। মিথ্যা আশা যেন আপনাদের ব্যস্ত না রাখে এবং ক্ষণস্থায়ী ভোগবিলাস যেন আপনাদের ডুবিয়ে না রাখে।

উচ্চাকাক্সক্ষী ও মহৎ আত্মার অধিকারীদের সাহচর্য গ্রহণ করুন। অলসতা থেকে দূরে থাকুন। কাজের ক্ষেত্রে গড়িমসিকে প্রতিবন্ধক হতে দেবেন না। পূর্ববর্তী নেককারদের অনুসরণ করুন এবং যারা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, তাদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন।

উচ্চাকাক্সক্ষা আত্মার এমন এক শক্তি, যা মানুষকে দ্বীন ও দুনিয়ার মহৎ বিষয়গুলো অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা চালাতে, সেগুলো অর্জনে নিজের সর্বোচ্চ সামর্থ্য ব্যয় করতে এবং তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট বিষয় থেকে নিজেকে দূরে রাখতে উদ্বুদ্ধ করে। এর মাধ্যমে মানুষ দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জীবনের কল্যাণ অর্জন করে এবং নিজের বর্তমান জীবন ও পরকালীন জীবনে সুখী হয়।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তা দিয়ে আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান করো। আর দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না।’ (সুরা কাসাস ৭৭)

আল্লাহ আপনাদের প্রতি রহম করুন। জেনে রাখুন, উচ্চাকাক্সক্ষার অধিকারী ব্যক্তি অলসতায় ডুবে থাকে না, হতাশা ও নিষ্ক্রিয়তার পথে চলে না, নিম্নমানের বিষয়ে সন্তুষ্ট থাকে না এবং হীনতার কাছে আত্মসমর্পণ করে না। বরং তার আত্মা উন্নতির দিকে ধাবিত হয়। তার সংকল্প হয় সত্য ও দৃঢ়, যাতে কখনো ক্লান্তি আসে না। তার প্রচেষ্টা হয় অবিরাম, যাতে একঘেয়েমি প্রবেশ করতে পারে না। সে সর্বোচ্চ শিখরের দিকে তাকিয়ে থাকে এবং বাজপাখির মতো মহত্ত্ব ও উচ্চ মর্যাদার বিস্তৃত আকাশে উড়ে বেড়ায়। তার অর্জন ও কৃতিত্বের ইতিহাস গৌরবের খাতায় আলোকোজ্জ্বল অক্ষরে লেখা হয়।

২৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। ভাষান্তর করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত