জীবনজুড়েই আছে আনন্দ, দুঃখ-কষ্টের কিছু নেই

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৩ এএম

নগর বাউল জেমসের আজ জন্মদিন। ১৯৬৪ সালের ২ অক্টোবর নওগাঁর পত্নীতলায় জন্ম নেওয়া এই রকস্টার পা রাখলেন ৬৩ বছরে। আশির দশকে ‘স্টেশন রোড’ দিয়ে শুরু করে ‘অনন্যা’, ‘জেল থেকে বলছি’, ‘দুঃখিনী দুঃখ করো না’ কিংবা বলিউডের ‘ভিগি ভিগি’, ‘আলবিদা’ যুগের পর যুগ শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছেন তিনি। জন্মদিনে নিজে কোনো বড় আয়োজন না করলেও ‘দুষ্ট ছেলের দল’ খ্যাত দেশ-বিদেশের অগণিত ভক্ত মেতে ওঠেন নানা উদযাপনে। ষাট পেরোনো এই সংগীত তারকা আজও ভক্তদের হৃদয়ে একই অনুভূতি, উন্মাদনার নাম। জন্মদিন উপলক্ষে দীর্ঘ সংগীত জীবন নিয়ে বলেছেন অনেক কথা। বিশেষ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তারেক আনন্দ

আজ আপনার জন্মদিন। বিশেষ এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে তাকালে কী মনে হয়? সময়ের সাথে এতে কি কোনো পরিবর্তন এসেছে?

সত্যি বলতে জন্মদিন আমি কখনো জাঁকজমক বা ঘটা করে পালন করি না। ভক্তরা নানা আয়োজন করে, আমি দূর থেকেই সেগুলো দেখি আর ভালোবাসা অনুভব করি। আলাদা কোনো পরিকল্পনা এবারও নেই। আর শুরুর দিকের জেমস আর আজকের জেমসের মধ্যে আমি নিজে তো কোনো বড় পরিবর্তন দেখি না। কেবল মাথার চুল হয়তো কিছুটা কমেছে, এই যা! বাকিটা তোমরা ভালো বলতে পারবে।

দীর্ঘ পথচলায় সহযোদ্ধাদের হারিয়ে কখনো একাকীত্ব অনুভব হয়? বিশেষ করে কাছের মানুষদের কথা যখন মনে পড়ে...

একাকীত্ব বলতে, আমার সাথে যারা ছিল, যাদের সাথে উঠাবসা করেছি, আড্ডাবিলাস করেছি, তাদের খুব মিস করি। বিশেষ করে আইয়ুব বাচ্চু ভাই। ওনার সাথে কথা বলা, আড্ডা দেওয়া মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার। তুমুল এক আড্ডাবাজ ও মজার মানুষ ছিলেন। আমরা দুজন দুজনের রেকর্ডিং স্টুডিওতে যেতাম, সময় কাটাতাম, গান শুনতাম। এখন তো সেই স্টুডিও কালচারটাই হারিয়ে গেছে, সবাই ডিজিটাল আর হোম স্টুডিওতে বন্দি হয়ে গেছে। অকারণেই হুট করে উনি চলে গেলেন, এ জন্য মাঝেমধ্যে ওনার ওপর খুব রাগও হয়।

আইয়ুব বাচ্চুর সাথে আপনার প্রতিযোগিতা নিয়ে একসময় দেশজুড়ে তুমুল উন্মাদনা ছিল। কে কার চেয়ে হিট গান দেবে। সেই দিনগুলোর স্মৃতি কেমন?

তখনকার দিনগুলো সত্যিই অসাধারণ ছিল। তখন আমাদের মধ্যে পারস্পরিক যাতায়াত ছিল, গভীর আন্তরিকতা ছিল। তবে এখনকার সময়ে এসে সেই যোগাযোগটা আর নেই। মিউজিশিয়ানরা এখন যার যার ঘরে ল্যাপটপ-কম্পিউটার নিয়ে নিজের ভেতরে গুটিয়ে গেছে।

ভক্তরা প্রায়ই আপনার কাছে সলো ইন্সট্রুমেন্টাল শো, গিটারভিত্তিক বিশেষ পারফরম্যান্স দেখতে চায়। এমন কোনো চিন্তাভাবনা আছে?

সত্যি বলতে, এভাবে সোলো ইন্সট্রুমেন্টাল শোর কোনো প্ল্যান আমার মাথায় নেই। যদি কখনো মনের ভেতর থেকে সেই তাগিদটা জাগে, তখন হয়তো ভেবে দেখব। এখনো সেভাবে ইচ্ছেটা জাগেনি।

গান তৈরির ক্ষেত্রে আপনার সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়াটি কেমন? সুর আগে আসে নাকি কথা?

দুই ভাবেই হয়েছে। তবে সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি হয় যখন কথা ও সুর দুটি একসাথেই মনের ভেতরে তৈরি হয়ে যায়।

আপনার একটি গান রেকর্ড করতে কেমন সময় লেগেছে? এমন কি কোনো গান আছে, যার পেছনে চার-পাঁচ বছর লেগে গেছে?

না, এত সময় নিয়ে অ্যারেঞ্জমেন্ট আমি কখনোই করি না। আমি সাধারণত গানের একটা প্রাথমিক বেসিক ফ্রেম তৈরি করি। এরপর ধীরে ধীরে সেটা চেঞ্জ হতে থাকে। আমি গানকে একদম শক্ত বা টাইট ফ্রেমে বাঁধতে চাই না, সবসময় লুজ রাখার চেষ্টা করি।

কবি ও কথাসাহিত্যিকদের কবিতা থেকে আপনি কয়েকটি জনপ্রিয় গান করেছেন। শুনছিলাম প্রখ্যাত কবি শামসুর রাহমান আরও কিছু গান আপনার জন্য লিখেছিলেন?

শামসুর রাহমান ভাই আমার জন্য বেশ কিছু গান লিখেছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেগুলো আর রেকর্ড করা হয়ে ওঠেনি, সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে।

আপনার গাওয়া কালজয়ী ‘মা’ গানটিতে দারুণ এক আকুতি ও আবেগ ছড়িয়ে আছে। গানটি নিয়ে আপনার নিজস্ব অনুভূতি কেমন?

‘মা’ গানটি মূলত প্রিন্স মাহমুদের লেখা ও সুর করা। এটি ছিল ওর নিজস্ব প্রজেক্ট, দৃষ্টিভঙ্গি ও আবেগ; আমি কেবল গায়ক হিসেবে এতে নিজের কণ্ঠটুকু দিয়েছি।

আপনার জনপ্রিয় ‘সুলতানা বিবিয়ানা’ গানটির পেছনের প্রেক্ষাপট, থিম নিয়ে জানতে চাই। এমন ভাবনার কারণ কী ছিল?

এটা খুব সাধারণ গ্রামগঞ্জের এক থিম, জটিল কোনো বিষয় এতে নেই। সহজ-সরল কথা ও সুর, শুনলেই যে কেউ অনায়াসে এর মূল আবেগটা ধরতে পারবে।

সংগীতে এআই’র প্রভাব এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আধিপত্যকে কীভাবে দেখছেন?

ডিজিটাল ও স্ট্রিম প্ল্যাটফর্মের কারণে মিউজিক এখন হাতের মুঠোয়, প্রায় ফ্রি’র মতো হয়ে গেছে। আর মানুষ ফ্রিতে পাওয়া কোনো জিনিসের সঠিক মূল্যায়ন, মর্যাদা দিতে পারে না। বর্তমানে মিউজিক ও ফটোগ্রাফি দুটোই একদম ‘ওভার স্যাচুরেটেড’ হয়ে গেছে। এখন এত শত শত গান তৈরি হচ্ছে। তবে, আগামী ২০ বছর আর কোনো গান না হলেও মানুষ পুরনো গান শুনে কাটিয়ে দিতে পারবে। প্রযুক্তি যদি সুন্দরভাবে কাজের সুবিধার জন্য ব্যবহৃত হয়, তবে তাতে আপত্তি থাকার কারণ নেই। মূল বিষয় হলো প্যাশন। প্যাশন থেকে সৃষ্টি না হলে দীর্ঘস্থায়ী কিছু হয় না।

নতুন প্রজন্মের অনেক শিল্পী আপনার গান কাভার করছে। বিষয়টি আপনি কীভাবে নেন?

গান তো তৈরিই হয় মানুষের শোনার ও গাওয়ার জন্য। হাটে-মাঠে-ঘাটে যে যেভাবে খুশি গান গাইবে, এতে বাধা দেওয়া, কড়াকড়ি করা একদমই বাজে কাজ। সংস্কৃতি হলো নদীর মতো, এটি তার নিজস্ব গতিতেই বইতে থাকবে।

একসময় আপনাকে নিয়মিত ক্যামেরা হাতে দেখা যেত। ইদানীং ফটোগ্রাফি নিয়ে কেমন ব্যস্ততা?

গত দুয়েক বছর ধরে ফটোগ্রাফি একদমই বন্ধ আছে, ছবি তোলা হচ্ছে না। তবে ছবি তোলার ক্ষেত্রে আমি সাধারণ মানুষের পোর্ট্রেট ফ্রেমবন্দি করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি, সেখান থেকেই মূল আনন্দটা পাই।

দীর্ঘ এই পথচলায় কোনো অপ্রাপ্তি বা আক্ষেপ কাজ করে? জীবনের এই পর্যায়ে এসে কিসে সবচেয়ে বেশি আনন্দ খুঁজে পান?

অপ্রাপ্তি বা পাওয়া না-পাওয়ার কোনো হিসাব-নিকাশ নিয়ে আমি কখনো ভাবি না। জীবনজুড়েই তো আনন্দ আছে! আজ এই যে তোমরা সবাই একসঙ্গে আছো, গল্প বলছো। এটাই তো আনন্দ! এখানে কষ্টের বা দুঃখের কিছু নেই। দুঃখ পেছনে ফেলে মানুষকে তো সামনের দিকেই এগিয়ে যেতে হয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত